
আরতি মুখোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 18 July 2024 14:46

'তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়, আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়' ...
তাঁর সিগনেচার গানের মতোই তাঁর কণ্ঠ শুনে মনে হয় তিনি আজও পাটভাঙা শাড়িতে লজ্জা জড়ানো অষ্টাদশী, যার প্রেমে বারবার পড়া যায়, যাঁর কণ্ঠের জাদুতে আমরা চিরমুগ্ধ। তিনি আরতি মুখোপাধ্যায় (Arati Mukherjee)।
লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলের নামের পরে নয় বরং সমকক্ষ হিসেবে বসতে পারে আরতি মুখোপাধ্যায়ের নাম। কিন্তু জীবনে বারবার আঘাত পাওয়া, তাঁর সরলতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে ঠকিয়ে নেওয়া আর সংসারের চাপে কিংবদন্তি আরতি মুখোপাধ্যায় দীর্ঘ সময় রয়ে গেলেন আড়ালে। বাংলা গানের দুই স্তম্ভস্বরূপ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আর আরতি মুখোপাধ্যায়। অথচ সেই আরতি সব ছেড়ে একটা সময় রয়ে গেলেন অন্তরালে। কেন?

১৯৪৩ সালের ১৮ জুলাই জন্ম। আরতির ডাকনাম আলো। গানের হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। বাবা মনোরঞ্জন মুখোপাধ্যায় ছিলেন সঙ্গীতসাধক। সঙ্গে অরগ্যান এবং হারমোনিয়াম বাজাতেন খুব সুন্দর। মায়েরও গানের গলা ভালো। ঠাকুমা, কাকা, পিসিদের মধ্যে হৈহৈ করে বেড়ে ওঠা। গানের বাড়ি ছিল। কিন্তু কেউই প্রফেশানালি গানের জগতে যুক্ত ছিলেন না। ভালবাসি তাই গাই, এই ছিল তাঁদের বাড়ির ব্রত।

কিন্তু খুব ছোট্টবেলায় বাবা মারা যাবার কারণে আরতির জীবনে বড় আঘাত নেমে আসে। যদিও মা ঠাকুমা দিদিমা সে অভাব কোনদিনও বুঝতে দেননি আরতিদের সাত ভাইবোনকে। একবার তো দিদিমা আলোকে পুজোর সময় তিনশো টাকা দিয়ে তানপুরা কিনে দেন। তখনকার দিনে তিনশো টাকার তানপুরা মানে বিরাট ব্যাপার, খুব দামি!
গানের মাস্টারমশাই আসতেন আলোকে গান শেখাতে। মাস্টারমশাই সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায়-ই আরতিকে প্রথম নিয়ে গেছিলেন গানের প্রতিযোগিতায়। চেতলার আদি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত প্রতিযোগিতা 'মুরারি সঙ্গীত সম্মেলন' আজও বিখ্যাত। এই আসরেই আরতিকে গাইতে আনেন তাঁর মাস্টারমশাই। নির্মলা মিশ্রের মেজদা মুরারি মোহন মিশ্র ছিলেন সেযুগের বিখ্যাত গায়ক। মুরারি মোহন গানে নাম করেও অল্প বয়সেই প্রয়াত হন। তাই তাঁর নামানুসারে তাঁর সঙ্গীতরত্ন পিতা চেতলাতে শুরু করেন 'মুরারি সঙ্গীত সম্মেলন'। মেজদার নামে এই প্রতিযোগিতায় নির্মলা মিশ্র গান গেয়ে বিজয়িনী হন। শুধু নির্মলাই নন, আরতি মুখোপাধ্যায়, হৈমন্তী শুক্লা সবার শুরু এই প্রতিযোগিতায় গান গেয়ে বিজয়িনী হয়ে। সেইসময়কার ছবিও ছিল তিনজন আরতি, নির্মলা, হৈমন্তী একসাথে ন্যাড়া মাথায় দাঁড়িয়ে। গরমে তখন বাচ্চাদের মাথা নেড়া করে দেওয়া হত। সে ছবি দেখে আজও হাসেন তিন গায়িকা।

