
শেষ আপডেট: 12 July 2021 09:25
খুব সহজেই আমরা মানুষকে বিশেষ করে সেলেব্রিটিদের বিচার করে ফেলি। আর তাঁরা যদি লেজেন্ডারি নায়ক-নায়িকার নাতি নাতনি হন তাহলে তুলনা তো প্রতি পদেপদে করতে থাকে জনতা। অথচ রাইমা রিয়া এমনকি মুনমুন সেনের অনেক আগেই সুচিত্রা সেন নিজেকে সাহসী পোশাকে মেলে ধরেছিলেন দর্শকের সামনে সেই যুগে দাঁড়িয়ে। অথচ সুচিত্রা সেন মানেই সাধিকা রূপেই তাঁকে আমরা মানতে চাই। সুচিত্রা নিজেও তাঁর অন্তরাল জীবনে কার্ফিউ জারি করে দিয়েছিলেন এবং দর্শকমনেও তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের সাধিকা। তিনি বেলুড়, দক্ষিণেশ্বর যান। তাই তিনি সুইমিং কস্টিউম পরতেই পারেননা। কিন্তু তিনিই তো রূপোলি জগতের গ্ল্যামারকুইন। যার ছবি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে থাকলে সেই পত্রিকা হটকেক। বেশীরভাগ সুচিত্রা-গবেষক রটিয়েছিলেন লিখে, সুচিত্রা সেন সারাদিন ঠাকুরঘরে বসে থাকেন। কিন্তু সুচিত্রা ঈশ্বরচিন্তা মননে আত্মস্থ করেন যা দিয়ে এক আলোর পথে নিজেকে উত্তরণ করেন।
সুচিত্রা সেন কখনওই রক্ষণশীল মননের মহিলা ছিলেননা, তাই তিনি যুগের থেকেও অনেক বেশি আধুনিকা ছিলেন। বারবার যে রাইমা সেনের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের সনাতনী পোশাকের তুলনা টানা হচ্ছে সেখানে অনেকটাই অন্ধকারে রয়ে যাচ্ছে সুচিত্রা সেনের সেই দুঃসাহসিক ইতিহাস, যে সুচিত্রা আরব সাগরে সুইমিং স্যুট পরে জলকেলি করেছিলেন বা নগ্নদেহে শুধু তোয়ালে জড়িয়ে গালে 'নো কিস' লিখে ফটোগ্রাফারের সামনে ধরা দিয়েছিলেন।
রিয়া সেন যখন সাহসী পোশাকে ফটোশ্যুট করেন বা সাহসী দৃশ্যে কাজ করেছিলেন তখন তাঁকেও সুচিত্রা সেন টেনে বিচার করা হত। বিতর্ক থেকে বাদ যাননি সুচিত্রা কন্যা মুনমুন সেনও। মুনমুন তো একটা প্রজন্মের ফ্যান্টাসির দেবী। তবু সেন-পরিবার বারবার ভেঙেছে তথাকথিত মিথ।
যেভাবে আজও দর্শক সনাতনী লক্ষ্মী প্রতিমার আদলে সুচিত্রা সেনকে দেখতে অভ্যস্ত, বাস্তবে সুচিত্রা ছিলেন অনেক বেশি সাহেবি সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তিত্ব। তাই পাবনার মেয়ে বিত্তশালী শ্বশুরবাড়িতে বিয়ে হয়ে এলে শ্বশুর আদিনাথ সেন ও স্বামী দিবানাথ সেনের কর্পোরেট কালচারে নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলেন সুচিত্রা। ফিল্মজীবনেও সুচিত্রা নিজেকে বারবার ভেঙেছেন। 'সাড়ে চুয়াত্তর'এর সুচিত্রা আর 'সপ্তপদী'র রিনা ব্রাউন সুচিত্রার আকাশ-পাতাল তফাত। আবার সত্তর দশকের ছবিগুলিতে সুচিত্রা সেন নিজের শরীরী আবেদন নিজের স্টাইলে পোশাকে মেলে ধরতে সচেষ্ট ছিলেন। 'শাপমোচন' বা 'শিল্পী'র ভেলভেট হাইনেক কলারের ব্লাউজ পরিহিতা সুচিত্রা আর 'আলো আমার আলো'র ক্লিভেজ শোয়িং ব্লাউজে সুচিত্রার অনেকটাই তফাত। যৌনতার নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে গেছেন সুচিত্রা নিজের আভিজাত্য অক্ষুন্ন রেখে।
