ভূপেনের জীবনে ঝড়ের অভাব ছিল না। স্ত্রী প্রিয়ম্বদার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছিল, লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে বন্ধুত্ব নিয়ে ছিল তুমুল চর্চা। ভূপেনের চারপাশে আলো যেমন ছিল, তেমনি ছিল অন্ধকারও।
.png.webp)
শেষ আপডেট: 8 September 2025 21:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যাযাবরের কি সত্যিই কোনও ঠিকানা থাকে? যিনি জীবনের প্রতিটি বাঁকে পথিক হয়ে ওঠেন, তাঁর সঙ্গী হওয়া কি এত সহজ? যাযাবরের হাত ধরা? তা তো অস্থিরতার সঙ্গে যাপন, ঝড়কে আলিঙ্গন। তবুও এক তরুণী কোনও এক অচেনা সন্ধ্যায় স্থির করেছিলেন, তিনি থাকবেন—শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। ভূপেন হাজারিকা আর কল্পনা লাজমির সম্পর্ক ছিল সেই অমোঘ টান, যার কোনও সংজ্ঞা নেই অভিধানে, নেই সামাজিক নামকরণে। তবু 'টান' তো আর মিথ্যে নয়, নাই বা তা মানুক প্রথাগত সমীকরণ!
মাত্র সতেরো বছর বয়সে প্রথম দেখা। গায়ক তখন ছেচল্লিশে। তিরিশ বছরের ব্যবধানও তাঁদের টলাতে পারেনি। ফোনে কথা, গানের নেশা, মুগ্ধতা—একসময় কল্পনা কলকাতায় চলে আসেন ডকুমেন্টারি বানানোর অজুহাতে। তারপর থেকে একসঙ্গেই দিনযাপন। সমাজ প্রশ্ন করেছে, পরিবার মানেনি, মা-বাবা ভেঙে পড়েছেন। তবু কল্পনা থামেননি।

ভূপেনের জীবনে ঝড়ের অভাব ছিল না। স্ত্রী প্রিয়ম্বদার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছিল, লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে বন্ধুত্ব নিয়ে ছিল তুমুল চর্চা। ভূপেনের চারপাশে আলো যেমন ছিল, তেমনি ছিল অন্ধকারও। আর সেই অন্ধকারে একমাত্র আলোর মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন কল্পনা। তাঁর নিজের স্বীকারোক্তি, “আমি জানি না আমাদের মধ্যে কী আছে। তবে ভূপেন আমার জীবনটাই বদলে দিয়েছে। ও-ই আমার জন্ম-জন্মান্তরের সঙ্গী।”
কল্পনার মা ললিতাদেবী একবার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "আমরা খুব অবাক হয়েছিলাম। ওর বাবা ওকে মিস করত। কল্পনা কলকাতায়। আমরা ওকে আনতে যাই। ও তখন মাত্র ১৯। ও আসেনি। ভূপেনদা ওর বাবার বয়সী ছিলেন।"
সময় যত এগিয়েছে, জীবন ততই নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে। ভূপেন অসুস্থ হয়ে পড়লে কল্পনা কার্যত ঘরবাড়ি বেচে, শেষ সঞ্চয় খরচ করে তাঁকে নিয়ে যান মুম্বইয়ের হাসপাতালে। কেউ বলেছিল, “সব শেষ করে ফেলছ!” কল্পনার উত্তর ছিল, “কী হয়েছে টাকা নেই তো? মরে যাব... আবার ওর সঙ্গে দেখা হবে।” পরিহাস—শেষ অবধি গায়ককে বাঁচাতে পারেননি তিনি।

২০১১ সালে চলে গেলেন ‘ব্রহ্মপুত্রের পাখি’। তাঁর মৃত্যু যেন কল্পনার ভেতর থেকেও আলো কেড়ে নিল। তবু তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন দৃঢ়ভাবে, যেন যাযাবরের অসমাপ্ত গানটুকু বয়ে নিয়ে চলেছেন। কিন্তু শরীরের ওপর সময়ের নিষ্ঠুর আঘাত থামানো যায়নি। কিডনি ক্যানসারে আক্রান্ত হলেন কল্পনা। টাকা-পয়সা ফুরিয়ে গেল, বন্ধুরাও ধীরে ধীরে সরে গেলেন। হাসপাতালে কষ্টে-যন্ত্রণায় নিভে গেল তাঁর প্রদীপ। বয়স তখন মাত্র চৌষট্টি।
এই প্রেমে ছিল না কোনও রোম্যান্টিক গালগল্প। ছিল না হাত ধরাধরি করে সুখে-দুঃখে সংসার গড়ার প্রতিশ্রুতি। ছিল এক নিঃশব্দ আত্মসমর্পণ। সমাজ যার সংজ্ঞা খুঁজে পায় না। কল্পনা জানতেন, তাঁর প্রিয় মানুষটির হাতে সময় খুব কম। 'লিভ ইন' সঙ্গী তকমাও যে তথাকথিত সমাজের চোখে খুব একটা সম্মানের না আজও! তবুও সবটা উজাড় করে দিয়েছিলেন কল্পনা। আর একদিন নিঃশব্দে মিশে গিয়েছিলেন সেই যাযাবরের সঙ্গে—যিনি সারাজীবন গান গেয়ে গেছেন নদীর, মানুষের, ভালবাসার।