
শেষ আপডেট: 16 July 2023 12:42
ত্রিকোণ প্রেমের গল্প মানেই তিনজনের মধ্যে একজন ব্যর্থ প্রেমিক বা ব্যর্থ প্রেমিকা হয়ে যাবে শেষ প্রহরে। এটাই সবথেকে সহজ ফর্মুলা হয়ে এসেছে চলচ্চিত্রে। 'বিয়ে বিভ্রাট' (Biye Bibhrat) ছবির পোস্টার দেখেও সেই কথাই মনে হতে পারে, এক প্রেমিক হয়তো রাজকন্যাকে পাবেন, আর একজন প্রেমিক ব্যর্থ হয়ে রয়ে যাবেন! কিন্তু না। 'বিয়ে বিভ্রাট' ছবিতে শেষমেশ এক বিভ্রাট ঘটিয়ে সাঙ্গ হচ্ছে খেলা, যা দর্শকরা কল্পনাও করতে পারবেন না সিনেমাহলে ঢোকার সময়েও। যে সুরে দুর্দান্ত গল্প লিখেছেন গল্পকার পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। পরিচালনায় রাজা চন্দ।

'বিয়ে বিভ্রাট' যখন ছবির নাম, তখন ছবির প্রেক্ষাপটে বিয়ে তো থাকবেই। ছবির শুরুতেই সূত্রধর রূপে আবির্ভূত হচ্ছেন আবির চট্টোপাধ্যায়। ছবিতে তাঁর নাম শাক্য। জনপ্রিয় ইউটিউবার তথা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার শাক্যজিৎ সোম। শাক্য প্রায় সব মেয়ের ক্রাশ। এদিকে শাক্যর বিয়ের পাত্রী খুঁজছেন তাঁর মা (সুদীপা বসু), একেবারে দুঁদে গোয়েন্দাদের মতো। একের পর এক পাত্রীর সঙ্গে ডেটিং হচ্ছে, এমনকী পাত্রীর মায়েরাও সম্ভাব্য জামাই শাক্যর পৌরুষে আকৃষ্ট হচ্ছেন। কিন্তু শাক্যর আর কিছুতেই মনে ধরে না কোন মেয়েকেই। এমন করতে করতেই একদিন শাক্যর সামনে এসে দাঁড়ায় তাঁর স্বপ্নসুন্দরী, ইন্টিরিয়র ডিজাইনার মোহর (লহমা ভট্টাচার্য)। কিন্তু এত সহজেই কি শাক্য আর মোহরের পরিচয় পরিণয়ে পরিণতি পাবে?
নাহ! তাহলে আর ফিল্মের ক্লাইম্যাক্স কী রইল। দুই পাত্র-পাত্রীর মাঝে এসে দাঁড়ালেন আর এক পাত্র, যিনি মোহরের গানের শিক্ষক আবার মোহরের প্রাক্তন প্রেমিকও। বর্ধমানের ছেলে চন্দ্রমৌলি হাজরা (পরমব্রত)। তিনি অবশ্য ক্রাশট্রাশ নন, একেবারেই গোবেচারা। ভিতুও বলা যায়। তার উপর তিনি দাঁতভাঙা বাংলায় কথা বলেন ও লেখেন। ভাষাজ্ঞান তাঁর অস্ত্র।
এই প্রাক্তন প্রেমিক কেমন ভাবে চলে এসেছেন হবু বর-বৌয়ের মাঝে, সেখান থেকেই ছবির চমক শুরু। তবে এই গল্পে প্রাক্তন ও বর্তমান সেই চেনা সংঘাতে যাচ্ছে না। বরং একজন হয়ে উঠছে আর এক জনের বন্ধু, যাতে ছবির গল্প হয়ে উঠছে আরও মনোগ্রাহী। এই ত্রয়ীর শেষমেশ কী হয়?

