Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশু

বহুদিন পর কলকাতার মঞ্চে গাইলেন আরতি, দুটো অপারেশন সামলে এখনও রোজ করেন রেওয়াজ

তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়, আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়' ...

বহুদিন পর কলকাতার মঞ্চে গাইলেন আরতি, দুটো অপারেশন সামলে এখনও রোজ করেন রেওয়াজ

Arati Mukherjee

শেষ আপডেট: 12 March 2024 17:07

তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়, আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়' ...
তাঁর সিগনেচার গানের মতোই তাঁর কণ্ঠ শুনে মনে হয় তিনি আজও পাটভাঙা শাড়িতে লজ্জা জড়ানো অষ্টাদশী। তাঁর প্রেমে বারবার পড়া যায়, তাঁর কণ্ঠের জাদুতে আমরা চিরমুগ্ধ। তিনি আরতি মুখোপাধ্যায় (Arati Mukherjee)। গত ৮ই মার্চ ২০২৪ 'দিদিমণি গানের রানি' শীর্ষক 'আরতি সন্ধ্যা' অনুষ্ঠিত হল দক্ষিণ কলকাতার উত্তম মঞ্চে। বহু বছর পর মঞ্চে গাইলেন আরতি মুখোপাধ্যায়। সেই বিরল অনুষ্ঠানের সাক্ষী থেকে কলম ধরলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। 

'এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি', তাঁর আইকনিক গানের মতোই  নিজের দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনের নানা মুহূর্ত গানে গল্পে বললেন আরতি মুখোপাধ্যায়। এই ধরনের অনুষ্ঠান বহুদিন হয়নি কলকাতায়। এমনই এক 'আরতি সন্ধ্যা' অনুষ্ঠানের রূপকার  গিটারিস্ট সংগীত পরিচালক বুদ্ধদেব গাঙ্গুলি। তিনি সেই সত্তর দশক থেকে আরতি মুখোপাধ্যায়ের সুপারহিট সব গানের রেকর্ডিংয়ে বাজিয়েছিলেন। হংসরাজ, বাবা তারকনাথ, দাদার কীর্তি একের পর এক লেজেন্ডারি ছবি থেকে আধুনিক গানে বুদ্ধদেব গাঙ্গুলি আরতির মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সঙ্গত করেছিলেন। শুধুমাত্র তাঁর কথাতেই আরতি বম্বে থেকে উড়ে এলেন কলকাতায়। আগে কলকাতার নানা জলসায় আরতি মুখোপাধ্যায়ের নাম থাকলেও শেষ অবধি আর সঙ্গীতের কুহকিনী এসে পৌঁছননি। এবার কথা রাখলেন। অধরা স্বপ্ন সত্যি হল।

স্বর্ণযুগের প্রায় অধিকাংশ শিল্পী আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। শেষ জীবন্ত কিংবদন্তী শিল্পী একমাত্র আরতি মুখোপাধ্যায়, যার হিটের রেকর্ড ঐতিহাসিক। সুচিত্রা সেন থেকে দেবশ্রী রায়,শতাব্দী রায় এতজন নায়িকার লিপে হিট গান গেয়েছেন আরতি। তেমনই আধুনিক গানে আরতির একচ্ছত্র সাম্রাজ্য। আবার অন্যধারার পরিচালক ঋত্বিক ঘটক, তপন সিনহার ছবিতেও গেয়েছেন আরতি। ক্লাসিকাল থেকে আধুনিক, রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে হিন্দি, তামিল, তেলেগু সবগানেই আরতি অদ্বিতীয়া। মঞ্চে এসে আরতি বললেন "সমস্ত লেজেন্ড গায়কের সঙ্গে ডুয়েট গেয়েছি আমি, শুধু তালাত মাহমুদের সঙ্গে গাইনি।"  

আরতির ডাক নাম হল আলো। স্বর্ণযুগের শিল্পীরা সবাই আরতিকে আলো বলেই ডাকতেন। এতদিন পরে লাইভ জলসায় ঠিক সেরকমই আলো জ্বলে উঠল আরতির উপস্থিতিতে। কেমন আছেন তিনি এখন? নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে? দুটো অপারেশন হয়ে গেছে তাঁর। দুটো হাঁটুই অপারেশন করার পর তিনি আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। তবে হাঁটতে একটু সাহায্য লাগে। নিজেই বললেন "আমার স্বামী বললেন তুমি গাইতে যেতে কলকাতায় পারবে? আমি বললাম দেখিনা পারি কিনা!" মনের জোরে আরতি পারলেন।