এই সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় বিচারকমণ্ডলীতে ছিলেন স্বনামধন্য শিল্পী ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। তিনিই আরতির গান শুনে সিনেমায় প্লেব্যাকের সুযোগ দেন। 'মামলার ফল’ ছবিতে বিখ্যাত সুরকার রবীন চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরেই আরতির প্রথম প্লেব্যাক। সেসময় রবীন চট্টোপাধ্যায় বড় নাম। সুচিত্রার লিপে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের বেশিরভাগ হিট গান রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরেই।
এছাড়াও ওস্তাদ মোহাম্মদ সাগিরউদ্দিন খান, পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ী, পণ্ডিত লক্ষ্মণ প্রসাদ জয়পুরওয়ালা এবং পণ্ডিত রমেশ নাদকর্ণির অধীনে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন আরতি। পরে অল ইন্ডিয়া 'মেট্রো মরফি কনটেস্ট' জেতেন আরতি।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আরতির গান জনপ্রিয় হয়ে গেল মানুষের মুখে মুখে এবং অচিরেই মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের লিপে গান গাইবার সুযোগ পেলেন আরতি। চমকে দিলেন আরতি সবাইকে। সুচিত্রা সেন অভিনীত 'ফরিয়াদ' ছবিতে যতই আশা ভোঁসলে ক্যাবারে গানে ঝড় তুলুন, আরতির কণ্ঠে সুচিত্রা-লিপে 'সে আমার বুক ভরানো ছোট্ট একটা চিঠি' মন কাঁদিয়ে দিল দর্শকদের।
পরে 'হারা মানা হার' ছবিতেও সুচিত্রা-আরতি জুটিকে আমরা পেয়েছি। তবে এর আগেই আরতি গেয়ে ফেলেছেন তনুজার লিপে 'মাধবী মধুপে হল মিতালি'। ১৯৬৬ সালে আরতি 'গল্প হলও সত্যি' ছবিতে গান গেয়ে সেরা মহিলা নেপথ্য কণ্ঠশিল্পীর 'বিএফজে' পুরস্কার পান। পরে ১৯৭৬ সালে 'ছুটির ফাঁদে' ছবিতে অপর্ণা সেনের লিপে গেয়ে আবার বিএফজেএ পুরস্কার পান। 'এক বৈশাখে দেখা হল দুজনায়' গাইতে সুপ্রিয়া দেবীর কণ্ঠ অনুযায়ী নিজের গলা মোটা করে গান আরতি।
সুধীন দাশগুপ্ত এক ঝাঁক বাচ্চাদের নিয়ে ছবিতে সুর দিলেন 'হংসরাজ', সেখানেও মাস্টার অরিন্দম গাঙ্গুলির লিপে আরতি হিট। বাংলা লোকগানকে মূলধারায় এনে ফেলল 'হংসরাজ'। অন্যদিকে আরতির গান হিট হয়ে গেল তারকেশ্বরে বাঁক নিয়ে পথহাঁটা ভক্তদের মধ্যেও।
সন্ধ্যা রায়ের লিপে 'আজ তোমার পরীক্ষা ভগবান' গানে কেঁপে উঠল সারা বাংলা। একটা ধর্মীয় ছবির গানে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল সবার। নীতা সেনের সুরে 'বাবা তারকনাথ'-এ আরতির গান ছাড়া আজও শিবরাত্রি সম্পূর্ণ হয়না। পরের যুগে দেবশ্রী, শতাব্দী, মুনমুন, ইন্দ্রাণী সবার লিপেই গেয়েছেন আরতি। তবে সবথেকে যে নায়িকার লিপে বেশি গেয়েছেন আরতি, তিনি 'ময়না' 'তিলোত্তমা' সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়। 'যদি নাই বা থাকি কাছে ওগো বকুল তুমি ফুটো'।
