
শেষ আপডেট: 4 April 2023 13:29
ওটিটি এবং বড়পর্দা, দুই মাধ্যমেই সুপারহিট একেন বাবু। শৈল শহরের পর দুই সঙ্গী বাপ্পাদিত্য, প্রমথকে নিয়ে রহস্যের জট খুলতে দুঁদে গোয়েন্দার এবারের ডেস্টিনেশন মরুভূমি। ১৪ এপ্রিল এসভিএফ প্রযোজিত ছবি (Bengali Movie) 'দ্য একেন: রুদ্ধশ্বাস রাজস্থান' (The Eken-Ruddhaswas Rajasthan) প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে। টানটান উত্তেজনায় ভরপুর ছবির ট্রেলার প্রকাশ্যে আসতেই দর্শকদের এই ছবি নিয়ে উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে উঠেছে। ছবির পরিচালক জয়দীপ মুখোপাধ্যায়। সম্প্রতি ছবি সংক্রান্ত এক সাংবাদিক সম্মেলনের ফাঁকে পরিচালক জয়দীপ মুখোপাধ্যায় একান্তে ধরা দিলেন। এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে উঠে এল ছবি সংক্রান্ত নানা কথা। কথা বললেন চৈতালি দত্ত।
ওটিটির পর বড়পর্দাতেও সুপারহিট একেন বাবু। সিরিজ ও বাংলা ছবিতে নতুন গোয়েন্দার আবির্ভাব অচিরেই জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি হয়ে উঠেছে। পরিচালক হিসেবে আপনার অভিমত?
(হেসে) থ্যাঙ্ক ইউ। আমার খুবই সৌভাগ্য যে গতবছর কোভিড পরিস্থিতির মধ্যেও 'একেন' বড়পর্দায় সাফল্য পেয়েছে।দর্শক ছবি এতটাই পছন্দ করেছেন, তার সূত্র ধরেই আমরা আবার দ্বিতীয় ছবিটা তৈরি করতে পেরেছি। যা একজন পরিচালক হিসেবে বিরাট পাওনা। কোথাও গিয়ে প্রমাণ করতে পেরেছি সিরিজে যেটা ছিল ছবির মধ্যেও মানুষ সেই স্বাদ পেয়েছেন। তবেই তাঁরা ছবিকে ভালবেসেছেন। ছবি করতে গেলে পরিচালকের দায়িত্ব অনেকটাই বেড়ে যায়। কারণ ছবি প্রেক্ষাগৃহে দেখার মত আদৌ হল কি হল না, সেটা পরিচালকের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আশা করি সেটা ছিল বলেই মানুষ একেন-কে ভালবেসেছেন।

ব্যোমকেশ,ফেলুদার গোয়েন্দাগিরির পাশাপাশি একেন যে অল্প সময়ে এতটা সাফল্য পাবেন পরিচালক হিসেবে আপনি আগের থেকেই কি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন?
একেবারেই না। যখন ওয়েব সিরিজ দিয়ে একেন-এর সূচনা হয় তখন তিনটে সিজন অন্য পরিচালকেরা তৈরি করেছিলেন। সেই সময় গল্পটাকে যাঁরা মনোনীত করেছিলেন তখন সেইভাবেই একেন সৃষ্টি হয়েছিল। ওয়েব সিরিজের জন্য পদ্মনাভ দাশগুপ্তর চিত্রনাট্য এবং একেন্দ্র সেন রুপী অনির্বাণ চক্রবর্তীর অভিনয় দুইয়ের মধ্যে এতটাই সমন্বয় ঘটে, যার ফলে একেন তিনটে সিজন হয়ে যাওয়ার পর আমি চতুর্থ সিজন থেকে পরিচালনায় হাত দিয়েছিলাম। সেটা সুপারহিট হওয়ার পরেই সকলের তখন একেনকে নিয়ে সিনেমার ভাবনা মনে আসে। আমার মতে ফেলুদা বা ব্যোমকেশ সাহিত্যে আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিল। তারপরে তাঁরা সিনেমা বা ওয়েব সিরিজে জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু একেন সম্পূর্ণ ওয়েব সিরিজের হাত ধরেই জনপ্রিয় হয়েছে। তার আগে সাহিত্য হিসেবে খুব একটা মানুষজন একেন নিয়ে পড়ার সুযোগ পাননি বলে আমার ধারণা। একেনকে জনপ্রিয় করেছেন অভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তী, চিত্রনাট্যকার পদ্মনাভ দাশগুপ্ত এবং সুজনদার গল্পের নির্যাস। সেই জনপ্রিয়তাকে আমি বয়ে নিয়ে চলেছি। যাতে যথার্থ অর্থে মানুষ একইরকমভাবে একেনকে ভালবাসেন, এটা আমার বড় দায়িত্ব।
পরিচালক হিসেবে এই দায়িত্ব কতটা কঠিন মনে হচ্ছে?
