ভারতীয় ওয়ানডে দলে উইকেটকিপার নিয়ে আসলে কোনও সংখ্যাগত সংকট নেই। সমস্যা ভূমিকাগত। ‘কে সবচেয়ে প্রতিভাবান’—এই প্রশ্নে জটিলতা নেই। সমস্যা, এই মুহূর্তে দলের কোন ভূমিকাটা পূরণ করতে হবে, আর কে সেটা সবচেয়ে ভালভাবে করতে পারছে—সেই নিয়ে।

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 30 December 2025 12:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় ওয়ানডে দলে উইকেটকিপার নিয়ে আসলে কোনও সংখ্যাগত সংকট নেই। সমস্যা ভূমিকাগত। ‘কে সবচেয়ে প্রতিভাবান’—এই প্রশ্নে জটিলতা নেই। সমস্যা, এই মুহূর্তে দলের কোন ভূমিকাটা পূরণ করতে হবে, আর কে সেটা সবচেয়ে ভালভাবে করতে পারছে—সেই নিয়ে।
নিউজিল্যান্ডের (New Zealand) বিরুদ্ধে আসন্ন ওয়ানডে সিরিজের আগে তাই বিতর্কটা ঠিকভাবে ফ্রেম করা দরকার। এই জায়গাটা ওপেনারের ব্যাকআপ নয়। এটা মিডল অর্ডারে নামা এমন এক উইকেটকিপার-ব্যাটারের জায়গা, যে ম্যাচের গতিপথ বদলাতে পারে, বাঁ-হাতি বিকল্প এনে দিতে জানে, আর পরিস্থিতি বুঝে টেম্পো পাল্টাতে দক্ষ। এই ফিল্টার বসালেই ত্রিমুখী লড়াই অনেক পরিষ্কার হয়ে যায়।
ধ্রুব জুরেল (Dhruv Jurel): আগুনে ফর্ম, কিন্তু এটুকুই কি যথেষ্ট?
জুরেলের সাম্প্রতিক ছন্দ উপেক্ষা করার মতো নয়। বিজয় হাজারে ট্রফিতে (Vijay Hazare Trophy) উত্তরপ্রদেশের প্রথম তিন ম্যাচে কার্যত একা হাতে দলকে টেনেছেন। ৩ ইনিংসে ৩০৭ রান—বলকে বড় দেখছেন, ইনিংস গড়ছেন, আবার প্রয়োজনে গিয়ারও বদলাচ্ছেন।
নির্বাচকদের চোখে এটা বড় প্লাস। কারণ এতে বোঝা যায়—ধ্রুব সময় নিয়ে চাপ সামলাতে পারেন, আবার শেষদিকে চালিয়ে খেলতেও পারদর্শী। কিন্তু ওয়ানডে দলে ঢোকার প্রশ্নে একটা বড় বাধা আছে। জুরেলের লিস্ট এ ক্রিকেটে ম্যাচ সংখ্যা এখনও বেশ কম, আর সবচেয়ে বড় কথা—ওয়ানডে সেটাপে তাঁর ‘রোল আইডেন্টিটি’ আপাতত পরিষ্কার নয়। তিনি কি ৫-৬ নম্বরে ফিনিশার? নাকি পরিস্থিতি সামলানো মিডল অর্ডার ব্যাট? উত্তরটা পরীক্ষাধীন।
এই মুহূর্তে তাই জুরেল আদর্শ বিকল্প হিসেবে—এ-ট্যুর (A Tour), ট্রাভেলিং রিজার্ভ বা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে থাকবেন। নিউজিল্যান্ড সিরিজে তাঁকে এক নম্বর পছন্দ বানানোটা হয়তো তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে।
ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant): সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা
প্রতিভার বিচারে পন্থের সঙ্গে কারও তুলনা চলে না। কেএল রাহুলের (KL Rahul) পর ভারতীয় ক্রিকেটে উইকেটকিপার-ব্যাটার হিসেবে সবচেয়ে বড় ‘আপসাইড’ এখনও তাঁরই। কিন্তু সমস্যা এই, যে নির্বাচন হয় প্রতিভায় নয়, প্রাসঙ্গিকতায়।
