
বিকাশ রায়, উত্তমকুমার
শেষ আপডেট: 16 April 2025 20:31
শুধুমাত্র নায়ক নয়, পার্শ্বঅভিনেতাদের প্রতিভার জোরেও স্বর্ণযুগের এক একটি বাংলা ছবি কালজয়ী হতে পেরেছে। সেযুগের তেমন এক বলিষ্ঠ অভিনেতা বিকাশ রায়। তবে শুধু চরিত্র অভিনেতা নয়, নায়ক হয়েও তাঁর একাধিক ছবি সুপারহিট, যেমন 'রত্নদীপ', 'উত্তর ফাল্গুনি', 'ছেলে কার' প্রভৃতি।
তবে বিকাশ রায়কে রোম্যান্টিক চরিত্রে খুব কমই পাওয়া গেছে। ভিলেন রূপেই তিনি চলচ্চিত্র দুনিয়ায় অধিক জনপ্রিয় ছিলেন। তবে জীবনে প্রথম বার থিয়েটার করতে এসে নায়ক চরিত্র করেছিলেন বিকাশ।
বেশি বয়সেই মঞ্চে থিয়েটার করতে আসেন বিকাশ রায়। তরুণ কুমার আর সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহু সাধাসাধির পর বিকাশ রায় মঞ্চে অভিনয় করতে রাজি হন। নাটক শংকরের 'চৌরঙ্গী'। স্যাটা বোসের ভূমিকায় বিকাশ রায়। বড় পর্দায় যে চরিত্রে ঐতিহাসিক অভিনয় করেছিলেন স্বয়ং উত্তমকুমার।
বড় পর্দায় 'চৌরঙ্গী' ছবিতে স্যাটা বোস চরিত্রে ততদিনে ঝড় তুলেছেন উত্তমকুমার। উত্তম স্যাটা বোসের প্রেমে তখন মজে আছে বাঙালি। সেই উত্তম ইমেজ থেকে স্যাটা বোসকে বের করে আনা বিকাশ রায়ের পক্ষে ভীষণ কঠিন ব্যাপার ছিল। এই চরিত্রে অভিনয় করতে প্রথমে রাজিই ছিলেন না বিকাশ রায়। বেশ ভয় পেয়েই বলেছিলেন 'উত্তমকে স্যাটা বোস পর্দায় দেখার পর দর্শক আমাকে নেবেই না।'
বিকাশের সেই কথা শুনে উত্তম বলেছিলেন 'বিকাশদা তুমি নিজেকে এত কম ভাবছ কেন? আমি যখন 'উত্তর ফাল্গুনি' প্রযোজনা করি, তোমাকেই তো মণীশ নিয়েছিলাম। দর্শক কি নেয়নি? '
আসলে উত্তমকুমারের করে ফেলা কালজয়ী চরিত্রের জুতোতে পা গলানো কঠিন ছিল বিকাশ রায়ের পক্ষে। তিনি বলেছিলেন 'উত্তম আমার নাটক দেখতে গেলে তো আরওই পারব না অভিনয় করতে।'
শেষ অবধি স্যাটা বোস রূপে মঞ্চে অবতীর্ণ হন বিকাশ রায়। পরিচালক রাসবিহারী সরকার।
তবে 'চৌরঙ্গী' নাটকে স্যাটা বোসের চরিত্র থেকে রোম্যান্টিক সব আবেদন, সব প্রেমের সংলাপ ছেঁটে ফেলা হয়েছিল। এমনকি সত্যসুন্দর বোসের প্রেমিকা সুজাতার চরিত্রটি চৌরঙ্গী নাটকে রাখাই হয়নি। ছবিতে সুজাতা মিত্র হয়ে ঝড় তোলেন অঞ্জনা ভৌমিক। কিন্তু নাটকে চরিত্রটি একেবারেই স্থান পায়নি। আসলে বিকাশ রায়ের বেশি বয়সের কারণে তাঁর যৌবনের প্রেমিকাকে আর হাজির করা হয়নি মঞ্চে। বিকাশ রায়ের ইমেজ ভেবেও এমন ভাবে প্রেম ফেলে চিত্রনাট্য লেখা হয়। শুধুমাত্র সুজাতার রেফারেন্স ছিল, কিন্তু কোনও চরিত্র ছিল না নাটকে। বিকাশ রায়ের রোল থেকে প্রেম বাদ দেওয়া হয়, যাতে উত্তমের ইমেজের সঙ্গে কোনও তুলনাই না আসে।
করবী গুহর চরিত্রে জয়শ্রী সেন, মিসেস পাকড়াশি মঞ্জু দে ও শংকরের চরিত্রে দিলীপ রায় অভিনয় করেন। মিস শেফালি এই নাটকে ক্যাবারে নাচ নেচে শিহরন জাগাতেন।
বিকাশ রায় সম্পর্কে উত্তমকুমার বলেছিলেন, 'বিকাশদার কণ্ঠস্বর এবং পাশাপাশি বলিষ্ঠভাবে শুদ্ধ উচ্চারণ যে কোনও শিল্পীর কাছেই শিক্ষণীয় বলে মনে করি। তিনি আমাকে বিখ্যাত রুশ অভিনেতা স্ট্যানিশ্লাভস্কি প্রণীত ‘An Actor Prepare’ বইটি উপহার দিয়েছিলেন। অভিনয় জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও আমি এই বইটি পড়েছি। ... বিকাশদার কণ্ঠস্বর প্রক্ষেপণের ব্যাপারটা আমি কখনওই অনুকরণ করিনি, অনুসরণ করে নিজের একটা স্টাইল তৈরি করেছি মাত্র।'
বিশ্বরূপাতে 'চৌরঙ্গী' নাটক দেখতে বিকাশ রায়কে না জানিয়েই গিয়েছিলেন উত্তমকুমার। অন্ধকারে হলে ঢুকে তিনি বসে পড়েন। নাটক শেষে সাজঘরে গিয়ে মহানায়ক তাঁর বিকাশদাকে জড়িয়ে ধরেন। তখন দু'জনের চোখেই জল। এমন রসায়ন ছিল দুই লেজেন্ডারি অভিনেতার।
স্বয়ং লেখক শংকর থেকে দেশের মাননীয় মন্ত্রী, আমলারাও দেখতে এসেছিলেন এই নাটক। হাতিবাগানের বিশ্বরূপাতে বহু রজনী পার করেছিল 'চৌরঙ্গী' নাটক। বর্তমানে আর বিশ্বরূপা থিয়েটারের চিহ্নটুকু নেই। সে জায়গা ভরে গেছে আকাশ ছোঁয়া মাল্টিস্টোরিডে। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্মৃতিচিহ্নও রইল না 'চৌরঙ্গী' নাটকের।