কেরিয়ারের উন্মেষপর্বে ‘বেবি এবি’ ট্যাগ তাঁর জন্য ‘দোধারী তলোয়ার’। এই তকমা একদিকে তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে, অন্যদিকে তা ঘনিয়ে তুলেছে চাপ।

ডেভিলিয়ার্স ও ব্রেভিস
শেষ আপডেট: 17 August 2025 15:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তুলনার ভার কী প্রবল—সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছেন ডেওয়াল্ড ব্রেভিস। আগ্রাসী ব্যাটিং আর স্কিলের ঝলকে নিজের দেশের প্রাক্তন ব্যাটসম্যান এবি ডেভিলিয়ার্সের প্রভাব স্পষ্ট। তাই দেখে ক্রিকেট দুনিয়া ইতিমধ্যে ‘বেবি এবি’ নামে ডাকতে শুরু করেছে। এই স্বীকৃতির মধ্যে মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে একরাশ প্রত্যাশা আর পাহাড়প্রমাণ চাপ।
কিন্তু সমালোচক আর বিশ্লেষকদের আরেকটা অংশের প্রশ্ন: দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি ডেভিলিয়ার্সের ছায়ায় দাপট দেখানো এই তরুণ ব্যাটার আসলেই তাঁর উত্তরসূরি? নাকি হাল্কা প্রভাব বাদ দিলে বাকিটুকু আলাদা? স্বতন্ত্র? তুলনা আর প্রশ্নের টানাপোড়েনের মধ্যে গড়ে উঠছে ব্রেভিসের কেরিয়ার। যা বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদের তাকাতে হবে দুই প্রজন্মের দুই ব্যাটারের মিল–অমিল, সাফল্য–ব্যর্থতা ও সম্ভাবনার দিকে।
ব্রেভিসের উত্থান ২০২২ সালের আন্ডার–১৯ বিশ্বকাপে। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ৬ ম্যাচে করেছিলেন ৫০৭ রান। গড় ৮৪.৫, স্ট্রাইক রেট নব্বইয়ের উপর। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক আসরে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড তখন তাঁর ঝুলিতে। সেঞ্চুরি করেছিলেন ইংল্যান্ড ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এখানেই সাড়া পড়ে—এ কোন তরুণ, যে কেবল অকাতরে রানই করছে না, খেলছে পাক্কা ডিভিলিয়ার্সের ভঙ্গিতে!
আইপিএল মঞ্চে গুঞ্জনের মাত্রা চড়ে। ২০২২ সালে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স তাঁকে দলে নেয়। নবাগত হয়েও শারজাতে পাঞ্জাব কিংসের বিপক্ষে ৪৯ বলে ৪৯ রানের ইনিংস খেলে সকলের নজর কাড়েন। কিন্তু আসল আলোচনা শুরু হয় পরের বছর, যখন গুজরাত টাইটান্সের বিরুদ্ধে খেলেন মাত্র ৪২ বলে ১১২ রানের ঝোড়ো ইনিংস! হাঁকান ১৩ খানা ছক্কা, ৯টি চার। স্টাইল দেখে মনে হচ্ছিল—এ যেন সাক্ষাৎ ডিভিলিয়ার্স! হেলিকপ্টার, স্লগ–সুইপ, ব্যাকফুটে ছক্কা—প্রাক্তন কিংবদন্তির আস্তিনের সব শটই তাঁর ডিকশনারিতে মজুত!
