
Utpala Sen, Satinath Mukhopadhyay
শেষ আপডেট: 13 March 2024 12:26
প্রান্তরের গান আমার, মেঠো সুরের গান আমার হারিয়ে গেল কোন্ বেলায়, আকাশে আগুন জ্বালায় ..
পঞ্চাশের দশকে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়,আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়াও বাংলা গানে আর এক প্রতিভাময়ী সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন তিনি উৎপলা সেন। ১২ ই মার্চ,২০২৪ শতবর্ষে পা রাখলেন উৎপলা সেন। উৎপলা সেনের গানে গল্পে কলম ধরলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
উৎপলা সেন শতবর্ষে কতটা প্রাসঙ্গিক? এ যুগের ছেলেমেয়েরা তাঁকে চেনেন? পঞ্চাশ ষাটের দশকে উৎপলা সেন-সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের জুটিকে আধুনিক বাংলা গানের উত্তম-সুচিত্রা জুটি বলা হত। এতটাই জনপ্রিয়তা ছিল। নবীন প্রজন্মের ভিতর তাঁদের সুর, তাঁদের গান সঞ্চারিত করতেই এই লেখা। অন্তত শতবর্ষে উৎপলা সেন সেভাবেই বেঁচে থাকবেন।
উৎপলা-সতীনাথ প্লেব্যাকে দুজনে একসাথে খুব বেশি গাননি। আধুনিক গানেই দুজনে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠেন। তবে ওঁদের জুটির আইকনিক গান 'ভাগ্যের চাকাটা তো ঘুরছে, ভাগ্যের চাকাটা তো ঘুরবেই', ছিল একটি বাংলা ছবির গান। এই গানটা কলকাতা দূরদর্শনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গেয়েছিলেন উৎপলা-সতীনাথ। উৎপলার বড় টিপ,বড় কালো কাঁচের চশমা, বব কাট চুলে জমকালো সাজের দাপট। আর তাঁর পাশে সতীনাথ ততটাই স্নিগ্ধ। শ্বেতশুভ্র ধুতি-পাঞ্জাবিতে নিপাট ভালমানুষ। দূরদর্শনের সংগ্রহে থাকা উৎপলা-সতীনাথের বলতে গেলে একমাত্র গানের অনুষ্ঠান।
১৯৮০সালের ছায়াছবি 'ভাগ্যচক্র', সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। এই ছবিতে ওঁনার সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, আরতি মুখোপাধ্যায় এবং অরিন্দম গাঙ্গুলী সবার প্লে ব্যাকের রিহার্সাল চলছে কিন্তু উৎপলা বা সতীনাথ তখনও নিজেদের জন্য কোনও গান সৃষ্টি করেননি। তখন ছবির পরিচালক অজয় বিশ্বাস বললেন, "সতীনাথদা, আপনার আর উৎপলাদির একটা ডুয়েট কিন্তু চাই"..... কারণ উনিও জানাতেন যে উৎপলা সতীনাথের ডুয়েটের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে।
সতীনাথ বললেন, " সমস্ত গান তো গল্প অনুযায়ী করেছি সেখানে আমার আর উৎপলার ডুয়েট কি করে হবে।" কথা শেষ করার আগেই অজয় বিশ্বাস বলে উঠলেন, " আপনি চিন্তা করবেন না সতীনাথদা, আপনি গান রেডি করুন, আমি ছায়াছবিতে সিকোয়েন্স তৈরি করে দেবো।" এইভাবে সৃষ্টি হয়েছিল গীতিকার শ্যামল গুপ্তর কথায়, সতীনাথের সুরে এবং উৎপলা সতীনাথের কন্ঠের জাদুতে 'ভাগ্যের চাকাটাতো ঘুরছে ভাগ্যের চাকাটা তো ঘুরবেই'। ছবিতে সুলতা চৌধুরী আর সমর কুমারের আইটেম নাচে ব্যবহার হল এই গান। ভাগ্যচক্র ছবি ফ্লপ করলেও উৎপলা-সতীনাথের 'ভাগ্যের চাকাটাতো ঘুরছে' সুপার ডুপার হিট করল।
