
অঞ্জন দত্ত ও অপর্ণা সেন
শেষ আপডেট: 19 January 2025 14:43
বাঙালিয়ানা অনেক বড় একটা ব্যাপার, তার মধ্যে ফ্রেঞ্চ, পর্তুগিজ, ডাচ—সব আছে। বাঙালিয়ানা মানে শুধু ধুতি আর দুর্গাপুজো নয়, এমনটাই মনে করেন পরিচালক-অভিনেতা এবং গায়ক অঞ্জন দত্ত। পাশাপাশি তিনি মনে করেন, বাঙালিয়ানার এই বৃহত্তর অর্থ সঙ্কীর্ণ হয়ে যাচ্ছে বলেই কলকাতা শহর তার অনন্যতা হারাচ্ছে, স্বাতন্ত্র্য হারাচ্ছে।
দ্য ওয়ালকে খোলাখুলি সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে এই কথাগুলোই বললেন অঞ্জন। সহমত হলেন অপর্ণার বক্তব্যের সঙ্গে। একসুরেই বললেন, ‘মধ্যমেধা এখন বেড়ে গিয়েছে।’
পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘এই রাত তোমার আমার’ ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করতে চলেছেন অঞ্জন-অপর্ণা। গল্প এমন দুটি মানুষের, যাঁরা বিবাহিত, একসঙ্গে থাকেন, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে জমে আছে তাঁদের মনে না বলা প্রচুর কথা।
ইতিমধ্যেই কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে ‘এই রাত তোমার আমার’। নতুন বছর প্রথম মাসেই মুক্তি পাবে এই ছবি। আবার দিন কয়েকের মধ্যে আসছে, অপর্ণার নতুন সিনেমা 'পরমা'ও মুক্তি পাচ্ছে। এই দুই সিনেমা মুক্তির ঠিক আগে ‘দ্য ওয়ালে’ খোলা সাক্ষাৎকার দেন দু’জনেই। একফ্রেমে নয় অবশ্য।
গত সপ্তাহেই 'দ্য ওয়াল'-এর সেই এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে অপর্ণা সেন জানান, আরজি কর কাণ্ডে শহরজুড়ে গণঅভ্যুত্থান দেখে এ শহরের প্রতি তাঁর ভালবাসার জোয়ার এলেও, আক্ষেপও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এ শহরের মধ্যে একটা খ্যাপামি ছিল, আমরা যখন ছোট ছিলাম, শহরের মধ্যে এক ধরনের মজা ছিল। একটা বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাপার ছিল। এখন যেন মধ্যবিত্তর শহর হয়ে গেছে, ডেলি সোপ হয়ে গেছে।’
সাক্ষাৎকারের এই অংশ দেখানো হয় অঞ্জন দত্তকে। প্রশ্ন করা হয়, আপনিও কি মনে করেন শহর কলকাতার বু্দ্ধিদীপ্ত ব্যাপারটি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, মধ্যবিত্তর শহর হয়ে উঠছে ‘সিটি অফ জয়’?
প্রশ্নের উত্তরে অঞ্জন বললেন, ‘কলকাতায় মধ্যবিত্তও ছিল, বড়লোকও ছিল। কিন্তু একটা সময়ে কলকাতা শিক্ষিত মানুষের শহর ছিল। মধ্যমেধা এখন বেড়ে গিয়েছে। কলকাতায় অনেক অল্টারনেটিভ জিনিসপত্তর হতো। অল্টারনেটিভ থিয়েটার। ইংরেজি থিয়েটার। ইংরেজি গানবাজনা হতো। কলকাতা কখনওই বাঙালিয়ানা নিয়ে একমুখী পাগলামি করেনি।’
তাই অঞ্জন দত্তও বিশ্বাস করেন, শহরের মজাটা হারিয়ে যাচ্ছে, নিজস্বতা হারিয়ে যাচ্ছে। একাধিক গানের কথায় প্রিয় শহরটাকে জুড়ে রেখেছেন অঞ্জন দত্ত। তিনি বলেন, ‘আমার গানে, ডেকার্স লেন, ডাক্তার লেন, ট্রাম—সব মিলিয়ে শহরের একটা মানচিত্র রেখে দিয়েছি। মৌলালীর মালা আমার গানের চরিত্র। হয়তো কোনও একদিন মৌলালী জায়গাটাই উঠে যাবে, অন্য নাম হয়ে যাবে। তবে সেটা গানে থেকে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দাস কেবিন রেখে দিয়েছি। সেলফোনের যুগেও এসটিডি বুথ রেখে দিয়েছি। আমি একেবারেই একমত অপর্ণা সেনের সঙ্গে। একটা মিডিওক্রিটি চলে এসেছে। বাঙালিয়ানার অর্থ কিন্তু অনেক বড়। তার মধ্যে ফ্রেঞ্চ, পর্তুগিজ, ডাচ সব আছে। বাঙালিয়ানা মানে কিন্তু শুধু ধুতি আর দুর্গাপুজো নয়।’
কথা শেষে গান গেয়ে ওঠেন অঞ্জন। ‘ডিগামা সাহেবের কেক…’ ধর্মতলায় হারিয়ে যাওয়া কেকের দোকানের এই গানে যেন আবারও মনে করিয়ে দেন, শহর কলকাতার প্রাণ লুকিয়ে আছে এমনই বহু বর্ণে, ছন্দে, গন্ধে, হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিতে। সেই নস্ট্যালজিয়াকে ধরে রাখাও একটা কর্তব্য, দায়িত্ব। এ বিষয়ে অঞ্জন দত্ত যে সামনের সারিতেই রয়েছেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।