
শেষ আপডেট: 31 December 2023 17:11
আজ ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৩ সালের শেষ দিন। দেখতে দেখতে একটা গোটা বছর শেষ। বছর জুড়ে রাজনীতি থেকে খেলাধূলা যতটা চর্চায় থেকেছে, এই বছরটা ততটাই উল্লেখযোগ্য বাংলা বিনোদনের জন্য। বিনোদনের প্রতিটি আঙ্গিকে আমাদের মন ভরিয়েছে ২০২৩। যেসব উৎকৃষ্ট কাজ দেখে আমরা কখনও মুগ্ধ হয়েছি, কখনও আবার আমাদের চোখের কোণে জলও এসেছে। আসুন দেখে নিই ২০২৩ সালে বিনোদনের প্রতিটি অঙ্গনে সেরা সেরা কাজগুলি কী কী। চলচ্চিত্র থেকে নাটক হয়ে যাত্রাতেও এই বছর সেরা সেরা উপস্থাপনার সাক্ষী হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতিটি মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করেছেন পাঁচ নারী। তাঁরাই উঠে এসেছেন ২০২৩-এর শিরোনামে।
সেরা বাংলা ছবি: অর্ধাঙ্গিনী
প্রথম নারী - চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি 'অর্ধাঙ্গিনী'। এই নিয়ে বাংলা ছবিতে 'অর্ধাঙ্গিনী' নামে দ্বিতীয়বার কোনও ছবি মুক্তি পেল। ১৯৫৫ সালে 'অর্ধাঙ্গিনী' নামে ছবি বানিয়েছিলেন বিকাশ রায়। ২০২৩ সালে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'অর্ধাঙ্গিনী' দুই স্ত্রীর গল্প বলল। একজন প্রাক্তন, আর একজন বর্তমান। মাঝে এক পুরুষ। কিন্তু এই ছবিতে পুরুষ চরিত্রটি গড়ে উঠেছে দুই নারীকে অবলম্বন করে। ছবিতে তিনটি মূল চরিত্র থাকলেও ত্রিকোণ প্রেমের গল্প এই ছবি নয়। বরং বলা ভাল অর্ধাঙ্গিনী'র গল্প স্ত্রীভুজ। ত্রিভুজ নয়। দুই নায়িকাই এই ছবিতে সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুটি চরিত্রে রয়েছেন চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় ও জয়া আহসান। শুভ্রা ও মেঘনা। কিন্তু কৌশিকের ছবির প্রাণপ্রতিমা চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়। যাঁকে কৌশিক ছবিতে সুমন চ্যাটার্জ্জীর প্রাক্তন স্ত্রী শুভ্রা বানিয়েছেন। ছবিতে চূর্ণী ও জয়ার সমান গুরত্ব থাকলেও 'অর্ধাঙ্গিনী' আদতে চূর্ণীর ছবি। বহুদিন পর কোনও বাংলা ছবিকে নিজের হাতে যেন নিয়ন্ত্রণ করলেন চূর্ণী। তিনি ছবির প্রতিটি চরিত্রকে নিজের হাতে রাখা সুতোর টানে নাচাচ্ছেন। চূর্ণীর সংলাপ বছরের হিট। "প্রাক্তন স্ত্রী মহাজনের মতো,সে আসলটা পায় না, কিন্তু সুদটা বুঝে নেয়।" শুভ্রা চূর্ণী মেঘনা জয়াকে বলতে ছাড়ে না, "তুমি যে চেয়ারটায় বসে আছো সেটা আমি অনেকদিন আগেই ডিসকার্ড করে চলে এসেছি।" মেয়েদের চোখে বিজয়ের জল এনেছে চূর্ণীর এসব সংলাপ। অনেকদিন পর বাংলার মননশীল দর্শক এই ছবি বারবার সিনেমাহলে গিয়ে দেখেছে। যা নজিরবিহীন। 'এভাবে হেরে যাই, যেই ঘুরে তাকাই, কেমন যেন আলাদা আলাদা সব', অনুপম রায়ের কথায় সুরে ইমন চক্রবর্তীর গানটি আজও পাবলিক ডিমান্ডে থাকে।
সেরা থিয়েটার-বিনোদিনী অপেরা
দ্বিতীয় নারী- সুদীপ্তা চক্রবর্তী
