
শেষ আপডেট: 28 August 2022 07:35
ঠোঁট কাটা মন্তব্যের জন্য চিরকালই অভিনেতা বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় (Biplab Chatterjee) শিরোনামে থাকেন। আবারও সেই একই ধারা বজায় রাখলেন তিনি। আসলে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়কে আমজনতা টালিগঞ্জ পাড়ার খলনায়ক রূপেই চেনে। কিন্তু তাঁর ভিতরের স্পষ্টবক্তা মানুষটাকে ক'জন চেনেন? সোজাসাপ্টা কথা বলে ছক্কা হাঁকান প্রতি কথায় বিপ্লব আজও।
খলনায়কের শরীরে এসেছে জরাস্পর্শ, পড়েছে রোগভোগের ছাপ তবু টালিগঞ্জ পাড়ার এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব তিনি। যাকে খলনায়কের স্ট্যাম্পেই চিরকাল রয়ে যেতে হল। অভিনেতা বিপ্লব সে অর্থে বেশি সুযোগ পেলেন কই!
গত পরশু ছিল ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Bhanu Bandyopadhyay) জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, বিপ্লব চট্যোপাধ্যায়, চলচ্চিত্র অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, শাশ্বত চট্যোপাধ্যায় প্রমুখ।
‘ভানু ১০০ পেরিয়ে’, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী বই প্রকাশ করল ‘দেজ’
সেই অনুষ্ঠানে হাজির হয়েই বিপ্লব খুব আবেগঘন হয়ে পড়লেন ভানু পুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভানু কন্যা বাসবী বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটককে দেখে। অশক্ত শরীরেও অনুষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ অবধি বসে রইলেন তিনি।
বিপ্লবের মুখ মাস্কে আটকানো তাই সাবিত্রী বিপ্লবকে চিনতে পারেননি। বিপ্লব নিজেই সাবিত্রীকে ডেকে বললেন, "তুমি যে আমায় দেখতেই পাচ্ছো না।" সাবিত্রী আরও মজা করে বললেন, "তুমি তো লম্বা চওড়া মানুষ তুমিই তো আমায় ডাকবে।" বহুদিন পর যেন ওঁরা ফিরে গেলেন ফেলে আসা আশির দশকে।

তবে এদিন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণা ছিল অসামান্য। বিপ্লবের আগেই বক্তব্য রাখেন চলচ্চিত্র অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। সঞ্জয় বাবু অসাধারণ বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য রাখেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে। তবে তিনি একটা কথা চিরাচরিতভাবেই বলেন, "বিদেশে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জন্মালে যোগ্য সম্মান ও যোগ্য পুরস্কার পেতেন।" যে কথা প্রতিটি বাঙালির বলা দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে। তুলসী চক্রবর্তী কী ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বিদেশে জন্মালে অস্কার পেতেন ইত্যাদি।
কিন্তু সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের সেই বক্তব্য খন্ডন করে দিলেন বিপ্লব। আর তাতেই উঠল দর্শকাসনে হাততালির ঝড়। একেই বোধহয় বলে ফিল্মে সঠিক সংলাপ প্রয়োগের মুন্সিয়ানা।

বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় তাঁর ভানুদাকে নিয়ে বললেন, "অনেকেই বলবেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় আমেরিকায় জন্মালে ভাল হত। আমি বলছি, না। আমেরিকায় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জন্মালে আমরা তো ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে পেতাম না। আমরা বাঙালিরা যে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে পেয়েছি সেটা কোথা থেকে পেতাম! কেন আপনারা বিদেশের পুরস্কার, সম্মান দিয়ে এদেশের অভিনেতাদের বিচার করেন! বিদেশি পুরস্কারটাই কি সব শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি! তুলসী চক্রবর্তী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায় এঁরা আমাদের সম্পদ। বিদেশে ভানুদা জন্মালে ভানুদার বাঙাল ভাষা কী আমরা শুনতে পেতাম! তো ভানুদা ভানুদাই।"
এরপর তিনি বলেন, "আমার সঙ্গে ভানুদার আলাপ হয়েছিল আমার আরও এক অভিনেতা বন্ধুর সৌজন্যে। তিনি উজ্জ্বল সেনগুপ্ত (যীশু সেনগুপ্ত যার ছেলে)। উজ্জ্বলের সঙ্গে আমি প্রথম ভানুদার বাড়ি গিয়েছিলাম। তখন 'জয় মা কালী বোর্ডিং' করছেন ভানুদা। সেই ঐতিহাসিক নাটকে ভানুদা আমায় একটা চরিত্র দিয়েছিলেন। অভিনয়ের কয়েকটা জিনিস ভানুদা যেভাবে আমাকে বুঝিয়েছিলেন তা চিন্তার বাইরে। যারা সত্যি অভিনয় করার চেষ্টা করেন তাঁদের শেখার মতো জিনিস। আমি ভাল অভিনেতা নই যদিও। আমি তো ফালতু লোক একটা। যারা প্রকৃত অভিনয় শিখতে চান তাঁদের উচিত হচ্ছে ভানুদার মতো মানুষদের কাছে থাকা। তাঁদের ছবিগুলো দেখা, কী ভাবে কাজ করতেন তাঁরা। আমি তো বলছি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় একটা অন্য মাপের মানুষ। ওই অতবছর আগে সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায় ভানুদার নাম ছিল। ভাবা যায়! চিরকাল তারপর ভানুদা বামপন্থী আন্দোলন করে গেছেন। আরএসপি দলের সদস্য ছিলেন তিনি। ননী ভট্টাচার্যের চ্যালা ছিলেন ভানুদা। অনন্ত সিংহের সঙ্গে ভানুদার কত অবদান। এসব মানুষের নাম আজকের প্রজন্মের কজন জানে বা জানার চেষ্টা করে!"
বিপ্লব আরও বলেন, "ভানুদা টালিগঞ্জ পাড়ায় শেষের দিকে ওঁর মর্যাদা সম্পন্ন রোল পাননি। অনেক অকিঞ্চিতকর চরিত্রেও কাজ করতে হয়েছে। তাঁকে নিয়ে ভাবেনি তখনকার পরিচালকরা। আজকেও সে ধারার পরিবর্তন হয়নি। আমাকেও এ যুগের ক'জন পরিচালক ডাকেন? এখনকার পরিচালকরা মনে করেন বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় একটা ফালতু লোক। আর দর্শকরা আমায় দেখলে গালাগাল দেয়। এই তো সেদিন একটা নার্সারির বাচ্চা আমায় দেখে ছুটে আসছিল। বাচ্চাটির মা দৌড়ে এসে বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, যেওনা দুষ্টু লোক! তখন আমি প্রতিবাদ করে সেই ভদ্রমহিলাকে বললাম, কেন কুশিক্ষা দিলেন নিজের সন্তানকে! মহিলা চুপ। এই তো আমার অবদান টালিগঞ্জ পাড়ায়। বিদেশে জন্মালে কী হত এসব স্তোকবাক্য না বলে এখানে যারা জন্মেছেন, সঠিক অভিনয় করছেন তাঁদের সম্মানটুকু দিন।"

বিপ্লবের মতে, ভানুদাকে শুধু কমেডিয়ান বলা তাঁর অপমান। তাঁকেও যারা 'দুষ্টু লোক' বলেন, ভাবেন তাঁরা কি ঠিক কাজ করছেন?"
কথা বলতে বলতে বিপ্লবের চোখ ভরে এল জলে। আবেগঘন হয়ে পড়লেন বিপ্লব। যেন এত বছর পর তাঁর ভানুদাকে তিনি দেখতে পাচ্ছেন। অনুষ্ঠান শেষে বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের কথাগুলি অস্বীকার করতে পারলেন না কেউ, বরং মনে অনুরণন বেজে চলল।