
অভিষেক, রাজেশ্বরী
শেষ আপডেট: 9 April 2025 17:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রসেনজিৎ, তাপস পাল আর চিরঞ্জিতের জমানায় আরও এক ঝকঝকে তরুণকে ছবিতে নিয়ে এলেন তরুণ মজুমদার। 'পথ ভোলা' দিয়ে, আটের দশকে বাংলা সিনেমায় পা রেখেছিলেন তিনি। টলিউডের কার্তিক, অভিষেক চট্টোপাধ্যায় (Abhishek Chatterjee)। বাবরি চুল, সুন্দর গোঁফ আর সুদর্শন চেহারাই ছিল ইউএসপি। যদিও পরবর্তীকালে সেই চেহারাই শেষ হয়ে যায় অভিষেকের। কয়েক বছর আগে প্রয়াতও হয়েছেন তিনি। তাঁর কন্যা সাইনা চট্টোপাধ্যায়-ও সদ্য পা রেখেছেন টলিউডে।
সেই আটের দশকের শুরুতে রাজেশ্বরী রায়চৌধুরী (Rajeswari Roychowdhury) সফল অভিনেত্রী ছিলেন। তাঁকে সিঁড়ি করেই উপরে উঠতে চেয়েছিলেন অভিষেক (Abhishek Chatterjee)। অভিষেকের রাজু আর রাজেশ্বরীর মিঠু। পরস্পরকে এই নামেই ডাকতেন তাঁরা। বিয়ে না করেও থাকতেন একসঙ্গে। সে যুগের বাঙালি সমাজে এই লিভ ইন সংসার বেশ অবিশ্বাস্য ব্যাপার ছিল।
বয়সে বড় মহিলার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে সেই থেকেই ইন্ডাস্ট্রিতে চর্চিত ছিলেন অভিষেক। তাঁর অভিনয়ের কদর যত না হত, তার থেকেও বেশি কথা হত এই লিভ ইন সম্পর্কের রসালো গল্প নিয়ে।
রাজেশ্বরী ছিলেন মহুয়া রায়চৌধুরীর সমসাময়িক অভিনেত্রী। পূর্ণেন্দু পত্রীর 'স্ত্রীর পত্র' ছবি দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় রাজেশ্বরীর। এরপর বাণিজ্যিক ছবির অভিনেত্রী হয়ে যান তিনি। 'অনুরাগের ছোঁয়া', 'উৎসর্গ', 'আবির' প্রভৃতি ছবিতে মহুয়া রায়চৌধুরীর সহ-অভিনেত্রী হতেন রাজেশ্বরী।
প্রথম নায়িকা হয়ে সাফল্য পান 'ডাক্তার বউ' ছবিতে। এরপর 'শঙ্কা', 'শক্তি', 'ব্যবধান' ছবিতেও ছিলেন রাজেশ্বরী।
বিখ্যাত কবি কবিতা সিংহর মেয়ে ছিলেন রাজেশ্বরী। বিয়ে করেছিলেন প্রথম যৌবনের প্রেমিককে। তিনটি সন্তানও ছিল তাঁদের। প্রথম দিকে সংসার নিয়েই মেতে ছিলেন রাজেশ্বরী। কিন্তু অভিষেকের সঙ্গে প্রেম শুরু হতেই দূরত্ব তৈরি হয় স্বামীর সঙ্গে। ‘সাধারণ’ বর রাজেশ্বরীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারতেন না বলেই হয়তো সে জায়গা নেন অভিষেক।
শেষমেশ সংসার ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে রাজেশ্বরী চলে আসেন অভিষেকের দক্ষিণ কলকাতার ফ্ল্যাটে। অভিষেক তখন একাই থাকতেন। নিয়মিত জিম করতেন, শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে খুব সচেতন ছিলেন। সে সময়ে এমনটা বড় দেখা যেত না। তাই অভিষেক হেঁটে গেলে চারদিকে গুঞ্জন তৈরি হত। রূপের দিক থেকে প্রসেনজিৎ বা তাপস পালদের তুলনায় অভিষেক দর্শকমনে এগিয়ে ছিলেন। বহ্নিপতঙ্গের মতো তরুণীরা ছুটে আসতেন অভিষেকের দিকে।
তবে কমবয়সি মেয়েদের কাছে অভিষেকের চাহিদা থাকলেও, অভিষেক বেছে নেন বয়সে অনেক বড় মহিলা রাজেশ্বরীকেই। তাঁরা যেন ছিলেন টলিউডের মীনাকুমারী আর ধর্মেন্দ্র জুটি।
এমনকি সে সময়ের একটি জনপ্রিয় সিনেপত্রিকা ফোটোশ্যুটও করেছিল অভিষেক আর রাজেশ্বরীর এই লিভ ইন সংসারের। সাহসী অন্তরঙ্গ অবস্থায় ছবি তোলেন দু’জন। ফোটোগ্রাফার ছিলেন নিমাই ঘোষ।
প্রচ্ছদে ছাপা হল, অভিষেকের কোলে চড়ে বসে সাহসী পোশাক পরা রাজেশ্বরী। ছবি দেখে কেঁপে উঠেছিল কলকাতা। শিহরিত হয়েছিল পাঠক-দর্শক মহল।
কিন্তু এত প্রেম নিভেছিল অবসাদে। একটা সময় পর প্রাণের রাজুকে ছেড়ে চলে যান অভিষেক। রাজেশ্বরী অন্য একটি সাধারণ ফ্ল্যাটে উঠে আসেন। সেখানেই একা থাকতে থাকতে নেশার কবলে পড়েন রাজেশ্বরী। দিনের অর্ধেক সময় কাটত মদের গ্লাসেই। অন্যদিকে অভিষেকও মেতে ওঠেন নতুন নতুন অভিনেত্রীর আলিঙ্গনে, নতুন জীবনের মোহে।
অতিরিক্ত মদ্যপানে সিরোসিস অফ লিভার হয় রাজেশ্বরীর। সেই সঙ্গে সারা শরীর হলুদ হয়ে যায় হেপাটাইটিস বি অসুখে। শেষদিকে ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে। বারবার ভাবতেন অভিষেকের কথাই। নয়ের দশকের মাঝামাঝি অল্প বয়সেই প্রয়াত হন জনপ্রিয় অভিনেত্রী রাজেশ্বরী রায়চৌধুরী। তা শুনে ব্যথিত হয়েছিল বাংলা ছবির দর্শক মহল।
মা কবিতা সিংহও মেয়ের স্বেচ্ছাচারে পরিতাপ করে চোখের জল ফেলেছিলেন। অভিষেক কিন্তু পরে আর রাজেশ্বরীর কথা নিয়ে আলোচনা করেননি। যেন এই ঘটনা, সেই লিভ ইন সংসার তাঁর জীবনে ঘটেইনি!
যদিও পরবর্তীকালে স্ত্রী সংযুক্তাকে বিয়ে করার পর অভিষেক আর কোন নারীসঙ্গে জড়াননি। আজ রাজেশ্বরী আর অভিষেক, দু’জনেই প্রয়াত। তবু রুপোলি জগতের বাতাসে ভেসে বেড়ায় এই অসম প্রেমের গল্প।