অভিনয়ের শুরু থেকেই গ্ল্যামার ম্যান হয়ে হাজির হচ্ছেন আবির চট্টোপাধ্যায়। শাক্য চরিত্র যেন আবিরকে অনেকদিন পর ব্যোমকেশের বাইরে বের করল। সেই ২০১০-এর শুরুর দিকের রোম্যান্টিক হিরো আবিরকে ফেরাল শাক্য। এক দশক পার করা আবির এখন আরও পরিণত। জিমচর্চিত আবিরের সুগঠিত শরীর ছবি জুড়ে বিরাজমান।
ঠিক তাঁর বিপরীত পরমব্রতর চন্দ্রমৌলি হাজরা চরিত্রটি। মেস বাড়িতে থাকা একজন সামান্য গানের টিচার। নেই চেহারায় গ্ল্যামার, কিন্তু আছে কথার জাদু আর দুর্দান্ত গানের গলা। চন্দ্রমৌলির গানের ফ্যান তাঁর ছাত্রী লহমা। বরং আবির ওরফে শাক্য গান গাইলেও, তা মোহরের মন জয় করেনি। প্রথাগত তালিমপ্রাপ্ত অসাধারণ গানের গলা নিয়ে চন্দ্রমৌলিই এই ব্যাপারে এগিয়ে আছেন। কিন্তু তাঁর যে আত্মবিশ্বাস একেবারেই নেই, তাই তিনি কোনও লাইমলাইট পাননি। অন্যদিকে শাক্য হালকা চালের বাংলা গান গেয়ে নিজের চেষ্টায় আজ ইউটিউব স্টার, শহরের হার্টথ্রব।

পরমব্রত চন্দ্রমৌলি চরিত্র ছবিতে অসময়ে প্রবেশ করলেও, তাঁকে কখনও ভিলেন মনে হয় না। বরং তাঁর সহজ সরল কথার ধরন আর অসম্ভব হিউমারই ছবি দেখার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। পরমব্রতর লিপে অরিজিৎ সিং-এর প্রতিটি রাগাশ্রয়ী গান শ্রুতিমধুর। পরমব্রত এই ছবির কাহিনিকারও। তিনি যেন একটা ফ্রেশ হাওয়া এনেছেন বাংলা ছবিতে। পরমব্রতর সব ক'টি সংলাপ ছবিতে কমেডি হিউমারের মজা এনেছে।
ছবির নায়িকা লহমা ভট্টাচার্যর ডেবিউ ছবি ছিল জিতের নায়িকা হয়ে, 'রাবণ'। দ্বিতীয় ছবি 'বিয়ে বিভ্রাট'-এর (Biye Bibhrat) লহমা আগের থেকে বেশি সাহসী। মোহর গানের শিক্ষক চন্দ্রমৌলির বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্যারের আড়ষ্টতা ভেঙে দেয়, আবার শাক্যকে সে নাইট স্যুট পরা অবস্থাতেই চন্দ্রমৌলির বাড়িতে এনে ফেলতে পারে। দুঃখের সময়ে বেডরুমে রাখা বোতল থেকে গলায় ঢালতে পারে সুরাও। লহমা এই ছবিতে নানা রূপে কামাল করেছেন। নব্য অভিনেতা হিসেবে কিছু খামতি মাফ করাই যায়। তবে শেষ দৃশ্যে নবীনা অভিনেত্রী লহমা বেশ দাপট দেখিয়েছেন। বিশেষ করে অমন দুই পোড় খাওয়া নায়কের মাঝেও, ম্লান হননি লহমা।

