পাঁচতারা হোটেলের পেল্লাই স্ক্রিনে যখন ‘গৃহপ্রবেশ’ ঘটল, গানটি বাজছিল। ঠিক এই গানই আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছিল, ‘চলে যাওয়া’ এক মানুষকে।মঞ্চে বসা জ্ঞাণীগুণী ব্যক্তিদের প্রত্যেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন তাঁকে।

সঙ্গে ঋতুপর্ণ
শেষ আপডেট: 30 May 2025 20:46
আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি মন বান্ধিবি কেমনে?
পাঁচতারা হোটেলের পেল্লাই স্ক্রিনে যখন ‘গৃহপ্রবেশ’ ঘটল, গানটি বাজছিল। ঠিক এই গানই আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছিল, ‘চলে যাওয়া’ এক মানুষকে।মঞ্চে বসা জ্ঞাণীগুণী ব্যক্তিদের প্রত্যেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন তাঁকে। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, মহেন্দ্র সোনি, শুভশ্রী, রাজ চক্রবর্তী, সৃঞ্জয় বসু, কিংবা আবির চট্টোপাধ্যায়দের স্মৃতিতে প্রয়াণের ১২ বছর পর তেমনভাবেই ‘জীবিত’ রয়েছেন ‘তাঁদের’ ঋতুপর্ণ ঘোষ। ছিল ‘গৃহপ্রবেশ’-এর ট্রেলার লঞ্চের, যথারীতি এক আনন্দের দিন। কিন্তু সেই আনন্দের দিনে মিশে গেল এক অদ্ভূত মন কেমন।
কারণ এ তারিখেই তো চলে গিয়েছিলেন তিনি। ঋতুপর্ণ এই দিন থেকেই যে নেই...আজ ৩০ মে।
নতুন ছবির একেবারে শুরুর দিনে, স্মৃতিতে ভেসে বেড়াল শুধু ঋতু কথা। কারণ পরিচালক ইন্দ্রদীপের মনের ‘গৃহপ্রবেশ’-এ যে এখন ঋতুপর্ণ গেঁথে। তাই বোধহয় ‘গৃহপ্রবেশ’-এ ঋতুপর্ণ তবু রয়ে গিয়েছেন প্রতিটি ফ্রেমের আড়ালে। তাঁর চলে যাওয়া মানে যেন আকাশে অজস্র মেঘের ছায়া। ছুঁতে না পারা আলো আর অভিমানের বৃষ্টি। প্রেম আর বেদনার সীমানায় হেঁটে যাওয়া এক কবির মতো। সেই কবিতায় শব্দের সুতো দিয়েছেন মাত্র অভিেনতা-অভিনেত্রীরা। শুভশ্রী, জিতু, কৌশিক, রুদ্রনীল, সোহিনী, স্নেহারা হয়ে উঠেছে ‘ঋতুদা’র চরিত্র। ইন্দ্রদীপের নয়। ইন্দ্রদীপও কি তাই চেয়েছিলেন, কে জানে?
‘ঋতু স্মৃতি’ যে বৃষ্টি নামিয়েছিল, ৩০ তারিখের সন্ধেতে। তা দু’ফোটা নেমে এসেছিল কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের চোখেও। ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ ছবিতে ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রথম অভিনয়। কৌশিকের শব্দের বুনোট জমাটি মেঘের মতো। ছিঁড়ে ছিঁড়ে তা পড়তে থাকে। ছবিতে মেয়ে সেজেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। সিনেমার ঋতু তো নিজের জীবনেও তাই-ই ছিলেন। কিন্তু সিনেমা শেষের পর যখন চরিত্রকে ছেড়ে যেতে হয়। ঠিক সে সময়ের এক ঘটনার কথা বললেন কৌশিক, ‘...ঋতুপর্ণ ঘোষ একটা কালো হারেম প্যান্ট আর ব্ল্যাক টিশার্ট পরে, ন্যাঁড়া মাথায় তখন দাঁড়িয়ে মেক আপ রুমে। টিস্যুগুলো দিয়ে মেকআপটা তুলছে। চোখের কাজল লেপটে গিয়েছে সারা মুখে। অসহায় লাগছিল, করুণ দেখাচ্ছিল, কাঁদছে। ঋতুদা আমাকে দেখে আরও কাঁদতে থাকল। আর বলল ‘মেয়েটা চলে গেল!’ থামলেন কৌশিক।
ঋতুপর্ণ ঘোষ একেবারেই নতুন ছাঁচে গড়েছিলেন প্রসেনজিৎ-কে। লুকিয়ে থাকা প্রসেনজিৎ-কে সযত্নে টেনে বের করেছিলেন তিনি। ‘চোখের বালি’, ‘উৎসব’, ‘দোসর’ কিংবা ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’, সব ছবিতে প্রসেনজিতকে আলাদা রকম করে। ভিন্নভাবে। প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণর বন্ধুত্বর কাহন, তা টলিপাড়ার মুখে মুখে, এমন সে বন্ধুত্বর টান যে দু’-আড়াই বছর কথা বন্ধও হয়ে গিয়েিল দু’জনের।
প্রসেনজিৎ বললেন, ‘ও (ঋতুপর্ণ) গল্প লিখেছিল, আমার একটা সিরিয়ালের, ওর প্রচুর ফার্নিচার ছিল সেটে। একদিন সকাল আটটায় কল এলো প্রোডাকশন থেকে, ঋতু নাকি টেম্পো করে এসে সব ফার্নিচার নিয়ে চলে গেছে! তখন আমাদের ঝগড়া! আমি বললাম শুটিং তো করতে হবে। কিনে এনে শুটিং শুরু করো, আমি দেখছি!’
