এই প্রতীকী পাঠ সম্পূর্ণ আমাদেরই তৈরি। গম্ভীর নিজে কখনও তাঁর ভাবমূর্তি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি। তিনি স্বভাবে ‘নরম’ হতে চান না, কথাকে ঘুরিয়ে বলাটাও অপছন্দের।

গৌতম গম্ভীর
শেষ আপডেট: 14 December 2025 13:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘সকল লোকের মাঝে ব'সে/ আমার নিজের মুদ্রাদোষে/ আমি একা হতেছি আলাদা?’
জীবনানন্দের কথাগুলো হয়তো কোচ গৌতম গম্ভীরের কোচিং-জীবনেরও ধ্রুবপদ! এমনিতেই তাবড় ম্যানেজারদের ছোট ছোট অভ্যাস, মুদ্রাদোষ কৌশল ছাপিয়ে কৌতূহলের জন্ম দেয়। ফুটবলে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের চুইং গাম বা পেপ গুয়ার্দিওলার বারবার টি-শার্টের হাতা ধরে টান—এ সবই সময়ের আস্তরণ সরিয়ে ‘প্রতীকে’ পরিণত হয়েছে। কিন্তু গৌতম গম্ভীরের ক্ষেত্রে বিষয়টা অনেকটাই আলাদা।
বড় কারণ: ফুটবল আর ক্রিকেটের মঞ্চ আলাদা। বাইশ গজের যুদ্ধে এই ধরনের ‘কোচিং কুইর্ক’ বিরল, খুব একটা চোখে পড়ে না। রাহুল দ্রাবিড়ের নোটবুক, আশিস নেহরার বাউন্ডারি লাইনে দৌড়ে দৌড়ে নির্দেশ দেওয়া—ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু এদের কোনওটাই সেভাবে আলোচনার কেন্দ্রে আসেনি।
ব্যতিক্রম গম্ভীর (Gautam Gambhir)। ভারতীয় দলের হেডকোচের ছোটখাটো আচরণ, শরীরী অঙ্গিভঙ্গি প্রায় প্রতিদিনই আলাদা নজরে পড়া হয়। এবার সেই তালিকায় নতুন করে ঢুকে পড়েছে—একখানা নিরীহ ক্রিকেট বল! আর নজরে নিজের মুদ্রাদোষে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার প্রতীকী ব্যঞ্জনা!
কৌতূহলীদের পর্যবেক্ষণ: ম্যাচ চলাকালীন ডাগআউটে, টেবিলের উপর, হাতের পাশে, পকেটে—কোথাও না কোথাও গম্ভীর ফ্রেমে থাকলেই ওই বলটা দেখা যায়। একদিন-দু’দিন নয়। ফরম্যাট বদলালে, ভেন্যু পাল্টালে, ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ঘুরলেও বলটা ধ্রুবক। জায়গা-ছাড়া হয় না। প্রথমে আড়ালে থাকে। কিন্তু একবার চোখে পড়লে, আর নড়ে না। যে কারণে প্রশ্ন উঠেছে—এ কি নিছকই অভ্যাস? নাকি এর অন্তরালেও বিশেষ ‘মানে’ খুঁজে নেওয়া যেতে পারে?
সম্ভবত, প্রথমটাই সত্যি। কোচদের অনেকেই কোনও না কোনও ‘অ্যাঙ্কর’ ধরে রাখেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, টানটান পরিস্থিতি, মুহূর্তে বদলে যাওয়া ম্যাচ—ঊর্ধ্বমুখী টেনশনের মধ্যে হাতে রাখা পরিচিত জিনিস অনেককে মানসিকভাবে স্থির থাকতে সাহায্য করে। গম্ভীরের ক্ষেত্রে সেটাই হয়তো ধবধবে সাদা ক্রিকেট বল। একেবারে সাদামাটা, ব্যবহৃত, বহুল পরিচিত।
কিন্তু সমস্যা এটাই, যে গম্ভীরকে কখনওই ‘সাধারণভাবে’ থাকতে দেওয়া হয় না। ভারতীয় দলের ক্রিকেট কোচের প্রতিটি নড়াচড়া বিশ্লেষণের টেবিলে ওঠে। তিনি কিছু বললে অর্থ খোঁজা হয়, না বললেও প্রশ্ন। সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ওয়ানডে সিরিজ জয়ের পর তিনি প্রকাশ্যে বিরাট কোহলি (Virat Kohli) বা রোহিত শর্মার (Rohit Sharma) নাম আলাদা করে উল্লেখ না করায় সেটাই খবর হয়ে গিয়েছিল। রবিন উথাপ্পার মন্তব্য, বিষয়টা ‘অদ্ভুত’। সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর–কোহলি সম্পর্ক নিয়ে পুরনো গল্প প্রত্যাশিতভাবেই চলে আসে সামনে! ছোট্ট ভিডিও ক্লিপ—কোহলি শতরান করার পর গম্ভীরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া—সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়ায় অবিরাম।
অথচ একই ম্যাচে গম্ভীরের হাততালি বা রোহিতের সঙ্গে হালকা হাসি—এসব দৃশ্য প্রায় উপেক্ষিতই রয়ে যায়। প্রেক্ষাপট বরাবরের মতোই হেরে যায় ‘ন্যারেটিভ’-এর কাছে।
অর্শদীপ সিংয়ের (Arshdeep Singh) ওভারে একাধিক নো-বলের পর গম্ভীরের বিরক্ত প্রতিক্রিয়া, পরে হ্যান্ডশেকে একবার দৃষ্টিবিনিময়—তারও আলাদা করে ব্যবচ্ছেদ চলেছে। কেউ বলেছে ‘কড়া শাসন’, কেউ ‘প্রকাশ্য অস্বস্তি’। ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, জানার উপায় নেই। কিন্তু গম্ভীরের বয়ান না শুনেও ব্যাখ্যা থেমে থাকেনি। ঠিক এই পরিবেশেই গম্ভীর কাজ করেন। যেখানে নিরপেক্ষ থাকা প্রায় অসম্ভব, নীরবতাও সন্দেহজনক!
সেই প্রেক্ষাপটে ক্রিকেট বল ‘প্রতীকে’র মতো। শক্ত, নির্দয়, প্রত্যাশার তোয়াক্কা না করা! একটা সাদামাটা বলের বৈশিষ্ট্যগুলো গম্ভীরের ভাবমূর্তির সঙ্গেও অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। তিনি নিজে যেমন আপসহীন, তেমনই রুক্ষ এই ক্রিকেট বল। ঠিকঠাক কাজে লাগালে পুরস্কার, ভুল করলে শাস্তি।
তবে এটাও সত্যি—এই প্রতীকী পাঠ সম্পূর্ণ আমাদেরই তৈরি। গম্ভীর নিজে কখনও তাঁর ভাবমূর্তি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি। তিনি স্বভাবে ‘নরম’ হতে চান না, কথাকে ঘুরিয়ে বলাটাও অপছন্দের। ফলে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নীরবতা আরও বেশি গুরুত্ব পেয়ে যায়। যাবতীয় কোলাহলের মধ্যে গম্ভীর চুপচাপ হাতে ধরে রাখেন ঠান্ডা, সাদা বল। হয়তো শুধুই অভ্যাস। কিংবা হয়তো সেটাই তাঁর স্নায়ুর ভরকেন্দ্র। অযুত শব্দের ভিড়ে তিনি এখনও সেটাকে নামিয়ে রাখেননি।