ঠিক কঠিন বলব না। তবে এটা বলব মানুষ যেন কোনওদিন না বলেন আর একেনকে দেখতে ভাল লাগছে না। এই বিষয়টা পরিচালক হিসেবে সবসময় আমায় মাথায় রাখতে হয়। কীভাবে নতুন করে একেনকে আবার সামনে আনা যায় এবং গল্পগুলোকে নতুন আঙ্গিকে বলা যায় সেটাই এখন আমার বড় চ্যালেঞ্জ। আমি যদি একেনকে যথার্থভাবে উপস্থাপন করতে না পারি, তখন একেন-এর প্রতি মানুষের আগ্রহ, ভালবাসা কমতে শুরু করবে। অন্যান্য গোয়েন্দার সঙ্গে একেনের তুলনা এই কারণেই চলে না তাঁরা তো অনেক আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। সেই গোয়েন্দাদের অনেক গল্প ইতিমধ্যেই আমরা পর্দায় দেখে ফেলেছি। একেনকে ইতিমধ্যে মানুষ সাতবার দেখে ফেলেছেন। এবার অষ্টমবার মানুষ দেখবেন। একেন-এর পথ চলা এখনও অনেকটাই বাকি।
দেখুন ট্রেলার:
পাহাড় জয় করার পর মরু শহর রাজস্থানে কী ধরনের রহস্য উদঘাটন করতে একেনকে দেখা যাবে?
লন্ডনের এক অকশন হাউসে কিছু দুষ্প্রাপ্য মূর্তি দেখে একজন প্রত্নতত্ত্বের অধ্যাপক বলেন যে অধিকাংশ মূর্তিগুলো রাজস্থান থেকে চুরি যাওয়া। মূর্তি চুরির ঘটনা উদঘাটনে একেন জড়িয়ে পড়বে সেটা যেমন ঠিক, আবার গল্পে সেটাই একমাত্র ঘটনা তেমনটাও নয়। এখানে এমন ধরনের মার্ডার রয়েছে, আমার ধারণা এখনও পর্যন্ত ভারতীয় সিনেমায় সেই ধরনের মাডার মিস্ট্রি কেউ দেখেননি। সেই ধরনের মার্ডার বিদেশি ছবিতে দেখা যায়। আমি নিজে এখনও পর্যন্ত ভারতীয় কোনও সিনেমায় সেই ধরনের মার্ডার মিস্ট্রি দেখিনি যা এই গল্পের ইউএসপি। যেহেতু রাজস্থানের প্রেক্ষাপটে এই গল্প তাই পরিচালক সত্যজিৎ রায় আর সোনার কেল্লাকে ট্রিবিউট দিতে পারি সেভাবেই আমি কাজটা করেছি। কারণ যখন নয়-দশ বছর বয়স, আমার প্রথম দেখা সিনেমা 'সোনার কেল্লা'। তারপর সেই থেকে ফেলুদাকে ভাললাগা এবং আমার ফেলুদা সব বইপত্র পড়া। এক্ষেত্রে সেরকমই একটি আকর্ষণীয় গল্প যা রাজস্থানের জয়সলমীর, সোনার কেল্লা, যোধপুর এবং তার আশপাশে ছবির শ্যুটিং হয়েছে। সেখানে রাতের অলিগলি যেভাবে ক্যামেরায় ধরা পড়েছে সত্যিই বাংলা ছবিতে আগে দেখা যায়নি। এরকম একটা ছবির শ্যুটিং করতে গিয়ে সেখানে আমি যতটা রোমাঞ্চিত, ততটাই নস্টালজিক হয়েছি।
এই ছবির হাত ধরে সোনার কেল্লা দেখার সুযোগ বাঙালি দর্শক আবার কতটা পাবেন?