আজও তাঁর পাবলিক পারফরমেন্স করায় কী নিষ্ঠা। অনুষ্ঠানের আগের দিন মিউজিশিয়ানদের নিয়ে রিহার্সাল দিয়েছেন তিনি। যেসব নতুন শিল্পীরা তাঁর গান গাইবেন তাঁদেরও আরতি দিলেন গানের টিপস। এখানেই ছাড়বার পাত্র নন আরতি। অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগেই তিনি পৌঁছে গেলেন উত্তম মঞ্চে। দর্শক প্রেক্ষাগৃহে ঢোকার আগেই মিউজিশিয়ানদের নিয়ে স্টেজ রিহার্সাল করে নিলেন আরতি। এত বড় শিল্পী তবু গান গাইবার সময় যেন তিনি পরীক্ষার্থী। গলা বিশ্রামে রাখতে বেশি কথাও বলবেন না, যেন  মুখে কুলুপ আঁটলেন। 

মঞ্চে আরতি আসতেই করতালি দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানালেন দর্শকরা। সাদা রঙের ঢাকাই আর আইকনিক হেয়ারস্টাইলে হাজির হলেন সেভেন্টিজ ডিভা আরতি মুখোপাধ্যায়। মাইকে কন্ঠ দিয়ে আরতি প্রথম গাইলেন বাংলা ছবিতে তাঁর সিগনেচার সঙ 'এক বৈশাখে দেখা হল দুজনায়'। 'বিলম্বিত লয়' যে ছবির গান সুপ্রিয়া দেবীর লিপে গাইতে আরতি গলা একটু মোটা করে গেয়েছিলেন। ২০২৪-এ এসে সেই গান আমরা আবার শুনতে পেলাম আরতি কন্ঠে। এতো পরম পাওয়া।

দ্বিতীয় গান আরতি ধরলেন 'না বলে এসেছি তা বলে ভেবোনা না বলে বিদায় নেব'। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় সুধীন দাশগুপ্তর সুরে 'লজ্জা জড়ানো গন্ধ ছড়িয়ে জাগতে পারে মনি কুঁড়ি/ লক্ষ মরণে মরতে চেয়েছি/সয়নি সে লুকোচুরি' কী চড়া গলা নিয়ে গিয়ে আজও গাইলেন আরতি। কোকিলকন্ঠী আরতি আজও মুগ্ধ করেন থমকে দেন শ্রোতাকে। শ্বেতশুভ্র সরস্বতীকে চোখের সামনে দেখে আমাদের চোখ আবেগে ভিজে যায়।

আরতির গানের মাঝেই গান গাইলেন নতুন যুগের শিল্পীরা। প্রথমেই যার কথা বলতে হয় তিনি তৃষা পাড়ুই। যৌবনের আরতি যেন ভর করলেন তৃষার সঙ্গীত সাধনায়। এ অনুষ্ঠান শুধু আরতির গানের নয় তৃষা পাড়ুইয়ের মতো শিল্পীর গান শোনারও ছিল। লজ্জা মরি মরি একী লজ্জা, আমি মিস ক্যালকাটা, দো নয়না অউর এক কাহানি বা পল্লব ঘোষের সঙ্গে তৃষার ডুয়েট 'বেঁধোনা ফুল মালা ডোরে' অপূর্ব। বৃষ্টিলেখা নন্দিনী ও মাধুরীদের কন্ঠেও সুমধুর লাগল আরতির গান। কিশোর কুমার-আরতি মুখার্জির ডুয়েট শোনা গেল অমিত গাঙ্গুলি-তৃষা পাড়ুইয়ের কন্ঠে। 

অনুষ্ঠানের নাম ছিল 'দিদিমণি গানের রানি'। দ্বিতীয়ার্ধে আবার মঞ্চে এসে 'হংসরাজ' ছবির সেই কালজয়ী গান শোনালেন আরতি। মিউজিশিয়ানদের নির্দেশ দিচ্ছিলেন বুদ্ধদেব গাঙ্গুলি। যিনি হংসরাজ ছবিতে আরতির গানে বাজিয়েছিলেন সুধীন দাশগুপ্তর সহকারী রূপে। তবলায় সঙ্গত করছিলেন দীপঙ্কর আচার্য। পঞ্চাশ বছর পার করা বিখ্যাত তবলিয়া। যিনি আশা ভোঁসলে, মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র থেকে আরতি মুখোপাধ্যায় সবার রেকর্ডিং থেকে লাইভ সবেতেই বাজিয়েছেন। সবথেকে বড় কথা সেই স্বর্ণযুগের শিল্পী থেকে এযুগের শিল্পী সবার সঙ্গেই কী অপূর্ব সঙ্গত তবলায় দীপঙ্কর আচার্য। তালবাদ্যে সোহম চক্রবর্তী অসাধারণ। 

