
পাঞ্জাবি হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হয়েছিল হরিকৃষন গিরি গোস্বামীর ওরফে মনোজ কুমারের।
শেষ আপডেট: 4 April 2025 13:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জন্মেছিলেন অবিভক্ত ভারতে। দেশভাগের সময় বয়স ছিল ১০। সে কারণে গোটা দেশটাকে আড়াআড়িভাবে দুটুকরো করার যন্ত্রণা চোখের সামনে শুধু দেখেছেন, তাই নয়। হাড়েহাড়ে টের পেয়েছেন। বর্তমানে সুদূর পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত জেলার আবোট্টাবাদে পাঞ্জাবি হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হয়েছিল হরিকৃষন গিরি গোস্বামীর ওরফে মনোজ কুমারের। সেখান থেকে পরিবারের হাত ছোট্ট একরত্তি ১০ বছরের বালক হরিকে ভিটেমাটি ছেড়ে রাতারাতি চলে আসতে হয় জান্ডিয়ালা শের খান পার্বত্য এলাকা পেরিয়ে দিল্লিতে।
চোখের সামনে দেখেছেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বানের জলের মতো ভেসে আসা উদ্বাস্তু পাঞ্জাবি-হিন্দুদের স্রোত। যার জলজ্যান্ত সাক্ষী ছিলেন নিজেও। সে কারণে ছোট থেকেই তাঁর মধ্যে গড়ে উঠেছিল এক পাহাড়প্রমাণ দেশভক্তি। যাকে কেউ বলে দেশাত্মবোধ, কেউ বলে জাতীয়তাবাদ, কেউ নাম দেন দেশপ্রেম। মনোজ কুমার ভারতীয় জনপ্রিয়তম হিন্দি সিনেমা মাধ্যমে সেই বোধকেই সেলুলয়েডে কবিতা করে তুলেছিলেন। ভারতীয় যে কোনও কিছু তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ছিল। ভোলাভালা দেহাতি মানুষের আধোআধো বোলের চেহারায় মনোজ কুমারকে যে জমির হেলে চাষা বলেই মনে হতো। আর এই চেহারাটাকেই কাঁধে ধরা হালের মতো সিনেমার পর্দায় বিপ্লবের কাজে লাগিয়েছিলেন অভিনেতা।
মনোজ কুমারের আগে ভারতীয় ছায়াছবি ছিল মূলত পৌরাণিক কাহিনি নির্ভর। সেই আগল ভেঙে বেরিয়ে এসে হিন্দি সিনেমার প্রেম-বিরহের নিশ্চিত আঁচলের তলায় মুখ গুঁজে দেয়। দেব আনন্দ, রাজ কাপুর, দিলীপ কুমার, গুরু দত্ত এমনকী শাম্মি কাপুররাও সেই কাশ্মীর, মুসৌরি, নৈনিতাল, শিমলা-মানালির বরফে গড়াগড়ি খেয়ে নতুবা উচ্চশিক্ষিতদের বেকারি, কালা বাজারি, আর্থ-সামাজিক দুর্নীতির ও বৈষম্যের পেষাইকলে মধ্যবিত্তের চরম হতাশাগ্রস্ত দৈন্যতার লড়াইয়ের মধ্যে প্রেমের জয়েই ছবির বিষয়বস্তু সীমাবদ্ধ রাখলেন। এর মধ্যে অবশ্য ভারত-চিন যুদ্ধ, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জমিদারি, অবলুপ্তপ্রায় রাজতন্ত্রের অত্যাচারের ভিতরেও মূল বিষয়বস্তু রাধা-কৃষ্ণের মতো প্রেমের সমাপনে সিনেমা তৈরি হয়েছে। এই পরিবেশে অন্ধকার হলে ৩ ঘণ্টার বিনোদন ব্যবস্থায় পুরোপুরি বাণিজ্যিক ছবির নয়া বসন্ত নিয়ে ঢুকলেন মনোজ কুমার।
প্রেমের বাইরেও দেশ, জাতীয় সংস্কৃতি, নাগরিক কর্তব্য ও অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে লড়াই, পশ্চিমী সংস্কৃতির পাশে ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি যে সবকিছুর ঊর্ধ্বে, তাকে নিয়ে এলেন পর্দায়। নাভি-প্রদর্শনে নায়িকার দেহাতি নাচ, ঝরনার জলে প্রাকৃতিক স্নানের পাশাপাশি তাঁর সিনেমায় ছিল দেশ। এই একজন নায়ক স্যুট-হ্যাট-বুট ছেড়ে হাঁটু পর্যন্ত ধুতি, গায়ে সুতির পাঞ্জাবি, মাথায় গামছা বেঁধে হাল ধরে চাষের মাঠে নামলেন। মহেন্দ্র কাপুরের কণ্ঠে মনোজ কুমার গেয়ে উঠলেন- মেরে দেশকি ধরতি সোনা উগলে, উগলে হিরেমোতি...।