ওয়ানডে-তে পন্থের পরিসংখ্যান ভালো—৩১ ম্যাচে ৮৭১ রান, গড় ৩৩.৫০। মুশকিল অন্য জায়গায়। তাঁর ওয়ানডে ছন্দটা সাম্প্রতিক কালে সেভাবে জমেনি। ঘরোয়া ক্রিকেটেও ধারাবাহিকতার বার্তা নেই। বিজয় হাজারে-তে গুজরাতের (Gujarat) বিরুদ্ধে ৭০ রানের ইনিংস চোখে পড়ার মতো। কিন্তু বাকি ম্যাচগুলো নীরব। এটা ব্যর্থতা নয়, তবে এই মুহূর্তে যখন সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ একের পর এক ঘরোয়া টুর্নামেন্টে ম্যাচ-ডিফাইনিং পারফরম্যান্স দিচ্ছে, তখন নমুনা যথেষ্ট জোরালো নয়।
সংক্ষেপে বললে—পন্থ ভবিষ্যতের জন্য নয়, এখনও বর্তমানের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছেন। কিন্তু আসন্ন সিরিজে এই নির্দিষ্ট ভূমিকা দক্ষতার সঙ্গে পালন করছেন বলে অন্য দু’জন তাঁর চাইতে এগিয়ে।
ঈশান কিষাণ (Ishan Kishan): সবদিক দিয়ে নিখুঁত ফিট
এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে সবচেয়ে এগিয়ে আপাতত ঈশান কিষাণ। ওয়ানডেতে তাঁর রেকর্ড আগে থেকেই ব্যাঙ্কড—২৭ ম্যাচ, ৯৩৩ রান, গড় ৪২.৪০। এর মধ্যে রয়েছে একটি ডাবল সেঞ্চুরিও।
কিন্তু সংখ্যার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তাঁর প্রোফাইল। তিনি বাঁ-হাতি। উইকেটকিপার। এমন ব্যাটার, যিনি ৫ বা ৬ নম্বরে নেমে ৪০ বলের ওয়ার্ম-আপ ছাড়াই ম্যাচের গতি বদলাতে পারেন। সাম্প্রতিক ফর্মও প্রশ্নাতীত। চলতি বিজয় হাজারে-তে কর্ণাটকের (Karnataka) বিরুদ্ধে ৩৯ বলে ১২৫—কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তিনি ব্যাটিং করছিলেন ছয় নম্বরে! ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট নমনীয়তা খোঁজে।
এর সঙ্গে যদি সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফি (Syed Mushtaq Ali Trophy) যোগ করা হয়, যুক্তিটা আরও পোক্ত হবে। কারণ সেখানে কিষাণই টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক—যা বুঝিয়ে দিচ্ছে, এটা এক-দুই ম্যাচের ঝলক নয়, বরং নিশ্ছিদ্র, অটুট ধারাবাহিকতা।
সব মিলিয়ে সমস্যার নাম ‘প্রতিযোগিতা’ নয়, সমাধানের নাম ‘ভূমিকা’। ধ্রুব জুরেল ভবিষ্যতের সম্পদ, এখনই চোখে রাখার মতো নাম। ঋষভ পন্থ সবচেয়ে বড় প্রতিভা, কিন্তু তাঁকে ফেরানোর আগে স্পষ্ট রানওয়ে দরকার। আর ঈশান এই মুহূর্তে আধুনিক ওয়ানডে স্কোয়াড প্লেয়ারের সংজ্ঞাটাই পূরণ করছেন—মাল্টি-পজিশন, ম্যাচ-আপ রেডি আর সর্বার্থে বিস্ফোরক!
অতএব নিউজিল্যান্ড সিরিজের প্রশ্নটা যদি হয়—‘এখন কে সবচেয়ে উপযোগী?’ উত্তর আপাতত একটাই: ঈশান কিষাণ।