আমার ধারণা সোনার কেল্লা, জয়সলমীরকে যেভাবে বাঙালি দর্শক পাবেন এটা আজ পর্যন্ত কোনও বাংলা বা হিন্দি ছবিতে হয়নি। গল্পে কোনও একটা জায়গা দেখানোর জন্যই যে দেখানো হয়েছে তা কিন্তু একেবারেই নয়। চিত্রনাট্য এমনভাবে বোনা যাতে মানুষ গল্পের ভেতর দিয়েই সেই লোকেশনেগুলোর মধ্যে পৌঁছে যেতে পারেন। এমনভাবে জায়গাগুলোকে এক্সপ্লোর করা হয়েছে, যা আজ পর্যন্ত কোনও বাংলা ছবিতে হয় নি।
সুজন দাশগুপ্তের লেখা গল্পকে ছবিতে কতটা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে?
সুজনদার সব গল্পই বিদেশের প্রেক্ষাপটে লেখা। কারণ উনি একেনকে নিউজার্সির একজন বাঙালি গোয়েন্দা হিসেবে গল্পে রেখেছেন। যেহেতু গল্পকে ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে ফেলতে হয়েছে সেখানে কোথাও গিয়ে চিত্রনাট্যকার পদ্মনাভ দাশগুপ্তকে বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। কারণ নির্দিষ্ট গল্পকে কোন প্রেক্ষাপটে নিয়ে গেলে দেখতে ভাল লাগবে, গল্পের প্রতি মানুষের কীভাবে আকর্ষণ বাড়বে, গল্পের আরও ঘাত-প্রতিঘাত তৈরি হবে ইত্যাদি সূক্ষ্মদিকগুলো পদ্মনাভকে মাথায় রাখতে হয়েছিল। আমরা যেটা সবসময় করতাম সেটা হল যে গল্পকে প্রথমে নির্বাচন করতাম। পদ্মনাভ সেটার চিত্রনাট্য নিজের মতো করে একটা জায়গায় ফেলে তার সঙ্গে আরও কিছু উপাদান সংযোজন করে সেই গল্পকে আমরা সুজনদাকে পাঠিয়ে দিতাম। এটা প্রতিটা ক্ষেত্রেই হয়েছে। সুজনদার অনুমতি মিললে তবেই সেই গল্প নিয়ে আমরা এগিয়েছি। এবারের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এই ছবির চিত্রনাট্য সুজনদার খুব পছন্দ হয়েছিল।
আপনি তো সাংবাদিক সম্মেলনে ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন নববর্ষের দিন পরের একেনের ঘোষণা করবেন। কিন্তু এখন তো সুজন দাশগুপ্ত ইহলোকে নেই। চিত্রনাট্যের অনুমতি কীভাবে নেওয়া হবে?
আসলে আমরা নিজেদের মতো করে অনেক কিছুই আলোচনা করি। গত বছর যখন একেন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় সেই দিন থেকেই মানুষের এত উৎসাহ দেখেছিলাম তখন আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করে ফেলেছিলাম যে পরের গল্প হবে মরুভূমিতে। ১৪ এপ্রিল 'দ্য একেন রুদ্ধশ্বাস রাজস্থান' ছবি দেখে মানুষের মধ্যে যদি উন্মাদনা চোখে পড়ে তখন আমরা ভাবব মানুষকে কোন গল্পের মাধ্যমে কোথায় নিয়ে যাওয়া যায়। সুজনদার স্ত্রী শমীতা দাশগুপ্তের সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা হয়েছে। উনি চান সুজনদার সৃষ্টি একেন সবার মনে বেঁচে থাকুক। সুজন দা এবং ওঁনার স্ত্রী শমীতাদি বহু গল্প একসঙ্গে লিখেছেন। আমি জানি সুজনদার কিছু গল্পে শমীতাদির অবদান যথেষ্ট। এবারে যে গল্প আমরা নির্বাচন করব, ওটা শমীতাদিকে জানিয়ে চিত্রনাট্য লেখা হবে। এরপর সেই চিত্রনাট্য উনি দেখে অনুমোদন করলে তবেই আমরা সেই গল্প নিয়ে এগিয়ে যাব।

একেনকে নিয়ে ওয়েব সিরিজের 'ফোর সিজন' থেকে বড়পর্দায় প্রথম ছবির বৈতরণী পেরিয়ে দ্বিতীয় ছবির জার্নিটা কেমন ছিল?