সুধীন দাশগুপ্তর ছেলে সৌম্য দাশগুপ্তর সঙ্গে আরতি পিসি

আরতি জলসা শুধু গানের নয় ছিল গল্পেরও। শ্রী বসু ছিলেন সঞ্চালনায়। আরতি শোনালেন "আমি আর রিনা, আপনাদের অপর্ণা সেন বসে আড্ডা মারছিলাম স্টুডিওতে। হঠাৎ উত্তমকুমার এসে বললেন "একী মেয়েরা তোমাদের কাজে মন নেই! গান গাইতে এসে অভিনয় করতে এসে গল্প করছ।" একেবারে অভিভাবকের মতো শাসন যেমন করতেন, তেমন ভালবাসতেন উত্তমকুমার। দর্শক আসন থেকে অনুরোধ 'সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কথা বলুন'। আরতির একটাই উত্তর 'সন্ধ্যাদি আমার মায়ের মতো ছিলেন। মাকে হারিয়েছি। আমার ঘরে সন্ধ্যাদি আর আমার একসঙ্গে তোলা দারুণ একটা ছবি আছে।" 

সুধীন দাশগুপ্তর ছেলে সৌম্য দাশগুপ্তর কাছে আরতি মুখোপাধ্যায় হলেন আরতি পিসি। প্রিয় ভাইপোকে পাশে বসিয়ে গানের গল্প শুরু করলেন আরতি। সৌম্য বললেন "ছোটবেলা থেকেই আরতি  পিসির সাদা শাড়ির ভক্ত ছিলাম। মাকে সবসময় বলতাম আরতি পিসির মতো সাদা শাড়ি পর না কেন?" পিসিকে শাড়িও উপহার দিলেন সুধীনপুত্র। সুধীন দাশগুপ্তর হাত ধরেই আরতি বাংলা ফিল্ম ও বেসিক গানের শীর্ষস্থানিয়া হন। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের যুগ সরিয়ে শুরু হয় আরতি মুখোপাধ্যায়ের যুগ। নায়িকাদের লিপে তখন সন্ধ্যা নয়, শুধুই আরতির চাহিদা। 'দাদার কীর্তি'র চিরপ্রেমের গান 'বয়েই গেছে'ও শোনালেন আরতি।

অনুষ্ঠান শেষে

৮ই মার্চ একদিকে নারী দিবস আরেকদিকে শিবরাত্রি। 'বাবা তারকনাথ' ছবির গান ছাড়া কী হয়! আর সেই গানের গায়িকাই যখন কলকাতার মঞ্চে। আরতি মুখোপাধ্যায় শেষ অধ্যায়ে বললেন "এত সুরকার গীতিকারের গান গেয়েছি প্রত্যেকটা গান প্রত্যেকটার থেকে আলাদা। আমার গান গুলোতে খুব বৈচিত্র ছিল। সেটাই আজ ভাবি। একদিকে 'বন্য বন্য এ অরন্য' অন্যদিকে 'তখন তোমার একুশ বছর'। হেমন্ত দা (মুখোপাধ্যায়) বলতেন "তুই এমন এমন গান গাইছিস তোর জন্য আর নতুন কী পুজোর গান করব বল!" এত গান গেয়েছি সব মনেও নেই। তবু আজ গাইলাম, নতুন ছেলেমেয়েরা আমার গান গাইলেন। এটা আমার খুব ভাল লাগছে। আমি কথা দিলাম আগামী বছর আবার নিশ্চয়ই আসব।" 

সুখবরও দিলেন বুদ্ধদেব গাঙ্গুলি। অনুষ্ঠানের পর একান্তে বললেন "আরতিদির ইচ্ছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম করার। আমার সংগীত পরিচালনায় আরতিদিকে দিয়ে গাওয়ানোর ইচ্ছে আছে।" 

তবলিয়া দীপঙ্কর আচার্য, আরতি মুখোপাধ্যায়, গীটারিস্ট বুদ্ধদেব গাঙ্গুলি

ছবি সৌজন্যে -ফটোগ্রাফার স্বাগত গঙ্গোপাধ্যায়


```