আরতি আজ বলেন শুধু রাইমা সেনের লিপে একটা গান গাইতে চাই, তাহলে সুচিত্রা সেন, মুনমুন, রাইমা- তিন প্রজন্মের লিপেই আমার গান গাওয়া সার্থক হবে।
নটিকেতা ঘোষ আফ্রিকান মিউজিকে বাংলা গান আরতিকে দিয়েই গাওয়ান। 'জলে নেমো না' থেকে 'বন্য বন্য এ অরণ্য'।
ঋত্বিক ঘটকের 'সুবর্ণরেখা' ছবিতে কলাবতী রাগের বিস্তার গেয়ে তাক লাগিয়ে দেন আরতি।
সেই গান শুনেই বম্বের তারাচাঁদ বারজাটিয়া বললেন "আরতিজি আপকো বম্বে যানা হি পড়েগা।" প্রথম হিন্দি ছবিতে প্লেব্যাক 'সওদাগর' ছবিতে।
এদিকে আরতির গান শুনে তাঁকে 'সুবর্ণরেখা'র নায়িকা করতে চাইলেন ঋত্বিক ঘটক। কিন্তু গানটা যাতে নষ্ট না হয় তাই ঋত্বিক ঘটকের মতো পরিচালকের ছবিতে নায়িকা হবার অফার ফিরিয়ে দেন আরতি। সেই রোল করলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। 'সুবর্ণরেখা' থেকেই আরতি-মাধবীর বন্ডিং। দুজনের জার্নি শুরু এক ছবি দিয়ে।

আরতি হলেন দেবব্রত বিশ্বাসের ছাত্রী। ঋত্বিক ঘটক তাঁর 'যুক্তি তক্কো গপ্প'তে এবার আরতিকে দিয়ে গাওয়ালেন রবীন্দ্রসঙ্গীত। রবি-গানে এমন সাহসী পদক্ষেপ আগে হয়নি। আরতি-কণ্ঠে নতুন প্রাণ পেল 'আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায় বাঁশি'।
আবার 'শঙ্খবেলা' ছবিতেও মাধবীর লিপে আরতি গাইলেন 'জানি নে, জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না/ আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে।।' যেন বর্ষার আগমনী সুর।হিন্দিতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বেসিক এলবামেও আরতি বেস্টসেলার। যা রেকর্ড করার আগে এইচএমভি বলেছিল লতা গাইবেন, কিন্তু আরতিই গেয়ে বেস্টসেলার করে দেন।

'গোপনের প্রেম গোপনে গিয়েছে ঝরে
আমরা দুজনে কখন গিয়েছি সরে
ফুলঝুরি থেকে ফুল ঝরে গেলে
মালা কীসে গাঁথা হয়..'
আরতির প্রথম স্বামী 'তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়' গানের গীতিকার সুবীর হাজরা। সুবীরের লেখা গানের কথা মিলে যায় আরতির জীবনের সঙ্গে। আরতির আরও অনেক সুপারহিট গানের গীতিকার তিনি- 'আয়নাতে মুখ দেখব না', 'তোমার ঘরের পুতুলগুলো আমার থেকেও দামি'। আরতিকে দামি পুতুল করেই রাখতে চেয়েছিলেন সুবীর হাজরা।
শুধু গান লেখা নয়, সত্যজিৎ রায়ের সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন সুবীর। উত্তম-মাধবীর 'ছদ্মবেশী' ছবির চিত্রনাট্যকারও তিনি। আরতি জানাচ্ছেন প্রথম বিয়ে নিয়ে- "আমি ওঁর গুণের প্রেমেই পড়েছিলাম। কিন্তু বৈবাহিক জীবনে উনি আমায় এতটুকু স্পেস দিতেননা। সব তাতে হস্তক্ষেপ করতেন। হ্যাঁ আমাদের দুজনের জুটি তখন বাংলা গানে হিট। সব রেকর্ড হিট। তবু আমার দম বন্ধ হয়ে আসত। আমি কী শাড়ি পরে ফাংশানে যাব, কোন ফাংশান নেব বা বম্বের রেকর্ডিং নেব কিনা সব উনি আদেশ দিতেন। আমি তবু সংসার সামলে বম্বের অফার নিতাম। কিন্তু শেষ অবধি আর থাকা গেলনা। গানেও তার ছাপ পড়তে লাগল। সুধীনদা (দাশগুপ্ত) বললেন 'তুই বম্বে চলে যা', চলে গেলাম লক্ষীকান্ত-প্যায়ারেলাল, আর ডি বর্মণের অফার পেয়ে। কঠিন সময় ছিল সেটা। "