আবির আর পরম এই ছবির প্রাণ, নিঃসন্দেহে। তবে তাঁদের সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে টক্করের মাঝেই হাসনুহানার মতো ফুটে উঠেছেন লহমা। দুই জনপ্রিয় নায়কের মাঝে এক নবীনা নায়িকার আবাহন দেখে মনে পড়ছিল সলিল দত্তর 'স্ত্রী' ছবিতে উত্তম-সৌমিত্রর টক্করের মাঝে আরতি ভট্টাচার্যের উপস্থিতি।
সুদীপা বসু অর্থাৎ শাক্যর মায়ের চরিত্রে তিনি স্বভাবোচিত। লহমার উৎপল দত্ত-সম রাশভারী বাবার চরিত্রে রোহিত মুখোপাধ্যায় দারুণ দাপট দেখিয়েছেন। শাক্যর প্রাক্তন প্রেমিকার ভূমিকায় স্বস্তিকা দত্তর ছোট্ট উপস্থিতি দুর্দান্ত। আর ছবির শেষে রয়েছে এক চূড়ান্ত চমক।
'বিয়ে বিভ্রাট' (Biye Bibhrat) ছবির বড় সম্পদ সঙ্গীত। এই ছবির গান কয়েক বছর পরেও মনে রাখবেন দর্শকরা। প্রতিটি গানই কানকে আরাম দেয়। গানের সুর, কথা, সঙ্গীত আয়োজন এত শ্রুতিমধুর, যে জন্য ছবির নায়ক নায়িকাদের পর্দায় দেখতে আরও ভাল লাগে। সংগীত পরিচালক রণজয় ভট্টাচার্য এই ছবিতে অনবদ্য কাজ করেছেন। কমার্শিয়াল ছবিতে ক্লাসিকাল গানের ব্যবহার নতুন না হলেও, তা বিশেষ হিট করেনি। সেই সমঝদার শ্রোতা পাওয়াও মুশকিল।
কিন্তু এই ছবিতে রণজয় ভট্টাচার্যের সুরে অরিজিৎ সিং এতটাই অনবদ্য গেয়েছেন, যা মন ভাল করে দেয়। অসামান্য লিখেছেন গীতিকার বারিষও। রণজয়ের সঙ্গে প্রথম কাজ করলেন অরিজিৎ। অনেকের কলার টিউনে বাজতে শোনা যাবে এই ছবিতে অরিজিতের গানগুলি। 'ঘন মেঘের এলো কেশে, মন ভেজে কী আবেশে' ছাড়াও অরিজিতের কণ্ঠে 'জিয়া তুই ছাড়া' বেশ সুন্দর। সারেগামাপা থেকে উঠে আসা স্নিগ্ধজিতের নিজের গান হিসেবে রয়ে যাবে, 'ঝিলমিল করা' বা অরিজিৎ সিং-এর সঙ্গে ডুয়েট 'নেই ক্ষতি নেই'। 'নেই ক্ষতি নেই' গানে রাগাশ্রয়ী ও লাইট মিউজিকের যুগলবন্দি পর্দায় দারুণ লাগে। আর এই গান পর্দায় একসঙ্গে গাইছেন পরম এবং আবির। ছবির ক্লাইম্যাক্স এখানেই। তার পরেও গুনগুন করে গানের রেশ...
'মন যমুনায় কেন যাও,
পারো যদি মন কে ফেরাও শরীরে
মন যমুনায় কেন যাও।
আসেনা যখন রাই আসবে বলে
ভাসে ঘন শ্যাম আঁখি জলে।'
করণ জোহরের ছবির মতো পরিচালক রাজা চন্দর মাঝেমধ্যে ছবিতে উপস্থিতি বেশ ভাল লাগে। ভাল গান শোনার জন্য আর দুই নায়কের যুগলবন্দি দেখার জন্য 'বিয়ে বিভ্রাট' অবশ্যই দেখতে হবে। মিষ্টি মেয়ে লহমাকে ঘিরে মিষ্টি এই ছবি দেখে মন ভাল হবেই।
চরম অর্থসঙ্কটে উত্তমকুমারের নায়িকা, কাটাচ্ছেন অথর্ব জীবন! সঞ্জীবকুমারকে ভালবেসে ব্যর্থ যৌবনে