সম বেতনের সিদ্ধান্ত শুধু প্রতীকী নয়, ছিল কৌশলগতও। যার সুবাদে নারী ক্রিকেটারদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ে, তাঁরা পেশাদারভাবে খেলায় মন দিতে পারেন।
.jpeg.webp)
বিজয়িনী টিম ইন্ডিয়া
শেষ আপডেট: 3 November 2025 11:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নবি মুম্বইয়ের ডি ওয়াই পাটিল স্টেডিয়ামের আলো ঝলমলে রাতে হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur) যখন শেষ ক্যাচটা ধরলেন, তখন শুধু বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস লেখা হল না, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (BCCI) এক দূরদর্শী সিদ্ধান্তও একই সঙ্গে সত্যি প্রমাণিত হল!
তিন বছর আগে, অক্টোবর ২০২২-এ, এক সাহসী পদক্ষেপ—পুরুষ ও মহিলা ক্রিকেটারদের মধ্যে সম বেতন (Equal Pay) চালুর পথে হাঁটে বিসিসিআই। অনেকের চোখেই, এটা ছিল কেবল আবেগের বশে নেওয়া সিদ্ধান্ত। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘মেয়েদের খেলা তো এখনও ততটা লাভজনক নয়, তাহলে কেন সমান পারিশ্রমিক?’ অনেক দেশে তো বরাবর, সেই সূচনালগ্ন থেকেই মহিলা খেলোয়াড়দের বলা হয়, আগে জনপ্রিয়তা আনো, তারপর পাবে সমান টাকা। ভারত দেখাল উল্টোটাও সম্ভব—প্রথমে সুযোগ দাও, তাতেই আসবে সাফল্য। রবিবারের বিশ্বকাপ খেতাব সংশয়ীদের মুখ বুঝি চিরতরে বন্ধ করল!
বিসিসিআই সচিব জয় শাহ (Jay Shah) এক্স-হ্যান্ডেলে লেখেন, ‘ভারতীয় মহিলা দলের এই অভিযান অসাধারণ। তাদের দক্ষতা ও লড়াইয়ের মনোভাব যেমন অনুপ্রেরণা, তেমনই এই সাফল্যের পেছনে আছে বোর্ডের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতি—সম বেতন, বড় টুর্নামেন্টে সুযোগ, উন্নত কোচিং ব্যবস্থা এবং ডব্লিউপিএল (WPL)-এর মতো লিগে খেলোয়াড় তৈরির মঞ্চ।’
এটাই আসলে গোটা কাহিনির সার।
সম বেতনের সিদ্ধান্ত শুধু প্রতীকী নয়, ছিল কৌশলগতও। যার সুবাদে নারী ক্রিকেটারদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ে, তাঁরা পেশাদারভাবে খেলায় মন দিতে পারেন। অনেকেই, যাঁরা আগে চাকরি বা অন্য আয় নির্ভর ছিলেন, তাঁরা ক্রিকেটকেই একমাত্র ভরসা হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এর হাতেগরম ফল দেখা যায় ফিটনেস, মনোযোগ, ও ম্যাচ রিডিংয়ের দক্ষতায়!
তা ছাড়া, ভালো বেতনের প্রভাব পড়েছে পরিকাঠামোয়। এখন নারী দলের জন্য আলাদা ট্রেনার, ফিজিও, বিশ্লেষক, এমনকি বিশেষায়িত মনোবিদ রয়েছেন। আন্তর্জাতিক স্তরের কোচিং কাঠামো গড়ে উঠেছে। নারী খেলোয়াড়দের জন্য প্র্যাকটিসের সুবিধা ও ভ্রমণ ব্যবস্থাও অনেক উন্নত।
এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে মহিলা আইপিএল—উইমেনস প্রিমিয়ার লিগ (WPL)। ভারতের তরুণ খেলোয়াড়রা এখন বিশ্বসেরা ক্রিকেটারদের সঙ্গে নিয়মিত খেলছেন, শিখছেন, প্রতিযোগিতা করছেন। প্রভাব পড়েছে বিশ্বকাপের মঞ্চে—যেখানে দলটি আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, পরিকল্পনায় নিখুঁত, মানসিকতায় দৃঢ়।
ময়দানে দীর্ঘদিন ধরে একটা ধারণা ছিল, মহিলাদের খেলাধুলায় উন্নতি আসে এক-দু’জন প্রতিভাবানের হাত ধরে। কিন্তু এই জয়ে প্রমাণিত: সাফল্য আসলে আসে যখন গোটা সিস্টেম কাজ করে। সমান সুযোগ, পরিকাঠামো ও সম্মান—এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের মেয়েরা আজ বিশ্বসেরা।
সম বেতনের ফল আরও গভীরে—এটা মানসিক পরিবর্তন এনেছে খেলোয়াড়দের মধ্যে। স্মৃতি-রিচারা সাফ বুঝেছেন, দেশের পুরুষ ক্রিকেটারদের মতো তাঁরাও গুরুত্বপূর্ণ। সেই আত্মসম্মানই মাঠে আত্মবিশ্বাসের রূপ নিয়েছে। প্রতিটি চার, প্রতিটি উইকেট এখন হয়ে উঠেছে সমতার প্রতীক! সমান প্রণোদনা পেলে মেয়েরা কেমন ঝলসে উঠতে পারেন, তার ‘খেতাবি’ উদাহরণ আপাতত হরমনপ্রীত বাহিনী।