ডির্ভোসের পর পাঁচ বছর একাই ছিলেন আরতি। কিন্তু আরতির মা চাইতেন মেয়ের একটা সংসার হোক আবার। বিয়ে করেন মুনিম পরিবারে। গুজরাতি পরিবারের বউ হন বাঙালি আরতি। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির সলিসিটারি ফার্ম। মুনিম পরিবারের বউ হওয়া তাই ভাগ্যের ব্যাপার নাকি। কলকাতার শিল্পীমহল মুনিমদের তারিফ করত আরতির কাছে।
বিয়ের পরপরই হল ছেলে সোহম। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে ছিল নানা শর্ত। ছেলেকে পণ্ডিচেরীতে অরবিন্দ আশ্রমে রেখে মানুষ করতে হবে। সেটাই মুনিমদের রীতি। ছেলে-মানুষ আর শ্বশুরবাড়ি সামলাতে গিয়ে একের পর এক গানের চুক্তিভঙ্গ হতে লাগল আরতির। স্বামী মিঃ মুনিম ছিলেন খুব সাপোর্টিভ কিন্তু পরিবারের মিথ তিনি ভাঙতে সক্ষম ছিলেননা।

গুজরাটি পরিবারের বউ হলেন বাঙালি আরতি।
একবার বম্বে, একবার কলকাতা আবার পন্ডিচেরি ডেলি প্লেনে ট্রেনে যাতায়াত করতে করতে কাহিল হয়ে পড়তেন আরতি। আর ডি বর্মণের রেকর্ড কোনওমতে সেরে ছুটে যেতেন পন্ডিচেরিতে মায়ের পথ চেয়ে বসে থাকা ছোট্ট সোহমের কাছে। ঘরভাঙা আরতির তখন গানের থেকে স্বামীর ভালোবাসা আর ছেলের মা ডাকে বেশি বুকটা আকুল হত, তাই নিজের গানের জগতকে গুডবাই জানাতে শুরু করলেন তিনি। বাঙালিরা পন্ডিচেরিতে ঘুরতে গেলে কেউ হয়তো খেয়াল করতেন চুড়িদার পরে হেঁটে যাচ্ছেন আরতি মুখার্জি। ভক্তদের প্রতি মৃদু হেসে ছেড়ে আসা জগতকে এড়িয়ে যেতেন আরতি। মধ্যগগনে যখন আরতির কেরিয়ার, তখন গান থেকে একেবারে অন্তরালে চলে গেলেন তিনি। পুরোপুরি মুনিম-ঘরনি। অনেকটাই আজ তাঁর আফশোস ভালো কত কাজ করা হলনা। যা ট্যালেন্ট যা কোকিল-কণ্ঠ তাঁর ছিল তাঁর মূল্য তিনি পেলেননা।
বম্বেতে লতা-আশা জমানায় আঞ্চলিক শিল্পীর সুযোগ পাওয়া বড়ই মুশকিলের। কিন্তু কয়েকটা গান গেয়েই আরতি বম্বেতে নাম করে ফেললেন। 'গীত গাতা চল' থেকে শেখর কাপুরের 'মাসুম'-এ 'দো নায়না অউর এক কাহানি'। সেরা গায়িকার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ। এই ফিল্মফেয়ারই যেন আরতির জীবনে কাল হল। বম্বেতে সুযোগ কমতে লাগল
'বালুচরী' বাংলা ছবির হিন্দি রিমেক রাখি গুলজার অভিনীত 'তপস্যা' ছবিতে আরতির দুটো গান 'বাচ্চে হো তুম খেল খিলনে' আর কিশোর কুমারের সাথে 'দো পাঁচি দো তিনকে' খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।
একটা সময় আরতি মুখার্জির নামের পাশে 'বম্বে' লেখা হত। ঠিক যে সম্মান হেমন্ত কুমার মুখোপাধ্যায় পেতেন। যদিও শ্রোতারা বলতেন আরতি বাংলার, বম্বের তকমা তাঁর লাগেনা।
এত নাম করে ফেলেন চটজলদি যে তাঁর শত্রুও বেড়ে যায়। বাংলা ছবি 'আনন্দ আশ্রম'এ আরতি গাইলেন 'কথা কিছু কিছু বুঝে নিতে হয়' শ্যামল মিত্রর সঙ্গে ডুয়েট, অথচ বম্বেতে সেই গান ওপরতলার চাপে হয়ে গেল শ্যামল মিত্র-প্রীতি সাগর। সে গান হিট হয়নি বাংলার মতো।