[caption id="attachment_2325996" align="aligncenter" width="600"]
'আলো আমার আলো'তে আবেদনময়ী সুচিত্রা[/caption]
সুচিত্রা সেন যে যুগের থেকেও অনেকবেশি সাহসী ছিলেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। সত্তর দশকে সুচিত্রা সেন নিজেকে বারবার সাহসী পোশাকে দর্শকের সামনে এনেছিলেন।
একটা মিথ আছে নায়িকাদের বাজার পড়ে গেলে তাঁদের শরীর দেখিয়ে বাজার ধরে রাখতে হয়। সত্তর দশকে যখন সুচিত্রা সেন তাঁর চিরাচরিত সনাতনী সাজগোজ ছেড়ে সাহসী পোশাকে নামলেন তখন তাঁকেও এসব কটুমন্তব্য শুনতে হয়েছিল। কিন্তু তখনও সুচিত্রা সেন সুপারহিট। অন্তত সুচিত্রা যে ছবিতে সবথেকে বেশি যৌন আবেদন প্রদর্শন করেছিলেন সেটি হল বিজয় বসুর 'ফরিয়াদ'। ১৯৭১ সালের ছবি। কেউ ভাবতেই পারেনি লক্ষ্মীপ্রতিমা নায়িকা ক্যাবারে ডান্সারের ভূমিকায় হাতে ছুরি নিয়ে ভানুমতীর খেল দেখাতে পারেন। সুচিত্রার ক্যারিয়ারে একটি সর্বকালীন ব্লকব্লাস্টার হিট ছবি 'ফরিয়াদ'।
তাই বলা যায়না বাজার পড়ে যাওয়াতে শরীর দেখান সুচিত্রা। চিত্রনাট্যে ওমন খোলামেলা পোশাকই ডিম্যান্ড করেছিল এবং সেই সাহসী পদক্ষেপ নিতে পিছপা হননি মিসেস সেন। মায়ের কিছু পোশাক তো ডিজাইন করেছিলেন মেয়ে মুনমুন।
সে বছরই রিলিজ করল বিজয় বসুর উত্তম-সুচিত্রা জুটির ছবি 'নবরাগ'। সেখানেও রিনা বাগচির চরিত্রে অসম্ভব সাহসী পোশাকে ধরা দিলেন সুচিত্রা। সমুদ্রতটে সুইমিং স্যুট পরে নগ্ন পায়ে খোলা বিভাজিকায় বসলেন গোগো সানগ্লাস চোখে সুচিত্রা আর উত্তম নগ্ন দেহে শুধু শর্টস। এমনকি শোনা যায় দর্শক যাতে ক্ষেপে না যায় উত্তম-সুচিত্রার চিরাচরিত রূপের ছন্দপতন দেখে তাই ঐ দৃশ্য কিছুটা বাদ যায়। কিন্তু কিছু তো ছিলই ছবিতে। 'নবরাগ' ছবি জুড়েই সুচিত্রা কখনও স্নানপোশাকে সাহসী বা অর্ন্তবাস পরে সাওয়ারের তলায় স্নাত রমা।
[caption id="attachment_2326009" align="aligncenter" width="600"]
'নবরাগ'এ সুচিত্রা[/caption]
ড্রিঙ্কস হাতে 'আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান' গেয়েও রাবীন্দ্রিক মিথ ভেঙেছেন সুচিত্রা। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও সুচিত্রা সেন জুটির রবীন্দ্রগানে সেই সাহসী দৃশ্য নিয়েও তখন কম বিতর্ক করেনি বিশ্বভারতী। 'কমললতা'র অপাপবিদ্ধতার মধ্যেও এক অমোঘ যৌন আকর্ষণ তৈরী করেছিলেন সুচিত্রা তাঁর দেহ-বিভঙ্গে।