এই বছর অবন্তী চক্রবর্তীর নির্দেশনায় 'বিনোদিনী অপেরা' নাটকের যতগুলি শো শহরের প্রতিটি নাট্যমঞ্চে হয়েছে, প্রতিটি হাউজফুল। নাটকের সেই স্বর্ণযুগ যেন ফিরিয়ে আনল বিনোদিনী অপেরা। নটী বিনোদিনীর নামভূমিকায় সুদীপ্তা চক্রবর্তী। মঞ্চে সুদীপ্তা ফুটিয়ে তুলছেন সমাজের যাবতীয় ছিছিক্কারকে উপেক্ষা করে সূর্যমুখীর মতো মাথা উঁচু করে বাঁচা বিনোদিনী দাসীর সাধিকা হয়ে ওঠার এক মহাজীবনের উপাখ্যান। মুগ্ধ নয়নে হলভরা দর্শক দেখল, বাঙালির অবসেশন নটী বিনোদিনীকে কী অসামান্য দক্ষতায় জীবন্ত করে তুললেন বিপ্লবকেতন কন্যা। 'বিনোদিনী অপেরা' শুধু জীবনীতেই আটকে নেই, বহতা সময়ের কথা আছে এই নাটকে। যে দৃশ্যে বলা হয়, বছর কাটছে, বিনোদিনী মঞ্চে নেই, সেই দৃশ্য গায়ে কাঁটা দেয়। চৈতন্যলীলার বিনোদিনীর আত্মা থেকে বেরিয়ে সুদীপ্তা দর্শকদের প্রশ্ন করেন, কেন বিনোদিনীর শেষ ইচ্ছে 'বিনোদিনী মঞ্চ' কেউ করল না? কেন স্টার থিয়েটারে আর থিয়েটার হয় না, তা সিনেমাহল হয়ে গেল? কেন স্টার থিয়েটারের পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আজ বিনোদিনীর বাড়ি? আজকের পুরুষরাও তাঁর স্মৃতিফলকে পানের পিক ফেলে বিনোদিনীর আত্মাকে যন্ত্রণা দিতে ভোলেন না। সুদীপ্তার সঙ্গেই চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে প্রতিটি দর্শকের। আজকের সময়ের দর্শক যাঁরা এই নাটকটি দেখলেন তাঁরা এক ঐতিহাসিক সময়ের সাক্ষী থাকলেন। এমন নাটক কিন্তু বারবার হয় না। মঞ্চে সুদীপ্তা সহ প্রতিটি শিল্পী নজির গড়লেন। অনবদ্য নির্দেশক অবন্তী। প্রবাসে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যাওয়ার দাবি রাখে 'বিনোদিনী অপেরা'।
সেরা ওটিটি- ছোটলোক
তৃতীয় নারী- দামিনী বেণী বসু
ওটিটির মমুখ্য চরিত্রের দুনিয়ায় খানিকটা হঠাৎ করেই এসে পড়েছেন ‘সাবিত্রী মণ্ডল’ ওরফে দামিনী বেণী বসু। জি ফাইভে এ বছর মুক্তি পাওয়া ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী পরিচালিত ওয়েব সিরিজ ‘ছোটলোক’-এর অন্যতম প্রধান চরিত্র সাবিত্রী। সিরিজে প্রিয়াঙ্কা, গৌরব চক্রবর্তী, ইন্দ্রাণী হালদারের মতো নামী শিল্পীরা থাকলেও দামিনী একাই লাইমলাইট নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন। দর্শকদের মতে, তাঁর অভিনয় এতটাই বাস্তবোচিত যে, মনে হচ্ছে সত্যিই কোনও পুলিশ অফিসারকে সামনে দেখছেন তাঁরা। ‘মর্দানি’-র রানি মুখোপাধ্যায় বা ‘দৃশ্যম’-এর তব্বুর থেকেও ছোটলোকের বেণীকে দর্শক ভীষণ কাছের মানুষ ভাবতে পারছে। দামিনী বেণী বসুকে দীর্ঘসময় শুধুমাত্র অকিঞ্চিতকর বা পরিচারিকার চরিত্রেই কাস্ট করত টলিউড। ছোটলোক ওয়েব সিরিজে দামিনী তাঁর জাত চিনিয়েছেন। টলিউডের ক্ষমতার পিরামিড দামিনীর মতো প্রকৃত শিক্ষিত সহজাত অভিনেত্রীকে এতদিন নীচের দিকেই রেখে দিয়েছিল। ২০২৩ সালের 'ছোটলোক' দামিনীর কেরিয়ারে বাঁকবদল তো বটেই। এই জয়ের ধারা তাঁর জীবনে অটুট থাকুক।
শিরোনামে সেরা সিরিয়াল- মেয়েবেলা
চতুর্থ নারী- রূপা গঙ্গোপাধ্যায়
২০২৩ এর শুরুতেই শুরু হয়েছিল 'মেয়েবেলা' সিরিয়াল। যে সিরিয়াল দিয়ে রাজনীতির অঙ্গন ছেড়ে আবার অভিনয়ে কামব্যাক করেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। রুচিসম্মত গল্প দেখে আবার ছোট পর্দাকে ভরসা করেছিলেন রূপা। টিভির পর্দায় দ্রৌপদীর কামব্যাকে দারুণ খুশি হয়েছিল দর্শক। বাড়ির মেজো বৌ বীথির চরিত্রে সবার মন জয় করে নেন রূপা। 'মেয়েবেলা' শুরুর দিকে আর পাঁচটা অতিনাটকীয় সিরিয়ালের থেকে স্বতন্ত্র ছিল। কিন্তু ঘটল ছন্দপতন! টিআরপি ধরে রাখতে রূপার চরিত্রটিকে অত্যাচারী শাশুড়ি করে দেওয়া হল। সেখানেই প্রতিবাদ হানেন যাজ্ঞসেনী। মেয়েবেলা সিরিয়াল বছরের সেরা বিনোদনের তালিকায় থাকবে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের এই সাহসিকতার জন্যই।