বম্বেতে তখন স্ট্রাগল করছেন আরতি হঠাৎ তাঁর শরীর খারাপ। হসপিটালে পেট থেকে পাওয়া গেল বিষ। কে যেন তাঁর খাবারে মিশিয়ে দিয়েছিল গলা নষ্ট করতে। অন্তত তাই বলে চললেন আরতি। বিষের সাইড এফেক্টে পা-ফোলা রোগ ধরল আরতির। যা নিয়ে আজও ভুগছেন।
আর ডি বর্মনের সঙ্গে বহু চুক্তি তাঁর ভেঙে গেছে আশা ভোঁসলের কারণে। সেসব গান আশাই গেয়েছেন। আবার লতাও অনেক গানে আরতির আগে সুযোগ পেয়েছেন। বাপ্পি লাহিড়ি 'তখন তোমার একুশ বছর'-এর পর আরতিকে সে অর্থে নেননি আর উপরমহলের চাপে। এসব তো হয়েই থাকে। কিন্তু নানা ঘাত প্রতিঘাতে আরতির অমন সুন্দর গলা নষ্ট হয়ে গেল।
তখন লেট নাইন্টিজ। সিপিএম পার্টির জমানা। জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী। সুভাষ চক্রবর্তী আর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরা শুরু করেন 'বাংলা সঙ্গীত মেলা'। তখন রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহ ও ঐ চত্বরটুকুতেই হত। কিন্তু সমস্ত নামজাদা শিল্পী। শিল্পীর লিস্টে আরতি মুখার্জী সহ অনেকে। আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম সেদিনকার অনুষ্ঠানে। বিজ্ঞাপনে আরতির নামেই সেদিন রবীন্দ্রসদন হাউসফুল। সবার মুখে আরতির নাম। একে একে সব শিল্পী আসছেন, গাইছেন মঞ্চে সনৎ সিংহ, অজিত পান্ডে, অধীর বাগচী, উষা উত্থুপ, কিন্তু আরতির দেখা নেই।
সঞ্চালক দেবাশীষ বসু ঘোষণা করলেন 'আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা আরতি মুখার্জী আসছেন'। কোথায় আরতি! রাত যে নটা হতে চলল। দর্শকেরা উত্তেজিত। শেষ অবধি ঘোষণা হল 'আরতিদি অসুস্থ, আসতে পারেননি।' আর কোন শিল্পী গাইবেন না দেখেই সারা রবীন্দ্রসদন সেদিন ফাঁকা হয়ে যায় রাগে দুঃখে। টিকিট ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে বেরিয়ে এল দর্শকের ভিড়। না, আসেননি আরতি। সেসময় থেকেই যেন আরতি নিজের গানের জগতের দরজা দর্শকদের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরে কিছু ফাংশানে গাইলেও সেই আগের গলার টান ছিলনা।
একবার তো লীনা গঙ্গোপাধ্যায় পরিচালিত এক টিভি শোতে আরতি গাইতে এলেন। তিনি আদতে গাননি। সব পুরোনো গানের রেকর্ড বাজল এবং আরতি নিজের গানেই লিপ মেলালেন। একজন কিংবদন্তি শিল্পী কীভাবে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেলেন! যেসময় লতা আশা বেশি বয়সেও কণ্ঠ সতেজ রেখেছিলেন বা রেখেছেন তার বহু আগেই আরতি নিজের কণ্ঠ হারিয়ে ফেলেছেন। রোগভোগে আরওই হারিয়ে গেছে সেই কণ্ঠ। সবারই একটা সময় থাকে। আরতিরও হয়তো অতটুকুই সুবর্ণ যুগ ছিল।
সবটাই কি জলে গেল! তা মনে করেননা আরতি। কারণ তাঁর একমাত্র পুত্র সোহম মুনিম সেতার-পিয়ানো-বাঁশিতে দক্ষিণের পরিচিত নাম। সলিসিটার পরিবারের ছেলে তাঁর কেরিয়ার গড়েছে মায়ের পথেই। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি একজন মায়ের কাছে কী হতে পারে?