ফটোশ্যুটেও বারবার মিথ ভেঙেছেন সুচিত্রা। সুচিত্রা সেন ভেঙে দিয়েছেন তাঁর সনাতনী ক্লাসিক ইমেজ। আজ তথাগত ঘোষ রাইমা সেনের ছবি তুলে যে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছেন তার অনেকবেশী জলঘোলা হয়েছিল যখন সুচিত্রা সেন সাহসী পোশাকে ধীরেন দেবের ক্যামেরায় ফটোশ্যুট করেন।
ধীরেন দেব সাহস করে একবার সুচিত্রা সেনকে প্রস্তাব দিলেন তিনি সুচিত্রা সেনের এমন ছবি তুলবেন যা দেখে ম্যাগাজিন হটকেক হয়ে যাবে। রাজি হলেন সুচিত্রা।
বাথরুম থেকে শুধু তোয়ালে পরে বেরিয়ে এলেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। দুষ্টু মেয়ে মুনমুন মায়ের গালে কাজল পেন্সিল দিয়ে লিখে দিলেন 'নো কিস'। ধীরেন দেব ক্যামেরায় ধরলেন সেই সাহসী মুহূর্ত। তারপর তো 'নো কিস' ছবি ইতিহাস।
[caption id="attachment_2325991" align="alignnone" width="400"]
ধীরেন দেবের ক্যামেরায় সেই বিখ্যাত বিতর্কিত ছবি[/caption]
সুচিত্রার ব্যক্তিগত জীবন যদি দেখি ১৯৬৯ সালে দিবানাথ সেনের মৃত্যু এবং সুচিত্রা সেনের বৈধব্য দশা। কিন্তু এই সময়ের পর থেকেই সুচিত্রা সেন নিজেকে আরও আধুনিক করে তুলেছেন। সে তাঁর অভিনীত ফিল্মে হোক বা ফটোশ্যুটে। কতটা মনের জোর থাকলে একজন নারী এতটা সাহস দেখাতে পারেন সেইসময়। মেয়ে মুনমুনকে বড় করা এবং নিজের ক্যারিয়ার আরো প্রস্ফুটিত করেছেন মিসেস সেন।
[caption id="attachment_2326024" align="aligncenter" width="272"]
সুচিত্রা-মুনমুন যেন দুই বান্ধবী[/caption]
এইসময়টায় সুচিত্রা সেনের ভিতর একটা পটপরিবর্তন হয়। বদলায় তাঁর মুখের আদলও। পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের সুচিত্রার সাজ আর সত্তরের দশকের সুচিত্রা সেনের সাজে আকাশ-পাতাল তফাত।
নিজের বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বিশাল ব্যালকনিতে বসে নানা বিদেশী পোশাকে ফটোশ্যুট থেকে বাগানে হটপ্যান্ট পরেও ফটোশ্যুট করেছেন সুচিত্রা।
তাঁর সমসাময়িক নায়িকারা যখন বৌদি বা মায়ের রোলে নিজেদের সঁপে দিয়েছেন তখনও সুচিত্রা সেন নিজের পারিশ্রমিক উত্তমকুমারের থেকেও বেশি ধার্য করে রেখেছেন। একদিকে তিনি ফ্যাশন আইকন আবার একদিকে তাঁর শাড়ির আঁচলটাও ছুঁতে পারছেনা ইন্ডাস্ট্রির কেউ। নারীমুক্তির আদর্শ দেবী যেন সুচিত্রা সেন।
অনেকেই ভাবেন মুনমুন সেনের খোলামেলা পোশাক নিয়ে সুচিত্রা সেন মনকষ্টে ভুগতেন। না বরং সুচিত্রা কখনই রক্ষণশীল মনের ছিলেন না। তিনি নিজে খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে বোরখা পরে রাস্তায় বেরোতেন কিন্তু মেয়েকে বোরখা পরে ছবিতে কাজ করার নির্দেশ দেননি। এটা ভাবতেন মেয়ে যেন ভালো পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করে কারণ ঐ সময় ভালো পরিচালক কমে এসেছিল।