আমি যখন প্রথম ওয়েব সিরিজ 'সিজন ফোর' পরিচালনা করার দায়িত্ব পাই, তখন হইচই প্ল্যাটফর্মে অনিন্দ্য বন্দোপাধ্যায় ক্রিয়েটিভ হেড ছিলেন। সেই সময় অনিন্দ্য আমায় বলেছিলেন, "অতিমারির সময় এই সিজন তুই শ্যুট করছিস। তাই তোকে বেশি বাজেট দিতে পারছি না। কিন্তু এটা যদি হিট করে যায় তবে একেনকে নিয়ে আরও এগিয়ে যাব। আর যদি হিট না করে তবে একেনকে নিয়ে এটাই শেষ সিজন।" সেই কথাটা আমার কাছে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ওয়েব সিরিজের চার নম্বর সিজন যখন সুপারহিট হয়ে গেল তারপরই একেনকে নিয়ে ছবির ভাবনা এল। সুতরাং ওয়েব সিরিজ মানুষের কাছে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা হওয়ার পর আবার সিনেমাতেও একেনকে সমান ভাবে জনপ্রিয় করতে পেরেছি এটা আমার কাছে নিঃসন্দেহে বড় আত্মতুষ্টি।
রাজস্থানে শ্যুটিংয়ে কোনও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা?
আমরা প্রথম যেদিন ভোর সাড়ে ছটা-সাতটার সময় যখন সোনার কেল্লার সামনে দাঁড়ালাম, সোনার কেল্লা কেন বলা হয় সেদিন আমরা বুঝতে পারলাম। সূর্যের প্রথম রশ্মি যখন হলুদ পাথরের উপর এসে পড়ল, পুরো কেল্লাটা যেন নিমেষে স্বর্ণাভ হয়ে গেল। আমরা ওখানে যারা দাঁড়িয়েছিলাম, প্রত্যেকের চোখে মুখে যেন বিস্ময় আর মুগ্ধতার ছোঁয়া। সেদিন বোধহয় সত্যিকারের প্রথম সোনার কেল্লা দেখলাম।
এবারের গল্পে কারা কারা অভিনয় করেছেন?
অনির্বাণ চক্রবর্তী, সুহত্র মুখোপাধ্যায়, সোমক ঘোষ তো আছেনই। অন্য শিল্পীরা হলেন রজতাভ দত্ত, সুদীপ মুখোপাধ্যায়, সন্দীপ্তা সেন, রাজেশ শর্মা, কৃষ্ণেন্দু দেওয়ানজি, অনন্যা সেনগুপ্ত, দেবশ্রী চক্রবর্তী, আর জে শেখর প্রমুখ। এছাড়াও জয়সলমীর এবং যোধপুরের বহু গুণী নাট্যশিল্পীরা এই ছবিতে অভিনয় করেছেন।
কাহিনি - সুজন দাশগুপ্ত।
চিত্রনাট্য ও সংলাপ - পদ্মনাভ দাশগুপ্ত।
সম্পাদনা - রবি রঞ্জন মৈত্র।
ক্যামেরা - রম্যদীপ সাহা।
সুরকার - অম্লান চক্রবর্তী।
আবহসঙ্গীত - শুভদীপ গুহ।
প্রোডাকশন ডিজাইনার - মৃদুল, শাশ্বতী।
প্রযোজনা - এস ভিএফ।
নিবেদনে - শ্রীকান্ত মোহতা, মহেন্দ্র সোনি।
পরম-স্বস্তিকার ‘শিবপুর’ নিয়ে সমস্যা অভিনেত্রী প্রযোজকের, থানায় যাবেন স্বস্তিকা?