যেখানে প্রতিটি অভিনেতা অভিনেত্রী নিজেদের পেশা বাঁচাতে মাথা নত করেন, খারাপ চিত্রনাট্যের বশ্যতা স্বীকার করেন, সেখানে রূপা একমাত্র ব্যতিক্রম। খারাপ চিত্রনাট্যের সিরিয়াল পত্রপাঠ ছেড়ে দেন রূপা। সেটা করেই আরও বেশি করে দর্শকদের ভালবাসা শ্রদ্ধা-আদায় করে নেন অভিনেত্রী। কেন টিআরপির কাছে নতিস্বীকার করবে সিরিয়ালের সুস্থ গল্প! রূপার এই সাহস নজির স্থাপন করল টলিপাড়ায়। রূপার পরিবর্ত রূপে বীথি চরিত্রে শেষ কদিন অভিনয় করেছিলেন অনুশ্রী দাস। কিন্তু সেই মেয়েবেলার বেলা ফুরোলই। সুস্থ চিত্রনাট্যের সাহস রাখলে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের স্টারডম ও সাবলীল অভিনয় আরও এক ইতিহাস করতে পারত। তবু মন ভরানো একান্নবর্তী পরিবারের গল্প, জায়েদের আড্ডা, ডোডো-মৌয়ের রোম্যান্সে মেয়েবেলা সিরিয়াল মনে রয়ে যাবে।
সেরা যাত্রা- জোড়াদিঘীর চৌধুরী বাড়ি
পঞ্চম নারী- কাকলি চৌধুরী
বিনোদনের বাকি সব মাধ্যম নিয়ে বিস্তর চর্চা করলেও চিরকালই ব্রাত্য থেকে যায় বাংলার যাত্রা। যাত্রা চট করে দেখবার সৌভাগ্য শহরের লোকেদের হয় না। আবার যাত্রাকে কখনও লাইমলাইটে রাখতেও চায় না মিডিয়া। যে কারণে কোথায় কবে কী যাত্রা হচ্ছে তা আমাদের জানা হয়ে ওঠে না। যাত্রা মানেই আজও লোকে ভাবে মেলোড্রামার কারখানা। সেই চেঁচিয়ে অতিনাটকীয় অভিনয়। কিন্তু যাত্রা অনেক বদলে গেছে এখন। আজকালকার টেলিভিশন সিরিয়ালের বালখিল্য চিত্রনাট্যের থেকে যাত্রার সাহসী প্লট অনেক বেশি উন্নত। যাত্রার অভিনয় অতিনাটকীয় থেকে অতি সাবলীল হতে পেরেছে যে দুজন মানুষদের হাত ধরে তাঁরা যাত্রার উত্তম-সুচিত্রা অনল-কাকলি। যাত্রার সাতাশ বছর অতিক্রান্ত হিট জুটি তাঁরা। পালাকার অনল চক্রবর্তীর কলমের তুরুপের তাস কাকলি।
২০২৩ সালে এই জুটির যাত্রা 'জোড়াদিঘীর চৌধুরী বাড়ি' যাঁরা দেখেছেন তাঁদেরই রোমহর্ষক লেগেছে। কাকলি মঞ্চে আসা মানেই আগুন লাগিয়ে দেন। তাঁর থেকে চোখ ফেরানো যায় না। শার্প ফিগার থেকে হাস্কি কণ্ঠস্বরে কাকলির অভিনয়ে পাওয়া যায় সুপ্রিয়া দেবীর লাস্য এবং দাপট। বাংলার মানুষের ভালবাসায় 'জোড়াদিঘীর চৌধুরী বাড়ি' যাত্রাটি ৫০ রজনী পার করেছে। শুধু তাই নয়, ৩২ বছর পর মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে আবার যাত্রা মঞ্চস্থ হল রবীন্দ্রসদনে। 'জোড়াদিঘীর চৌধুরী বাড়ি' দিয়েই যাত্রা উৎসবের সূচনা হল এই বছর। রবীন্দ্রসদন খুলতেই হাউসফুল বোর্ড ঝোলাতে হল সেদিন। শহরের দর্শক প্রমাণ করেছেন, তাঁরা যাত্রাকে ভোলেনি। মঞ্চে কাকলির আগমন বুঝিয়ে দিল চিৎপুরে কাকলি চৌধুরী একটাই হয়। এমন অভিনয়ের সাক্ষী থাকল কলকাতা এই ২০২৩ সালেই।
২০২৪ সালে বিনোদনের দুনিয়ার এই পাঁচ সাহসী নারীকে যেন নতুন রূপে দেখতে পাই আমরা। 'দ্য ওয়াল'-এর তরফ থেকে আগামীর জন্য নিরন্তর শুভেচ্ছা রইল।