সুচিত্রা যেমন এক মেয়ের মা হয়ে সুপারস্টার নায়িকা হন তেমনি মুনমুনও দুই মেয়ের মা হয়ে দুবার প্রেগনেন্সি পেরিয়েও মডেলিং-এ শীর্ষস্থানিয়া হন। মুনমুন যেভাবে সাহসী ফটোশ্যুট করে হলিউডকে বাঙালি সমাজে ইন্ট্রোডিউসড করেছিলেন আর কেউ তা পারেনি।
[caption id="attachment_2326028" align="aligncenter" width="600"]
মুনমুনের স্নান দৃশ্য তখন সব ছবিতেই দর্শক ডিমান্ড[/caption]
মুনমুন যতটা যুগের থেকে বেশি আধুনিক ছিলেন ওঁকে ব্যবহার করার মতো সেই মানের পরিচালক তখন ছিলনা। বারবার সুচিত্রা সেনের সনাতনী ফরম্যাটেই মুনমুনকে বসাতেন পরিচালকরা, যার ফলাফল শুধু মা-মেয়ের তুলনাতেই সীমাবদ্ধ রইল। মায়ের মেয়ে তকমা থেকে বেরোতে দেওয়া হয়নি মুনমুনকে। যার থেকে অনেকটাই হয়তো বেরোতে পেরেছেন রাইমা সেন দেববর্মণ।
রাইমার খোলামেলা পোশাকই নিন্দিত করছেন যে নেটনাগরিকরা তাঁরা কি ছবিগুলিতে রাইমার চোখের দিকে দেখেছেন! সমসাময়িক সকল নায়িকার থেকেই রাইমার চোখ সেরা। অনেকটা সুচিত্রা জিন দায়ী। তবু রাইমার চোখ শ্রীরাধিকার চোখের মতোই পূর্বরাগে ভরা।
সুচিত্রা সেনের ফটোশ্যুটগুলো অনেকক্ষেত্রে রাইমার থেকেও বেশি সাহসী। নগ্ন বিভাজিকায় যেভাবে ঝড় তুলেছিলেন সুচিত্রা তা সেযুগে দাঁড়িয়ে অনেক কঠিন ছিল।
সুচিত্রা সেনের ঐসব সাহসী ফটোশ্যুটগুলো আজও কিছু সুচিত্রা ফ্যানের কাছে চরম নিন্দিত। বিশেষত রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন বাংলাদেশী নাগরিকেরা আজও সনাতনী সুচিত্রাকেই ভালোবাসেন। তাঁরা পারলে নিজেদের চোখে বোরখা পরিয়ে রাখেন সুচিত্রার সাহসী ছবি আজও দেখলে। কোন ছবি কুরুচিকর সেটা দর্শক নিজের মনন ও শিক্ষা দিয়ে বলে বসেন কিন্তু তারমানেই ছবির শিল্পসত্তা কুরুচিপূর্ণ হয়ে যায়না।
একজন নায়িকা বারবার মিথ ভাঙবেনই। অপর্ণা সেন সিগারেট খেলে বা বহুবিবাহে স্নাত হলে তাঁকেও কি কম কথা শুনতে হয়েছে! কিন্তু সুচিত্রা, আম্রপালী সুপ্রিয়া, অপর্ণা বা মুনমুন সবাই নারী স্বাধীনতার পথিকৃৎ। অপর্ণা তাঁর ছবির মাধ্যমে বলেছেন নারী-স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়।
আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে "সুচিত্রা সেনের নাতনি হয়ে কি ভাবে এমন করতে পারল!' এমন কমেন্ট কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় এবং কোনমতেই কোন ফটোশ্যুট ভাবনাকে কুরুচিকর তকমায় দাগিয়ে দেওয়া যায়না।