বন্ধুত্বে ‘অভিমান’-এর নিদর্শন কি আর কেউ দিতে পারে ঋতুপর্ণ ছাড়া?
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ঠিক পাশে বসেছিলেন মহেন্দ্র সোনি। প্রযোজক তো বটেই, কিন্তু ‘ঋতুদা’ তার কাছে ঠিক কী, তার বর্ণনায় যা লেখা যেতে পারে, তা পরিষ্কার করে বললেন, মডারেটর ইন্দ্রনীল রায়। ‘এখনও পর্যন্ত মণির ফোন ঘাঁটলে, ঋতুদার মেসেজ থেকে ইমেল পাওয়া যাবে। ডিলিট করেনি’।
স্মিতভাষী মহেন্দ্র সোনী বললেন, ‘হইচই-এর এই সময়, যদি আজ ঋতুদা থাকতেন, ১২-১৩টা শো করে ফেলতেন এতদিনে!’ থামলেন না, বললেন ‘আজকে নেটফ্লিক্সে যে ছবিগুলো দেখে আমরা লাফালাফি করি, ঋতুদা সকালে ঘুম থেকে উঠে ৪টে ছবি অমন বানিয়ে দিতেন। এখন বুঝতে পারি ওঁক কনটেন্টের জোর। নেটফ্লিক্সের ক্ষতি যে ঋতুদা নেই!’
স্মৃতির আমেজ যদি একটিবারের জন্য ছুঁয়ে ফেলে, তার সুগন্ধ যেমন ভর করে, ঠিক তেমন হচ্ছিল তখন। সংবাদ প্রতিদিন-এর সম্পাদক সৃঞ্জয় বসু আলাপ করালেন ‘রোরবার’-এর দায়িত্বে থাকা সেই ঋতুপর্ণর সঙ্গে, বললেন, ‘ঋতুপর্ণ ঘোষ পারফেকশনিস্ট। খবরের কাগজ ছাপার জন্য চলে গিয়েছে, কিন্তু ঋতুদার প্রুফ তখনও শেষ হয়নি। আজকের দিনেও ওঁকে আমি মিস করি। প্রতিদিন সাড়ে পাঁচটায় ফোন আসত, বলতো বাবু তুই জেগে আছিস? আমি বললাম, না ঋতুদা এখন তো জেগে...আমার কথা থামিয়ে বলত, আচ্ছা তুই অফিসে আয়, কথা হবে।’

আবির চট্টোপাধ্যায় তখন ‘ব্যোমকেশ’ হচ্ছেন। অঞ্জন দত্তর ‘ব্যোমকেশ’। এমন এক দিনে হঠাৎ করেই ‘ঋতুদা’র আগমন সেই সেটে। গোটা দিন ‘ঋতুদা‘ সাজিয়েছিলেন আবিরকে। ব্যোমকেশ’-এর চাদরের স্টাইলাইজেশন নিজের হাতে শিখিয়ে দিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। এমন এক ‘ব্রেকিং’ খবর দিলেন আবির স্বয়ং।
ঋতুপর্ণ ঘোষ। রাতের গহীন নীলিমায় হারিয়ে যায় যেমন আলো। সেভাবেই, একদিন হারিয়ে গেলেন তিনি। অথচ তাঁর স্মৃতিরা ছায়ার মতো চারপাশে লেপ্টে থাকে, নিঃশব্দে বয়ে নিয়ে আসে শব্দহীন রাগিনী। তাঁর চলে যাওয়া যেন নিস্তব্ধ জোছনার মতো, স্নিগ্ধ অথচ অনন্ত শূন্যতার স্পর্শে ভরা। চলচ্চিত্রের পর্দায় গল্প বলতেন, তাঁর শব্দরা বাতাসের মৃদু স্পর্শের মতো নরম। ভাঙা স্বপ্নের কোলাজ, ম্লান রঙের মেলোডি। মৃত্যুর অবধারিত সীমানা পেরিয়ে, ‘ঋতুদা’ রয়ে যান অনুভূতির আকাশে – নিঃশব্দ অথচ মর্মস্পর্শী। তাঁর মৃত্যু কোনও সমাপ্তি নয়। বরং, তাঁর শেষ নিঃশ্বাসে জন্ম নেয় এক নতুন ভাষা – স্মৃতির ভাষা। অদ্ভুত সেই ভাষা – যেখানে নেই কোনও সরলরেখা, নেই কোনও পূর্ণচ্ছেদ। আছে কেবল এক অদৃশ্য রেখাচিত্র, যেটি কেবল অনুভব করা যায়।
আজকের সন্ধ্যায় যখন ‘গৃহপ্রবেশ’-এর পদার্পণ। শুভশ্রী-জিতু-কৌশিক, সোহিনী- রুদ্রনীলদের যখন নতুন ছবির দিন। সেই দিনের মে আসে আকাশের কোণে, মনে পড়ে যায় এক আলোর কথা – এক মেঘের ফাঁকে ঢাকা আলো যা ঋতুপর্ণ ঘোষের ভিউফাইন্ডারে ধরা পড়ে। যা মুগ্ধ করে – বারবার নতুন করে। এইভাবে শেষ হয় এক অধ্যায় ,আর শুরু হয় অন্য কোনও গল্প। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আলো ছড়ানো মানুষটির স্মৃতি তাই, কোনও দিন বিদায় নেয় না। ‘গৃহপ্রবেশ’ হয়।