মুম্বইয়ের খার এলাকার 'শান্তিসদনে', তাঁর ছ'তলার ফ্ল্যাটে এখন থাকেন আমাদের আরতি মুখোপাধ্যায়। ছেলে প্রতিবার মায়ের জন্মদিনে কেক আনেন। গানের জগত ছেড়েছেন, কিন্তু গানকে ছাড়েননি আরতি। গানের রেওয়াজ আজও রোজ করেন পুজো করার মতোই। ছেলে সোহমকে ঘিরেই নিজের স্বপ্নগুলো দেখেন। তবে করোনা আবহ মিটলে কলকাতা এসে আরও কিছু অসম্পূর্ণ গান রেকর্ড করতে চান আরতি।
নিজের জন্মদিন উদযাপন নিয়ে বললেন "এখন কীসের উৎসব! সারা পৃথিবী আজ যেখানে মৃত্যুপথযাত্রী, সেখানে নিজের জন্য আনন্দ করা কি মানায়? বড়জোর কেক কাটতে পারি। এর বেশি কিচ্ছু নয়।"
কিন্তু একজন জীবন্ত কিংবদন্তি শিল্পীর মূল্যায়ণ যেন তিনি নিজেও করতে পারলেননা, না পারল সঙ্গীত জগত। আরতি ভক্তরা আরতির দ্বিতীয় বিবাহকেই ওঁর গানের বাধা বলে দাবি করে থাকেন। ভক্তদের মতে মুনিম পরিবার অনেক বড় পরিবার হতেই পারে, কিন্তু ক্ষণজন্মা কিংবদন্তি আরতি মুখার্জি তার চেয়েও অনেক বড়। আর পাঁচজন গৃহবধূর মতোই তাহলে শেষ হয়ে গেল এক গান্ধর্বীর গানের স্বপ্ন। নিজের কণ্ঠও তার সঙ্গে বেইমানি করল! নাকি সুরকার গীতিকারদের অভাবেও আরতির চাহিদা কমে গেল! যদিও যখন তাঁর চাহিদা তুঙ্গে তখনই নিজের দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন আরতি। ছেলের মুখটাই মা আরতির বারবার মনে পড়েছে। মেয়েরা কি নিজেই নিজের অবলম্বন হতে পারেনা? মাতৃত্ব হয়তো সবকিছুর থেকে বড়, তাই হয়তো সেই পথেই গেছেন আরতি।
আরতি বললেন 'আসলে কী জানেন, আমি কোনও দিনই নিজের প্রচার করে উঠতে পারিনি। 'পদ্মানদীর মাঝি' নাটকে একদিনে ৩৫টা গান রেকর্ড করেছিলাম। সে কথা ক'জন জানেন?'
দ্বিজেনদা পদ্মভূষণ আর সন্ধ্যাদি পদ্মশ্রী! দ্বিজেনদা কি বেশি বড় শিল্পী! বিস্ফোরক আরতি