গম্ভীরের কথা বা গম্ভীরের মতো কথা ময়দানের ড্রেসিং রুমে নতুন নয়। এর পোশাকি নাম ‘পেপ টক’। মাঠে যেমন ট্যাকটিক্স, ফিটনেস ও ফর্মের গুরুত্ব, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মানসিক প্রস্তুতি।

ছবি: প্রতীকী
শেষ আপডেট: 5 July 2025 16:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘ফুটবলের মাঠ তোমার মাতৃভূমি, ফুটবলটা তোমার মায়ের আঁচল, যা দিয়ে ফুটবল-মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিতে হবে তোমাদেরই!’
প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ভোকাল টনিক, যা এক সময় ফুটবলারদের রক্তে তুফান তুলত। এখন যুগ বদলেছে। এই জ্বালাময়ী ভাষণ খেলোয়াড়দের কতটা উদ্বুদ্ধ করে? আদৌ করে কি? পক্ষে-বিপক্ষে অনেকে তর্ক-প্রতি তর্ক উঠেছে।
আজকাল সবই প্রযুক্তি-নির্ভর। ম্যানেজারদের ভাষণও সেই পথ ধরেছে। অনেকেই ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’কে কাজে লাগান। তাঁরা জানেন, একজন খেলোয়াড়কে শুধুই কৌশলে নয়, বিশ্বাসেও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। এই কারণে বহু দল আকছার মনোবিজ্ঞানীদের নিয়োগ করে।
এই দর্শন মেনেই লুই এনরিকে স্পেন দলে ‘টিম-বন্ডিং’ সেশন চালু করেছিলেন — যেখানে খেলোয়াড়রা একে অপরের মুখোমুখি বসে প্রশংসা করতেন। গোয়ার্দিওলা খেলোয়াড়দের আজও পুরোনো ভিডিও দেখান, যাতে তারা নিজেদের সেরা ফর্ম মনে করে মাঠে সেটাই তুলে ধরতে পারে।
কোচ হিসেবে গৌতম গম্ভীর কেমন, তাই নিয়ে নান মুনির নানা মত। যদিও দীর্ঘদিন দলের বাইরে থেকে, জসপ্রীত বুমরাহর অনুপস্থিতিতে যেভাবে সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন পেসার আকাশ দীপ, তার জন্য গম্ভীরকে ঢেলে কদর জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘নেটে অনবরত নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন গম্ভীর। দলে আসার পর থেকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছেন। যখন খেলোয়াড় হিসেবে কেউ বুঝতে পারে কোচের সমর্থন আছে, তিনি আপদে-বিপদে পাশে দাঁড়াবেন, তা আপনা থেকেই শক্তি জোগায়। ময়দানে এই আত্মবিশ্বাসই ফুটে উঠেছে।’
সমর্থন জুগিয়ে কী বলেছেন গম্ভীর? আকাশের কথায়, ‘উনি সবসময় ইতিবাচক কথা বলেন। যেমন, ‘তোমার ভেতরে কোন স্কিল আর প্রতিভা আছে, সেটা তুমি নিজেই জানো না!’ এই মোটিভেশন একজন ক্রিকেটারের জন্য জরুরি। অনেক সময় আমরা নিজেদের চিনতে পারি না। কিন্তু যখন অভিজ্ঞ কেউ আমাদের নিয়ে কিছু বলে, তখন আত্মবিশ্বাস আপনা আপনি বেড়ে যায়!’
গম্ভীরের কথা বা গম্ভীরের মতো কথা ময়দানের ড্রেসিং রুমে নতুন নয়। এর পোশাকি নাম ‘পেপ টক’। মাঠে যেমন ট্যাকটিক্স, ফিটনেস ও ফর্মের গুরুত্ব, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মানসিক প্রস্তুতি। যার অন্যতম হাতিয়ার ‘পেপ টক’—ছোট করে বললে, ম্যাচ শুরুর আগে বা বিরতির সময় ম্যানেজারদের জ্বালাময়ী ভাষণ। একসময় যা ছিল শুধুই উদ্দীপনার খোরাক, এখন তা হয়ে উঠেছে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণের চাবিকাঠি।
নীচে রইল এমনই কিছু স্মরণীয় পেপ টক:
১. জার্মানি বনাম ব্রাজিল (২০১৪ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল)
ম্যানেজার: জোয়াকিম লো। খেলা: ব্রাজিলের মাটিতে, মঞ্চ: বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। রীতিমতো চাপে ছিল জার্মানি। অথচ মাঠে নামার আগে ছবিটা ঘুরিয়ে দেখান লো। বলেন, ‘ওরা চাপে আছে। ভয় পেয়েছে। মাঠে নামো, ওদের ভুলগুলো ধরো, আর বিশ্বাস করো, তোমরাই জিতবে!’ ফলাফল: জার্মানি ৭-১ গোলে ব্রাজিলকে হারায়। ইতিহাসের অন্যতম চমকপ্রদ জয়। বিশ্বকাপের স্মরণীয় অঘটন।
২. লিভারপুল বনাম বার্সেলোনা (২০১৯, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনাল)
