
বাংলা ছবি হল পাচ্ছে না।
শেষ আপডেট: 19 December 2024 11:31
বাংলা ছবির (Bengali Movies) বাজারে এবছরটা তেমন সুখের ছিল না। খুব বেশি সিনেমা তৈরি হয়নি এবছর। কিন্তু বছরের শেষে সে ছবি খানিক বদলাতে চলেছে। কারণ দু’দিন পরেই, ২০ ডিসেম্বর মুক্তি পেতে চলেছে চার-চারটি বাংলা ছবি।
কিন্তু এই সুখবরের আড়ালেই ঘনিয়েছে অনিশ্চয়তার মেঘ। কারণ চারটি ছবির জন্য দরজা খুলছে না প্রায় কোনও হলেরই! আজ ১৮ ডিসেম্বর। হাতে আর মাত্র একটা দিন। অথচ এখনও শহরের প্রায় কোনও প্রেক্ষাগৃহেই নাম তুলতে পারেনি ‘সন্তান’, ‘খাদান’, ‘চালচিত্র’ এবং ‘৫ নং স্বপ্নময় লেন’।
পাবেই বা কী করে, দক্ষিণী ব্লকব্লাস্টার ‘পুষ্পা’র রাজত্বে তো আর সবাই রাজা নয়! তবে বনের রাজার মতো সিনেমার আর এক রাজা হিসেবে ভালই পাল্লা দিচ্ছে ‘মুফাসা’। ফলে এই অবস্থায় বাংলা সিনেমার অবস্থা বঞ্চিত প্রজাদের মতোই।
একদিকে রব উঠছে ‘বাংলা সিনেমার পাশে দাঁড়ানো’ জরুরি বলে। আর একদিকে বাংলা সিনেমার ইন্ডাস্ট্রির শুদ্ধিকরণ নিয়ে রীতিমতো বিক্ষোভ চলছে পরিচালক-গিল্ড মহলে। আর এসবকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে হিন্দি-ইংরেজি ছবি দিয়েই ‘হাউসফুল’ করে রাখা হচ্ছে বাংলার সব হল! বাংলা সিনেমা ঢুকতেই পারছে না সেখানে!
এই পরিস্থিতিতেই বাংলা ছবির নায়ক দেব রীতিমতো ক্ষমাই চেয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। লিখেছেন, সর্বোচ্চ চেষ্টার পরেও খাদান ছবির বুকিং শুরু করানো যাচ্ছে না, কারণ কোনও হলই পাচ্ছে না ছবিটি। তিনি হলের জন্য সবরকম চেষ্টা করছেন বলেও লিখেছেন।
Sincere apologies to my audience as advance opening is still not open. Trust me I'm still trying and fighting to get shows for #Khadaan and open the advance. But KHADAAN is not getting shows still due to other language film distribution here in Bengal.
— Dev (@idevadhikari) December 18, 2024
Really sorry , please be… pic.twitter.com/01scJno7XL
প্রশ্ন উঠছে, দেবের খাদানের মতো বিগ বাজেটের, প্রথম সারির প্রোডাকশন হাউসের ছবিরই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে ছোট বাংলা সিনেমারা যাবে কোথায়? কীভাবেই বা তৈরি হবে নতুন ছবি? আদৌ ছবি বানানোর খরচই বা কীভাবে তুলবেন বাঙালি পরিচালকরা?
তবে এসব প্রশ্নের উল্টোদিকে যে সপাট উত্তর মিলছে, তা চরম বাস্তব। তার সামনে আর খুব একটা কিছু তত্ত্বের কথা বলার জায়গা থাকে না। সেটা হল, দর্শক। চাহিদা। ব্যবসা। যে ছবি ভাল ব্যবসা দেবে, যে ছবি প্রেক্ষাগৃহ ভরাবে, হলমালিকরা তো সেই ছবিই চালাবেন। কারণ দিনের শেষে তাঁরা তো ব্যবসা করছেন, রোজগার করছেন, খেয়েপরে বাঁচছেন, হলকর্মীদের বেতন দিচ্ছেন। তাঁদের তো মুখ্য উদ্দেশ্য বেশি টিকিট বিক্রি করাই। তাহলে যে ছবির চাহিদাই কম দর্শকদের কাছে, সে ছবি তাঁরা কেনই বা চালাবেন?