যদিও কট্টর ডেভিলিয়ার্স-অনুরাগীদের চোখে মিলের পাশপাশি অমিলও বেশ প্রকট। এবিডি ক্রিকেটের ‘মিস্টার ৩৬০’। ২০০৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খেলেছেন ১১৪ টেস্ট, ২২৮ ওয়ানডে ও ৭৮ টি–টোয়েন্টি। ২০,০১৪ আন্তর্জাতিক রান, ৪৭টি সেঞ্চুরি। শুধু সংখ্যায় নয়, মাঠে তাঁর উপস্থিতি মানেই বাড়তি পাওনা। ২০১৫ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে মাত্র ৬৬ বলে ১৬২*, ২০১০ মিরপুর টেস্টে ২৭৮*, কিংবা ২০১৫ সালে ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্রুততম সেঞ্চুরি (৩১ বলে)—এই সমস্ত ইনিংস তাঁকে কিংবদন্তির পর্যায়ে তুলে দেয়।
ব্রেভিস এখনও সেখানে পৌঁছননি। তাঁর ব্যাটিং মূলত ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটকেন্দ্রিক। আইপিএলে নেমেছেন ৮ ম্যাচে। করেছেন ১৬১ রান। গড় কুড়ির নিচে। এসএ২০–তে (২০২৩) দেখিয়েছেন ঝলক, প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসের হয়ে এক ম্যাচে ৭০ রানের দুরন্ত ইনিংস! কিন্তু ধারাবাহিকতা এখনও অধরা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়মিত সুযোগ পাননি। টি২০-তে অভিষেক হয়েছে ২০২২ সালে, রানও হাতেগোনা।
ডেভিলিয়ার্সের সঙ্গে তাঁর অমিল ঠিক এখানেই। এবি ছিলেন তিন ফরম্যাটের ব্যাটার। টেস্টে গড় ৫০.৬৬, ওয়ানডেতে ৫৩.৫। অর্থাৎ, কেবল আক্রমণ নয়, তিনি সর্বার্থে ‘ব্যাটিং শিল্পী’, যিনি পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলা পাল্টে নিতে পারতেন। চাপের মধ্যে স্থির থাকা, দলের ভরসা হয়ে ওঠা—এসব জায়গায় ব্রেভিসের পরীক্ষা এখনও বাকি।
তবে মিল অস্বীকারেরও উপায় নেই। ব্রেভিসের ব্যাটিং স্টাইল এতটাই বাধাহীন, এতটাই সৃষ্টিশীল, যে ডেভিলিয়ার্সের সঙ্গে না মেলানো অসম্ভব। ২০২২-তে দেশীয় টি২০ টুর্নামেন্টে নর্থ ওয়েস্ট ড্রাগনসের বিপক্ষে ৫৭ বলে ১৬২ রান করেছিলেন। ওই একটি ইনিংসই বুঝিয়ে দেয়, তাঁর ব্যাটিং কেবল মনোরঞ্জনের শো নয়, ব্রেভিস ম্যাচ-জেতানো নায়ক হয়ে ওঠার ক্ষমতাও রাখেন!
কেরিয়ারের উন্মেষপর্বে ‘বেবি এবি’ ট্যাগ তাঁর জন্য ‘দোধারী তলোয়ার’। এই তকমা একদিকে তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে, অন্যদিকে তা ঘনিয়ে তুলেছে চাপ। ইতিহাস বলছে, যারা আগের প্রজন্মের সঙ্গে চিরকালীন তুলনায় আটকে থাকে, তাদের আলাদা পরিচয় তৈরি কঠিন। শচীন তেন্ডুলকর শুরুতে গাভাস্কারের উত্তরসূরি হিসেবে ময়দানে এসেছিলেন। কিন্তু শেষেতক ‘দ্বিতীয় গাভাসকরে’র বদলে নিজের নামেই পরিচিত হন। বিরাটের ক্ষেত্রেও তাই। অন্যদিকে আম্বাতি রায়াডু কিংবা পৃথ্বী শ—চাপ সামলাতে না পেরে হারিয়ে গিয়েছেন।
তাই ব্রেভিসকে দ্রুত জবাব খুঁজে নিতে হবে: তিনি কি ‘ডেভিলিয়ার্স ২.০’ হতে চান? নাকি পরিচিত হবেন ‘ব্রেভিস ১.০’ হিসেবে? এবিডি-র মিনিয়েচার সংস্করণ হয়ে ওঠায় চর্চার আলো আছে, প্রতিভার দ্যুতি তুলনায় অনেক কম!