উৎপলা সেন ছিলেন ঢাকার মেয়ে। জন্ম ১৯২৪ সালের ১২ মার্চ। ঢাকার রায় বাহাদুর পরিবারের সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়ে ছিলেন তিনি। সুন্দর মুখ দেখে রায়বাহাদুর ঠাকুরদা নাতনির নাম রেখেছিলেন উৎপলা। উৎপলার মা ছিলেন আনন্দময়ী মায়ের অষ্টসখীর এক সখী, সঙ্গীত সাধিকা হীরনবালা দেবী। মায়ের কাছেই মেয়ের প্রথম সঙ্গীত শিক্ষা। তিরিশের দশকের শেষের দিকে ঢাকা বেতারকেন্দ্রে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে যোগ দেন উৎপলা সেন। ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণের দিন ঢাকা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছিল কিশোরী উৎপলার কন্ঠে 'নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ' কবিতা। গানের পাশাপাশি কবিতাপাঠ, নাটকে অভিনয়ও রেডিওতে করতেন উৎপলা। উৎপলার রায়বাহাদুর বাবা কিন্তু মেয়ের বাইরে গান গাওয়া পছন্দ করতেন না। নিজের স্ত্রীকেও বাইরে গাইতে দিতেন না। এমনকী গান গাওয়ার অপরাধে ঢাকার স্কুল থেকে বিতাড়িত হতে হয় উৎপলাকে। কিন্তু স্টেটসম্যান কাগজে উৎপলার গানের ভূয়সী প্রশংসা বেরলে স্কুল উৎপলাকে সাদরে ডেকে নিয়েছিল।
১৯৪৪ সাল ঢাকা থেকে কলকাতা এসেছিলেন উৎপলা ঘোষ। গুরু সুধীরলাল চক্রবর্তীর তালিমে রেকর্ডও বেরিয়েছে উৎপলার। রেকর্ড বেরতেই সাড়া ফেলে দিল। উৎপলা ঘোষ তখন স্কটিশ চার্চ কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। 'শুকতারা গো নিওনা বিদায়' আর 'এক হাতে মোর পূজার থালা' গান গেয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন উৎপলা। পরবর্তী কালে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে গাইতে এসে কিশোরকুমার উৎপলা সেনের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলেছিলেন, ‘‘দিদি, আপনার ‘এক হাতে মোর পূজার থালা’ গানটা আমার বাড়ির লাইব্রেরির কালেকশনে আছে।’’ ক্লান্ত শরীরে শ্যুটিং সেরে বাড়ি ফিরে উৎপলা সেনকে ফোন করে উত্তমকুমার বলতেন, ‘‘প্লিজ একবার তোমার ‘আমি তোমায় ছাড়া আর কিছু হায় ভাবতে পারি না’ গানটা একটু শোনাবে?’’ সুচিত্রা সেন চেয়েছিলেন উৎপলা সেন তাঁর লিপে "এই পথ যদি না শেষ হয়" গান গাইবেন। যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এমন তাবড় তাবড় শিল্পীদের কাছের মানুষ ছিলেন কিংবদন্তী উৎপলা সেন।
গুরু সুধীরলাল চক্রবর্তী আর পঙ্কজ মল্লিকের হাত ধরে উৎপলার প্রথম প্লে ব্যাক 'মেরি বহেন' ছবিতে। বাংলা ছবির প্লে ব্যাকে ব্রাত্য করেই রাখা হয়েছিল উৎপলাকে। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জমানায় উৎপলা সেন বাংলা ছবিতে নায়িকাদের লিপে গানখুব বেশি পাইনি। যদিও সুচিত্রা সেনের প্রিয় পাত্রী ছিলেন উৎপলা। অসিত সেনের 'জীবন তৃষ্ণা' ছবিতে ভূপেন হাজারিকার সুরে উৎপলা গেয়েছিলেন সুচিত্রার লিপে 'আবার নতুন সকাল হবে'। রবীন্দ্রসঙ্গীতে উৎপলা বাংলা ছবিতে যেকটি গান গেয়েছিলেন সবেতেই আইকনিক। 'বৌ ঠাকুরাণীর হাট'-এ উৎপলা সেন আর প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান সেই পূর্ণিমা রাতে বজ্রার সখীদের লিপে 'চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে'। সবথেকে উৎপলার যে গান বিখ্যাত অরুন্ধতী দেবীর লিপে 'বিচারক' ছবিতে 'আমার মল্লিকা বনে'। অরুন্ধতীর হাসির সঙ্গে মিলে যায় উৎপলার ঝিম ধরা কন্ঠ। মিতা চট্টোপাধ্যায়ের লিপে উৎপলার রয়েছে একটি হিট গান 'এক টুকরো আগুন' ছবিতে 'ও বিরহী সরে থেকোনা'। উত্তমকুমারের পরিচালনায় 'বনপলাশীর পদাবলী' ছবিতে উৎপলা গেয়েছিলেন 'বহুদিন পরে ভ্রমর এসেছে পদ্ম বনে'।