আবার এটাও ঠিক, ছবি না চালালে তো চাহিদা তৈরিও হবে না। দর্শকরা জানবেনই বা কী করে, ভাল বাংলা ছবির কথা।
এই নিয়ে গলা তুলেছেন তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও। এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, সামনে চারটি নতুন বাংলা সিনেমা আসছে। ...বাংলা ছবির হল পেতে সমস্যার কথা শোনা যাচ্ছে কেন? হিন্দি বা অন্য ছবি চলবে। কিন্তু বাংলা ছবিকে যথাযথভাবে দর্শকের দরবারে হাজির হওয়ার সুযোগ তো দিতে হবে।
পুষ্পা 2, চলুক। কিন্তু সামনে চারটি নতুন বাংলা সিনেমা আসছে। খাদান, সন্তান, 5 নং স্বপ্নময় লেন, চালচিত্র। পাশাপাশি বহুরূপী এখনও দাপটে চলছে। বাংলা ছবির হল পেতে সমস্যার কথা শোনা যাচ্ছে কেন? হিন্দি বা অন্য ছবি চলবে। কিন্তু বাংলা ছবিকে যথাযথভাবে দর্শকের দরবারে হাজির হওয়ার সুযোগ তো… pic.twitter.com/Bii3f1wMQd
— Kunal Ghosh (@KunalGhoshAgain) December 18, 2024
তবে বাংলা ছবি একেবারেই যে কোথাও নেই তা নয়। শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ‘বহুরূপী’ মোটামুটি ভালই ব্যবসা করছে। কিন্তু তাই বলে তো আসন্ন চারটি নতুন বাংলা ছবির মধ্যে কোনওটি জায়গা করতে পারবে না, তা হতে পারে না!
এখনও পর্যন্ত অ্যাডভান্স বুকিংয়ের দরজা খুলে গিয়েছে। এবং তারপর যা দেখা যাচ্ছে, সর্বাধিক হল পেয়েছে ‘মুফাসা: দ্য লায়ন কিং’, প্রায় ১৫টি। অন্যদিকে প্রতিম দাশগুপ্তর ‘চালচিত্র’ পেয়েছে মাত্র একটি সিনেমাহল। মানসী সিনহার ‘৫ নং স্বপ্নময় লেন’ও পেয়েছে একটি সিনেমাহল। দেবের ‘খাদান’-এর অবস্থাও একই, একটি মাত্র সিনেমাহল পেয়েছে সে। তবে অ্যাডভান্স বুকিংয়ের দরজা এখনও খোলেনি রাজ চক্রবর্তীর ‘সন্তান’। (তথ্য: অনলাইন টিকিট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংগৃহীত)
বাংলা ছবির এই পরিস্থিতি নিয়ে বাংলা পক্ষের গর্গ চট্টোপাধ্যায় সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলছে সরকারের দিকে। তিনি বলছেন, বাংলা সিনেমার এই পরিস্থিতির কারণ প্রশাসনিক উদ্যোগহীনতা ছাড়া কিছু নয়। তাঁর অভিযোগ, 'আইনক্স-সহ বড় বড় মাল্টিপ্লেক্সগুলোর অবাঙালি মালিকানা এবং তাদের সঙ্গে হিন্দি ছবিগোষ্ঠীর যে আঁতাঁত, সেটাই বাংলা ছবিকে কোণঠাসা করছে। অন্য কোনও রাজ্যে এমনটা করতে পারে না। একমাত্র এখানেই এটা সম্ভব, কারণ কেউ ধমকানোর-চমকানোর নেই।'
বাংলা ছবি রিলিজ হলে কত শতাংশ হলে কতটা জায়গা পাবে, তা নিয়ে রাজ্য সরকারের নিয়ম থাকলেও, সেই নিয়ম পালন করা নিয়ে সরকারের কোনও মাথাব্যথা নেই বলেও অভিযোগ তুলেছেন তিনি। তবে সরকার যাই করুক, বাঙালিরা যে বাংলা ছবি দেখতে চান না, সেই নিয়ে কী বলছেন গর্গ? তাঁর সাফ বক্তব্য, 'বাংলা ছবি বাঙালিরা দেখছে না, এটা একটা মিথ ও মিথ্যে, যা ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য খাড়া করে রাখা হয়েছে। অন্য কোনও রাজ্যে এমন হয় না, সব ভাষায় ছবি চলে, কেবল বাংলায় বাংলা ছবি চলে না, এটা হতে পারে?'
পুষ্পার ধুমধাড়াক্কা হিট হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, 'পুষ্পা বাংলায় ডাবড হয়েও এখানে চলেনি, চালানোই হয়নি। অন্য সব রাজ্যে আঞ্চলিক ভাষায় চলেছে। কারণ তারা আইন করেছে। আইন থাকলে কিন্তু কাজও বাড়বে। কারণ সেই ভরসায় আরও ছবি তৈরি হবে। অথচ এখানে খাদানের মতো সিনেমাই হল পায় না। তাহলে অন্য ছবি হবে কী করে। সরকারের সদিচ্ছা ও উদ্যোগের বড় অভাব রয়েছে বাংলা ছবি নিয়ে। তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই, দায় নেই।'
গর্গ আরও বলেন, 'দেবের ছবি যে হল পায়নি, তাই নিয়ে দেব আজ টুইট করেছেন। কিন্তু তিনি কি সরকারকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন? এই নিয়ে কোনও কমিটি গড়ার চেষ্টা করেছেন? আসলে যে সমস্যার আঁচ যখন যাঁর গায়ে লাগে, তখন তিনি প্রতিক্রিয়াশীল হন। তা বাদে কারওই হয়তো কিছু যায় আসে না, সে জন্যই বাংলার, বাঙালির এই অবস্থা।'