যে গান আজও স্বাধীনতা দিবস, সাধারণতন্ত্র দিবসে রাস্তার মাইকে বাজে। মনোজ কুমারের সিনেমা ভারতীয় দর্শককে দেশ নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। প্রেম-বিরহের গল্পের মধ্যেই নিপুণ সুঁচে গাঁথা ছিল দেশভক্তির কথা। জয় জওয়ান, জয় কিষাণের স্লোগানকে তিনি সিনেমার মন্ত্র করে দিয়েছিলেন। তাই অন্যান্য অনেক অভিনেতার মতো শুধু সামাজিক-পারিবারিক কাহিনির মধ্যে রিলকে গুটিয়ে রাখেননি। তাকে বিস্তৃত করে দিয়েছিলেন দেশের দর্শকদের মধ্যে। সে কারণেই তাঁর সিনেমা রিলিজ করলেই একসময় পাগলের মতো মানুষ ছুটতেন সিনেমা দেখতে। আর এ বিষয়ে কোনওদিন প্রযোজককে পথে বসতে হয়নি তাঁর কারণে।
মনোজ কুমারের অভিনয়েরও এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতার নায়ক (শাম্মি কাপুর ছাড়া) আরব সাগর তীরে প্রায় ছিলেন না বললেই চলে। ছিপছিপে শরীর দীর্ঘদিন ধরে রেখেছিলেন যোগাভ্যাসে। এখনকার জিম-চলতি নায়কদের মতো নয়। অদ্ভুত এক আদুরে চেহারায় আমজনতার মতোই ত্বকের রং ছিল শ্যামাটে। যেখানে বলিউড সাধারণত সাদা আরশোলার মতো নায়ক দেখতে অভ্যস্ত, সেখানে মনোজ কুমার যেন দর্শকদেরই প্রতিনিধি হয়ে ধরা দিলেন পর্দায়। আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল, কোনও অভিনেতার নকলনবিশি করেননি কোনওদিন। যেমন, ঘাড় কাঁপানো, খুব তাড়াতাড়ি ডায়ালগ বলা, ভ্রু বেঁকিয়ে কাঁধ ঝুঁকিয়ে দাঁড়ানো কিংবা হাঁটাচলায় কোনও বিদেশি নায়ককে নকল করার প্রবণতা ছিল না। তাই ভারতীয় দর্শক কুঁড়েঘরের প্রতিবেশী মনে করেই বরণ করে নিয়েছিল মনোজ কুমারকে।
১৯৫৭ সালে প্রথম ছবি ফ্যাশনে অভিনয় করে সুপার ফ্লপ হন মনোজ কুমার। পরের বছরেই সাহারা, তার পরের বছর চান্দ, ১০৬০-এ হানিমুন করার পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। প্রথম নায়ক পদে মনোনীত হন কাঞ্চ কি গুড়িয়ায় (১৯৬১)। ওই বছরেই একের পর এক পিয়া মিলন কি আস, সুহাগ সিন্দুর, রেশমি রুমাল ছবিতে নায়ক হন। যদিও প্রায় সবগুলিই তাঁর ভাগ্যের বিপরীতে যায়। ১৯৬২ সালে বিজয় ভট্টের হরিয়ালি অউর রাস্তায় মালা সিনহার বিপরীতে অভিনয় করে তাঁর প্রচার ছড়িয়ে পড়ে।
ওই বছরেই করেন 'শাদি', 'ডঃ বিদ্যা' এবং 'গৃহস্থী' (১৯৬৩)। পরের বছর রাজ খোসলার ওয়ো কৌন থি সিনেমা সুপারডুপার হিট। তার সঙ্গে মদন মোহনের সুরে লতার কণ্ঠে লগ জা গলে, নয়না বরসে রিমঝিম গানে সাধনার লিপিং। ১৯৬৫ সাল থেকে মনোজ কুমার রাতারাতি হয়ে গেলেন বলিউডের ১০ নায়কের অন্যতম। ভগৎ সিংয়ের জীবনীচিত্র শহিদ সিনেমা বক্স অফিসে চূড়ান্ত হিট হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী পর্যন্ত সিনেমা দেখে তাঁর উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন।