ম্যানেজার: য়ুর্গেন ক্লপ। প্রথম লেগ ০-৩ ব্যবধানে হেরেছিল লিভারপুল। দ্বিতীয় লেগ খেলতে অ্যানফিল্ডে নামার আগে ক্লপ সদম্ভে ঘোষণা করেন, ‘স্কোরবোর্ড ভুলে যাও। মাঠে নামো। ওদের চাপে ফেল। মনে রেখো, আমরা লিভারপুল। আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করি।’ ফলাফল: লিভারপুল ৪-০ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে।
৩. আর্জেন্তিনা বনাম ফ্রান্স (২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনাল)
ম্যানেজার: লিওনেল স্কালোনি। প্রথমার্ধে দল ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে, কিন্তু স্কালোনি রাশ আলগা করেননি। সতর্কতার সুরে বলে দেন, ‘খেলা এখনো শেষ হয়নি। আমাদের শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়ে যেতে হবে। এখন আত্মতুষ্টি মানেই বিপদ!’ কোচের ভবিষ্যদ্বাণী কতখানি অব্যর্থ ছিল, তা দ্বিতীয়ার্ধে বোঝা যায়। কামব্যাক করে ফ্রান্স। জ্বলে ওঠেন এমবাপে। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, কিন্তু শেষমেশ আর্জেন্তিনাই চ্যাম্পিয়ন হয়।
৪. মোরিনহো ও দিদিয়ের দ্রোগবা (চেলসি, ২০০৪-০৫)
প্রিমিয়ার লিগে একটি ম্যাচে এক ম্যাচে দ্রোগবা খারাপ খেলেন। ম্যানেজার জোসে মোরিনহো তাঁকে ডেকে চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন, ‘তুমি সেই খেলোয়াড় নও, যাকে আমি কিনেছিলাম। কিন্তু তুমি হতে পারো। আমি তোমায় বিশ্বাস করি!’ কোচের এই ছোট্ট কথাই বারুদ হয়ে ফেটে পড়ে। দ্রোগবা পরের ম্যাচগুলোতে দুর্দান্ত পারফর্ম করেন। গোলের পাশপাশি অ্যাসিস্টও বাড়ান। যার সুবাদে চেলসি লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়।
৫. পেপ গোয়ার্দিওলা ও ম্যানচেস্টার সিটি (২০২২–২৩, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল)
বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও ইউরোপে বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল ম্যাঞ্চেস্টার সিটি। তারকা ফুটবলার, স্বনামধন্য কোচ—কেউ ছবিটা বদলাতে পারেননি। এই সময় মাসিহা হয়ে আসেন পেপ গোয়ার্দিওলা। অনেকবার অল্পের জন্য সুযোগ ফস্কালেও অবশেষে ফাইনালে ওঠে সিটিজেনরা। নামার আগে পেপ বলেন, ‘আজ আমরা ইতিহাসের অংশ হতে চলেছি। যদি একে অন্যের জন্য খেলি, তাহলে কেউ আমাদের থামাতে পারবে না। ৯০ মিনিট… আর শুধু ৯০ মিনিট!’ এই শব্দব্যয় কাজে দেয়। সিটি ১–০ গোলে ইন্টারকে হারিয়ে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতে, পায় ট্রেবলের শিরোপাও।
৬. জিনেদিন জিদান ও রিয়াল মাদ্রিদ (চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল ২০১৭)
‘তোমরা কেউ সাধারণ খেলোয়াড় নও। তোমাদের মধ্যে রয়েছে ইতিহাস গড়ার ক্ষমতা। আজ আমরা ইতিহাস লিখব!’ জুভেন্তাসের বিরুদ্ধে নামার আগে এই ভাষাতেই খেলোয়াড়দের চাগাড় দেন কোচ জিনেদিন জিদান। ফল: রিয়াল ৪–১ গোলে জিতে ফের একবার ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন!
৭. স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ও ‘হেয়ারড্রায়ার টেকনিক’
‘হেয়ারড্রায়ার ট্রিটমেন্ট’ মানে এমন জোরে চিৎকার, যাতে সামনে দাঁড়ানো খেলোয়াড়ের চুল উড়ে যায়! আক্ষরিক অর্থে নয়, রূপকার্থ! এজকবার নয়, বহুবার ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের খেলোয়াড়রা স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের এমন পেপ টক শুনে মোহিত হয়েছেন। তারপর ময়দানে নেমে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন! দৃষ্টান্ত: ১৯৯৯ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল (ম্যান ইউ বনাম বায়ার্ন)। প্রথমার্ধে পিছিয়ে থেকেও শেষ ২ মিনিটে ২ গোল করে জয় নিশ্চিত করে ইউনাইটেড।