
প্রসেনজিৎ দেবশ্রী
শেষ আপডেট: 2 May 2025 20:39
'তোমাকে কিছু বলতে চাই...
শুনব না যে কোনও কথাই ....
শুনবে না কেন, বলব না কেন
আমরা দু'জন হব এখন একাকার যে তাই ... '
প্রেম গাঢ় হল। জানাজানি হল দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে। কিন্তু তখনও বিয়ের কথা ভাবা হচ্ছিল না। কেননা দু'জনেই তখন পায়ের তলার মাটি শক্ত করছেন। দু'জনের কাঁধেই পরিবারের দায়িত্ব। বাংলা ছবির বক্সঅফিসের সাফল্যও তাঁদেরই কাঁধে। যে জুটির বিয়ে হোক চেয়েছিল বাঙালি দর্শক। সেই তারকা জুটি হলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় (Prosenjit Chatterjee) ও দেবশ্রী রায় (Debasree Roy)। ৩০ বছর আগে আজকের দিনে ১ মে সাত পাকে বাঁধা পড়েন বুম্বা আর চুমকি। কেমন ছিল এই জুটির বিয়ের দিনটা? যদিও এই পরিণয় শুভ হল কই?
সে সময় দেবশ্রী রায় কিন্তু প্রসেনজিতের থেকে বড় স্টার। তাপস পাল বা চিরঞ্জিতের সঙ্গে জুটি বেঁধেও দেবশ্রী হিট। ততদিনে অজয় কর, অসিত সেন, অপর্ণা সেনের মতো পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করে ফেলেছেন দেবশ্রী। বম্বে-কলকাতায় একসঙ্গে ছবি করছেন। বি আর চোপড়ার 'মহাভারত' সিরিয়ালের সত্যবতী তিনি। অন্যদিকে হার্ডকোর বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা হিসেবে সবার প্রথম পছন্দ দেবশ্রী। তাঁর 'কলকাতার রসগোল্লা' নাচে তখন ফুটছে সারা বাংলা।
অন্যদিকে প্রসেনজিৎ তখন বম্বেতে সফল না হয়ে কলকাতা ফিরেছেন। যদিও বম্বের হিরোইনদের সঙ্গে 'অমর সঙ্গী' বা 'অমর প্রেম' ছবি করে প্রসেনজিৎ সুপারহিট। ১৯৯২ সালে প্রসেনজিৎ নায়ক পরিচালক রূপেও অবতীর্ণ হয়েছেন। ছবির নাম 'পুরুষোত্তম', নায়িকা দেবশ্রী রায়।
আর ডি বর্মণের সুরে অন্যধারার মেনস্ট্রিম ছবি প্রসেনজিৎ করলেও সে ছবি বক্সঅফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।
'আজ অন্ধকার যতই হোক দূর হবে
এই বন্ধ দ্বার কাঁটাতার চুড় হবে
তুমি আমি দু'জনাতে চলি সাথে ... কীসের ভয়?'
প্রসেনজিতের সব সংকট কেটে গেল দেবশ্রীর প্রেমের প্রলেপে। দুই পরিবারের সখ্যতা বহুদিনের। প্রসেনজিতের বাবা টলি-বলির সুপারস্টার নায়ক বিশ্বজিৎ। কিন্তু প্রথম সংসারকে বিদায় জানিয়ে তিনি বহুকাল দ্বিতীয় সংসার পেতেছেন বম্বেতে। প্রথম স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায় একা হাতে মানুষ করেছেন ছেলে প্রসেনজিৎ আর মেয়ে পল্লবীকে। তাই ছোটবেলা থেকেই বুম্বার স্ট্রাগল।
অন্যদিকে জীবন সংগ্রাম চালাতে হয়েছিল দেবশ্রীর মা আরতি রায়কেও । দেবশ্রীর মেজদি কৃষ্ণা রায় ( রানি মুখোপাধ্যায়ের মা) তখন মহঃ রফির সহগায়িকা প্রায় সব জলসায়। রুমকি-ঝুমকি নামে দেবশ্রী আর তনুশ্রী - দুই বোনের নাচ সব জলসায় হিট। তরুণ মজুমদার 'দাদার কীর্তি' ছবিতে চুমকির নতুন নাম দিলেন দেবশ্রী । ছোট্ট থেকেই বুম্বা-চুমকির বন্ধুত্ব। ছোটবেলায় সবার সামনেই দু'জনে বর বউ খেলতেন। বালিকা দেবশ্রীর দাবি ছিল-কেন তিনিই সবসময় বউ সাজবেন! বুম্বা কেন বউ সাজবে না?