এরপরের ব্লকবাস্টার হিট ছবি হল রোমান্টিক ড্রামা হিমালয় কি গোদ মেঁ, রহস্য থ্রিলার গুমনাম। ১৯৬৬-এ আবার রাজ খোসলার পরিচালনায় আশা পারেখের বিপরীতে দো বদন সিনেমাও বিপুল টাকা তোলে। এরপর শক্তি সামন্তের পরিচালনায় শর্মিলা ঠাকুরের বিপরীতে সাওন কি ঘটা বিপুল হিট করে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী মনোজ কুমারকে তাঁর স্লোগান জয় জওয়ান, জয় কিষানের উপর একটি সিনেমা করার অনুরোধ করেন। এই প্রথম ক্যামেরার সামনে থাকা ব্যক্তিটি চলে এলেন লুক থ্রুর পিছনে। পরিচালনা-অভিনয়ে রিলিজ হল উপকার (১৯৬৭)। ওই বছর বক্স অফিসে সর্বাধিক সফল ছবি হল উপকার। শুধু তাই নয় ছিনিয়ে নিল অলটাইম ব্লকবাস্টারের খেতাব।
এর পরে পাত্থর কি সনম সুপারহিট হলেও পরের ছবি সাধনার বিপরীতে অনিতা ফ্লপ করে। ১৯৬৮ সালে প্রবাদপ্রতিম অভিনেতা রাজ কাপুর ও ওয়াহিদা রহমানের সঙ্গে নীলকমল ছবি। একই বছরে দিলীপ কুমার-ওয়াহিদা রহমানের সঙ্গে আদমি। ১৯৬৯ সাল ছিল হিন্দি ফিল্ম জগতে রাজেশ খান্নার উত্থান। কিন্তু তার পরের বছরই দেশাত্মবোধের সিনেমা পুরব অউর পশ্চিম রিলিজ করিয়ে সকলকে চমকে দিলেন মনোজ কুমার। যা শুধু এদেশেই নয়, বিদেশের মাটিতেও সুপারহিট হয়। লন্ডনে ছবিটি টানা ৫০ সপ্তাহ চলেছিল। আয় করেছিল ২৫ কোটি টাকা। ১৯৭১ সালের সেই আয়ের রেকর্ড ভাঙে ২৩ বছর পর ১৯৯৪ সালে হাম আপকে হ্যায় কৌন সিনেমা।
১৯৭০ সালে ইয়াদগার, পেহচান এবং মেরা নাম জোকার ছবিতে অভিনয় করেন। সাতের দশকে মাঝামাঝি সামাজিক ড্রামা রোটি কাপড়া অউর মকান ছবিতে পরিচালনা ও অভিনয় করেন মনোজ কুমার। ১৯৭৫ সালে সন্ন্যাসী এবং পরের বছর দশ নম্বরি ছবি করে ব্লকবাস্টারে হ্যাটট্রিক করেন মনোজ কুমার। ১৯৭৭ সালে আমানত এবং সিরডি কি সাইবাবা ছবিও বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়। ১৯৮১ সালে ঐতিহাসিক ঘটনার উপর নির্মিত ক্রান্তি ছবিতে সহ অভিনেতা ছিলেন তিন। দিল্লি, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ এবং হরিয়ানায় ক্রান্তি টি শার্ট, জ্যাকেট, গেঞ্জি এমনকী পুরুষদের অন্তর্বাস বিক্রি হতে শুরু করে।
ওই বছরই মুক্তি পায় নসিব, লাওয়ারিশ, এক দুজে কে লিয়ে, লাভ স্টোরি ও মেরি আওয়াজ শুনো। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে ক্রান্তি ছিল বক্স অফিসে শীর্ষে। ক্রান্তির পর থেকে মনোজ কুমারের ক্যারিয়ারের পতন শুরু করে। বেশ কয়েকটি ছবিতে পরিচালনা-অভিনয় করলেও তা বাজারে চলেনি। ১৯৯৫ সালে ময়দান-এ-জঙ্গ ফ্লপ করার পর তিনি অভিনয় ছেড়ে দেন। সিনেমা জগৎ ছেড়ে ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে বিজেপিতে যোগ দেন।
সে কারণে দাদাসাহেব ফালকে বিজেতা অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সম্পাদনা সব কাজে হাত পাকানো মনোজ কুমার এযুগের প্রজন্মের কাছে অপরিচিত হলেও ভারতীয় সিনেমায় তাঁর 'উপকার' অসামান্যই থেকে যাবে। তাঁর অন্তিম যাত্রায় হয়তো 'আকাশবাণী'তে বেজে উঠবে মুকেশের দর্দভরা কণ্ঠে সেই গানের কথাগুলি- জব কোই তুমহারা হৃদয় তোড় দে...তব তুম মেরে পাস আনা প্রিয়ে, মেরা দ্বার খুলা হ্যায়, খুলা হি রহেগা।