
শেষ আপডেট: 17 May 2022 11:26
সত্যজিৎ রায় তাঁর প্রথম ছবি 'পথের পাঁচালী' দিয়েই কেমন ভাবে পেলেন বিশ্বজোড়া খ্যাতি, কেমন ভাবে তিনি ঘটিয়েছিলেন বাংলা ছবিতে নবজাগরণ, সেই নিয়ে অনীক দত্তর সিনেমা 'অপরাজিত' (Aparajito) মুক্তি পেয়েছে দিন চারেক আগে। অথচ সত্যজিতের জীবন আশ্রিত এই ছবি জায়গা পায়নি সত্যজিতেরই হাতে গড়া 'নন্দন' প্রেক্ষাগৃহে, যে 'নন্দন' লেখাটাও সত্যজিৎ রায়ের কলমেই সৃষ্ট।
নন্দনে বসে 'অপরাজিত' দেখবেন, এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন বহু দর্শক। তা না হওয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভও উগরে দিয়েছিলেন দর্শকরা। পরিচালক থেকে ছবির কলাকুশলীরাও মুষড়ে পড়েছিলেন এমন ঘটনায়। সত্যজিতের জীবন ভিত্তিক ছবি তাঁর স্বপ্নের 'নন্দন'-এ প্রদর্শন করা গেল না, এমনটা লজ্জা বলেই মনে করেছেন বাঙালিদের একাংশ। এই নিয়ে হল কর্তৃপক্ষ বা সরকারের থেকেও কোনও সদুত্তর মেলেনি। দর্শকদের একটা বড় অংশের অভিমত, অনীক দত্ত যেহেতু বারবার বর্তমান সরকার ও সরকার ঘনিষ্ঠ লোকেদের আচরণের বিরুদ্ধে জোর গলায় সোচ্চার হয়েছেন, তাই ইচ্ছাকৃত ভাবেই তাঁর ছবিকে জায়গা দেওয়া হয়নি নন্দনে।

তবে এটাও জেনে রাখা দরকার, সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত শিলাদিত্য মৌলিকের ছবি 'হৃদপিন্ড'ও নন্দনে জায়গা পায়নি। আবার কয়েক সপ্তাহ আগে ফিল্ম ফেস্টিভাল চলার কারণে নন্দনে জায়গা পায়নি অরিন্দম শীলের 'মহানন্দা'ও। 'মহানন্দা' যাঁর জীবন আশ্রিত ছবি, সেই মহাশ্বেতা দেবী ছিলেন সরকার ঘনিষ্ঠ লোক। অরিন্দম শীল নিজেও তাই। তবু তাঁদের ছবি জায়গা পায়নি নন্দনে। দর্শকমহল যদিও এসব মানতে নারাজ। সত্যজিত রায়ের জীবন নির্ভর ছবি সত্যজিতের সিনেমাহলে জায়গা পাক, এটাই তাঁদের দাবি। এই দাবি অন্যায় নয়।

তবে এ দাবি পূরণ হয়নি। 'অপরাজিত' রিলিজ হতেই দেখা গেল, নন্দনে চলছে মিমি চক্রবর্তী অভিনীত 'মিনি', পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত 'অভিযান', দেব অভিনীত ও প্রযোজিত 'কিশমিশ' এবং সোহম চক্রবর্তী অভিনীত ও প্রযোজিত ছবি 'কলকাতার হ্যারি'।
তবে দেখার বিষয় হল, এত ছবি চলেও 'নন্দন' খাঁ খাঁ করছে। এতজন স্টারের ছবি চলা সত্ত্বেও নন্দনমুখী হচ্ছেন না দর্শকরা। কারণ সমস্ত ভিড়টাই ছড়িয়ে পড়েছে প্রিয়া, স্টার থিয়েটার, অজন্তা এবং শহরের প্রতিটি মাল্টিপ্লেক্সে। দর্শকেরা লাইন দিয়েছেন 'অপরাজিত' (Aparajito) দেখার জন্য। বারাসাত, মধ্যমগ্রাম, হাওড়া, বেলুড়-- যেসব জায়গায় হল পেয়েছে 'অপরাজিত', সেখানেই ভিড় উপচে পড়ছে।

যেম প্রমাণ হয়েছে, স্টার নয়, কনটেন্টেই এগিয়ে বাংলা ছবি। ছবি হিট করানোর শর্ত একমাত্র ভাল ছবিই। তাই 'অপরাজিত'কে সকলের কাছে পৌঁছে দিতে কোথাও নির্দেশিকা জারি করতে হয়নি, 'বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ান' বলে। কেবল কনটেন্টের জোরেই দর্শকধন্য হচ্ছে ছবিটি।

সত্যজিৎ রায়ই ছবির এক্স ফ্যাক্টর। সেই আবেগেই অনীকের ছবি হিট করেছে, এ কথাও অনেকে বলছেন। কিন্তু সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে কাজ তো এই প্রথম নয়। অনেকেই এ নিয়ে কাজ করলেও সেসবের এমন উত্তরণ ঘটেনি। সত্যজিৎ রায় নিয়ে যাই হোক না কেন, বাঙালি তা ভাল করে পরখ করে না দেখে ছেড়ে দেবে, তা তো হয় না। তাই এ নিয়েও হয়েছে সবার চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে সে সবই হার মেনেছে জিতু কমলের লুক ও অভিনয়ের কাছে। এক সিরিয়াল অভিনেতা আজ সত্যিই স্টার। তাই 'নন্দন'-এ জায়গা না পেলেও কয়েকটি সিঙ্গল স্ক্রিন-সহ মাল্টিপ্লেক্সে বেশি দামে টিকিট কেটেও অপরাজিত দেখছে দর্শক। নাইট শোতেও 'অপরাজিত' হাউসফুল।

এমনকি দক্ষিণের ব্লকবাস্টার ছবি ‘কেজিএফ চ্যাপটার টু’-কেও ছাপিয়ে গিয়েছে এই ছবি (Aparajito)। আইএমডিবি রেটিং অনুযায়ী 'অপরাজিত' অনেক ওপরে ‘কেজিএফ চ্যাপ্টার টু’-র থেকে। যেখানে ‘অপরাজিত’র রেটিং এই মুহূর্তে আইএমডিবি-তে ৯.৩, সেখানে ‘কেজিএফ চ্যাপটার টু’-র রেটিং ৮.৯। খুব স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণের ছবিকে যেভাবে বাংলা ছবি ‘অপরাজিত’ ছাপিয়ে গিয়েছে, তা বাংলা ইন্ডাস্ট্রির পক্ষে অত্যন্ত সুখবর বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে যে ছবির এত চাহিদা, তার জন্য নন্দন কর্তৃপক্ষ কি নিজেদের সিদ্ধান্ত বদলে অপরাজিতকে জায়গা দেবে? পরবর্তী সপ্তাহে পরিষ্কার হবে এই হিসেব-নিকেষ। কারণ পরের সপ্তাহে মুক্তি পাচ্ছে বড় বাজেটের ছবি শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের 'বেলা শুরু'। পরিচালক শিবপ্রসাদও ধন্দে রয়েছে তাঁর ছবি নন্দনে জায়গা পাবে কিনা। যদিও 'বেলা শেষে'-সহ শিবপ্রসাদ-নন্দিতা জুটির বহু ছবির হিট রেকর্ড রয়েছে নন্দনেই।