পয়লা মে, ১৯৯৪। রবিবার গোধূলি লগ্নে শরৎ বসু রোডের ১৮৩ নম্বর বাড়িতে শাঁখ উলুধ্বনি বেজে উঠল। প্রতিবেশীরা অবাক হলেন । যদিও আজ বিয়ের তারিখ কিন্তু এ বাড়িতে আজ কার বিয়ে? এ বাড়িতে বিয়ে হতে পারে একমাত্র দেবশ্রী রায়ের। কিন্তু বাংলা ছবির এত বড় নায়িকার বিয়ে কি এমন ছোট করে হয় নাকি? ছোট বাড়িটায় বড় জোর জনা বিশেক লোক। এই পরিবারের চার মেয়ে, দুই ছেলে, জামাইরা, তাঁদের ছেলেমেয়েরা যখন একত্র হয় এমন লোক তো দেখাই যায়! এত কেন রহস্য বিয়ের মধ্যে? এত চটজলদি বিয়ে যে দেবশ্রী ঘনিষ্ঠ লোকদেরও বলা যাইনি! দেশপ্রিয় পার্কের প্রতিবেশীরাও ছিলেন ধন্দে।
আসলে দেবশ্রীর প্রসেনজিতের বিয়ের গুঞ্জন চলছিল ১৯৮৯ থেকে। বুম্বা মা রত্না চট্টোপাধ্যায়ের কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন 'মা আমি চুমকিকে বিয়ে করতে চাই'! সহাস্যে অনুমতি দেন রত্না। বিশ্বজিতের কাছেও কিন্তু দেবশ্রী খুব পছন্দের ছিলেন। সেই থেকেই গুজব রটতে থাকে প্রসেনজিৎ-দেবশ্রীর বিয়ের। কখনও বা রটে ওঁদের রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে। একবার তো কলকাতার একটি দৈনিকে এই মর্মে খবরও বেরিয়েছিল। আরতি রায় আর রত্না চট্টোপাধ্যায় দুজনেই ফোন করেছিলেন সেই সংবাদপত্রের অফিসে। দেবশ্রী বলেছিলেন 'সব মিথ্যে কথা ,কেন এসব রটানো হচ্ছে?' তবে পাল্টা প্রশ্ন ছিল 'এটা না হয়রটনা! কিন্তু সত্যিকারের ঘটনা কবে ঘটছে?'
৩০ এপ্রিল ১৯৯৪ হয়েছিল প্রসেনজিতের আইবুড়ো ভাতের অনুষ্ঠান। পাশে ছিলেন দেবশ্রী। একই সঙ্গে ভাত খেলেন দু'জন। ১লা মে খুব ছোট করে বিয়ে সেরে ফেলেন তাঁরা। এ খবর ইন্ডাস্ট্রির লোকেরাই জানত না। তাঁরা প্রেম করছেন সবাই জানত! কিন্তু কেন এই বিয়ে হয়েছিল এত সাধারণভাবে ?