উৎপলা সেনের সঙ্গীত জীবনের মতোই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও বৈচিত্রময়। সিনেমার মতোই রঙিন উৎপলার ব্যক্তিগত জীবন। বাড়ি থেকে উৎপলার বিয়ে দেওয়া হয়েছিল অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত বেণু সেনের সঙ্গে। স্বামীর সোহাগ উৎপলার ভাগ্য সইলনা। বেণু সেনের মৃত্যুতে অকালেই বৈধব্য যোগ নেমে আসে উৎপলার। তখন কোলে একমাত্র ছেলে আশিস। পুত্রবধূর এই বৈধব্য যন্ত্রনা মেনে নিতে পারেননি শাশুড়ি। বৌমাকে বলেন আবার বিয়ে করতে। যা বিরল বঙ্গসমাজে। যেখানে বিধবা বৌমাকেই অলুক্ষণে সাব্যস্ত করেন শাশুড়িরা ছেলের মৃত্যুশোকে সেখানে শাশুড়ি এমন নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেন। উৎপলার গানের সতীর্থ ছিলেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। উৎপলার শাশুড়ি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিধবা উৎপলার আবার বিয়ে দিয়েছিলেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সতীনাথ কন্যা সন্তান ভালবাসতেন। কিন্তু উৎপলার ছেলে বাবুন ওরফে আশিসের দিকে চেয়ে নিজে আর সন্তান চাননি সতীনাথ। তখন কিন্তু আশিস সদ্য যৌবনে পা দিয়েছেন। ছেলে সমেত উৎপলাকে বিয়ে করতে সতীনাথ দুবার ভাবেননি। বাবুনের যদি মনে লাগে! তাই নিজের সন্তান হবার ইচ্ছেটাকে চাপা দিয়ে ছিলেন।সারা জীবন উৎপলা আর তাঁর ছেলের জন্য সব যত্নের ব্যবস্থা করেছেন। নিজে হাতে রান্না করেও খাইয়েছেন স্ত্রী পুত্রকে সতীনাথ। একে ত্যাগ বলবেন না প্রকৃত ভালবাসা? আশিসের বিয়ে হলে পুত্রবধূ পারমিতাকেও মেয়ে এল ঘরে বলেছেন সতীনাথ।
কিন্তু সুখের সংসার ভাঙল ১৯৯২ সালের ১৩ ডিসেম্বর সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে। সতীনাথের মৃত্যুর পর মানসিক ভাবে একা হয়ে পড়েছিলেন উৎপলা। আর গানের জগতে ফিরে আসেননি তিনি। সাংসারিক জীবনে শান্তি কী তখন চলে গেছিল উৎপলার? সতীনাথ যে যত্নে তাঁকে রেখেছিলেন পরে কিন্তু তা আর ছিলনা। শরীরে বাসা বাঁধে ক্যান্সার। ব্রেস্ট ক্যান্সার দেখাতে এসেছিলেন ডাক্তারের কাছে একাই। ডাক্তার নাম দেখে চমকে যান এই সেই উৎপলা সেন? তখনই খবর রটে উৎপলা সেন অসুস্থ অনটনে। ২০০৫ সালে শিল্পীরা চ্যারিটি শো করে টাকা তোলেন উৎপলা সেনের চিকিৎসার জন্য। নির্মলা মিশ্র থেকে লোপামুদ্রা মিত্র পুরনো নতুন সবাই গাইলেন উৎপলার জন্য। তাতে সাময়িক অভাব মেটে। পিজি হাসপাতালের বেডে কেটেছিল শিল্পীর শেষ দিনগুলি। ক্যান্সারের যন্ত্রণা আর চোখের জলে কোথায় হারিয়ে গেল সেই কন্ঠ 'পাখিদের ঐ পাঠশালাতে কোকিল গুরু শেখায় গান'। ১৩ মে ২০০৫ খুব কষ্টে খুব অবহেলায় প্রয়াত হলেন উৎপলা সেন। ২০০৫ সাল খুব পুরনোদিনের কথা নয়। ২০ বছর আগের ইতিহাস নিশ্চয়ই প্রত্যক্ষদর্শীরা ভোলেননি। উৎপলা যেন মরে বাঁচলেন। তিনি যেন মহালয়ার ভোরের সেই গানের মতোই বলে গেলেন
'"শান্তি দিলে ভরি-
দুখরজনী গেল, তিমির হরি..
প্রেমমধুর গীতি, বাজুক হৃদে নিতি!
প্রাণে সুধা ঢালো, মরি'গো মরি।।"
শতবর্ষে উৎপলা সেনের হারিয়ে যাওয়া গানগুলি, লুপ্ত গান গুলি নতুন করে পুনরুদ্ধার হোক এই আবেদন রইল সঙ্গীত সংগ্রাহক রেকর্ড কোম্পানিদের কাছে। তাহলেই উৎপলা সেন বেঁচে থাকবেন গানেগানে সুরেসুরে।