মাত্র ৪৮ ঘন্টার প্রস্তুতিতে বিয়ে হয়ে গেল টালিগঞ্জের দুই চর্চিত তারকার। পয়লা মে সন্ধেতে বধূ বেশে লাল বেনারসি আর লাল ওড়নায় সেজেছিলেন দেবশ্রী। প্রসেনজিৎ তসরের ধুতি-পাঞ্জাবি। হিন্দু মতে আনুষ্ঠানিক বিয়ে। মালা বদল, সিঁদুর দান, যজ্ঞের আগুনে সাত পাক, আংটি পরানো। এতদিনের প্রেম পূর্ণতা পেয়েছিল বিয়েতে। প্রসেনজিতের পরানো লাল সিঁদুরে ভরল দেবশ্রীর সিঁথি। লজ্জাবস্ত্র মাথায় চুমকির লাজুক মুখ। নাকে সিঁদুর পড়লে নাকি কনে সুখী হয়! কিন্তু দেবশ্রী সুখী হলেন কই? বাসরে বর বউ পরস্পরকে মিষ্টি-জল খাইয়ে দিলেন। পরদিন শরৎ বসু রোডের বাপের বাড়ি থেকে সাদা গাড়ি চড়ে পতিগৃহে যাত্রা করলেন দেবশ্রী। তাঁর দুচোখ তখন অশ্রুসজল।
ঠিক এই বিয়ের পরপর ঋতুপর্ণ ঘোষের 'উনিশে এপ্রিল' একসঙ্গে করলেন দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ। সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার পেয়ে সাড়া ফেলে দিলেন দেবশ্রী। সবাই বলেছিল, প্রসেনজিতের সঙ্গে বিয়ে করে নাকি দেবশ্রীর ভাগ্য খুলে গেছে ! বছর ঘুরে গেল পুরস্কার আর ঋতুপর্ণর ছবির সাফল্যের । পরের বছর ১৯৯৫ পয়লা মে সকালে বিশ্বমাতা মাদার টেরেসার কাছে গিয়ে তাঁর আশীর্বাদ নিয়েছিলেন দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ। সন্ধেতে ছিল তারকা খচিত ডিনার পার্টি। বিবাহ বার্ষিকীতে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু থেকে পুরো টলিউড চলে এসেছিল এই রাতপার্টিতে।
'সাথী হবে এই জীবনে রাখব তোমায় বুকে
চলার পথে আমার সাথে থাকবে মনের সুখে ...
চলতে তো রাজি, থাকতে তো রাজি
তার আগে কিছু বলে সহজ হতে চাই ... '
কিন্তু পরিণয়ে সহজ হওয়া আর হল না। আদালত চত্বরে দু'জনার দুটি পথ আলাদা হল। প্রসেনজিৎ প্রকাশ্যে বলেছিলেন 'আমি সুস্থ জীবন চেয়েছিলাম। সেটা ও দেয়নি। তাই ওর জন্য অপেক্ষা করার পর, আরেক জনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। যে আমাকে আবার স্বপ্ন দেখার সুযোগ দিয়েছে। সবাইকে ছেড়েও চুমকির থেকে পেয়েছি অপমান। আমাদের সন্তান চাওয়া নিয়েও মনোমালিন্য ছিল।'
দেবশ্রীর পাল্টা জবাব আমি যখন 'উনিশে এপ্রিল' ছবির শ্যুটিং করছি তখন থেকে বুম্বার সঙ্গে আমার সম্পর্কে চিড় ধরে। শ্যুটিং থেকে ফিরে এসে দেখি বুম্বা আমার আগে চলে এসেছে। আমাকে দেখেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলল 'এই তোমার আসবার সময় হল! তুমি ভয়ংকর অ্যাম্বিশাস! তোমার দ্বারা সংসার হবে না।আমার মাথা গরম ছিল শুরু হয়ে গেল ঝগড়া।'
![]()
ছায়াছবির রিলেই শুধু রয়ে গেল তাঁদের ভালবাসা। প্রসেনজিৎ তিন বার সাত পাকে ঘুরলেও, দেবশ্রী যেন বেছে নিতে চেয়েছিলেন নির্বাসন। চেয়েছিলেন প্রসেনজিতের প্রাক্তন প্রথমা স্ত্রী পরিচয়ের থেকে মুক্তি!
কিন্তু আজ পয়লা মে-তে দু'জনের কি একবারও মনে পড়ে না ১৯৯৪ সালের গোধূলি লগ্নের কথা?
'বুক ভরা মোর কান্না দিয়ে দিলাম চিঠি লিখে
যেথায় থাকো, থেকো যেন, সারাজীবন সুখে ... '