প্রচলিত নিয়মে, ম্যাচ শেষে দুই অধিনায়ককে উপস্থাপনা মঞ্চে উপস্থিত থাকতে হয়। কিন্তু টেনশনের টানে দেখা গেল, আঘা গড়হাজির! তাঁর বদলে শুধু কুলদীপ যাদব ও সূর্যকুমার কথা বললেন সঞ্জয় মঞ্জরেকরের সঙ্গে।

ভারত বনাম পাকিস্তান
শেষ আপডেট: 15 September 2025 11:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের বাইশ গজে রোববার সন্ধ্যায় ক্রিকেট চলল, ফলাফলও এল প্রত্যাশিত—ভারত একতরফা জয় ছিনিয়ে দুরমুশ করল পাকিস্তানকে। তবু ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রে রইল না রান–উইকেটের পরিসংখ্যান কিংবা কুলদীপ-সূর্যর পারফরম্যান্স! বরং, আর সবকিছু ছাপিয়ে সামনে ‘হ্যান্ডশেক-বিতর্ক’। জয় নিশ্চিত হওয়ার পর সোজা সাজঘরে ঢুকে গেলেন সূর্যকুমার যাদবরা। পাকিস্তান শিবির যতই এগিয়ে আসুক না কেন—ড্রেসিং রুমের খিল কিন্তু খুলল না!
চিরাচরিত ‘করমর্দন’-প্রথা উধাও। গতকাল হাত না মিলিয়েই কাল মাঠ ছাড়ল টিম ইন্ডিয়া। দৃশ্যটা দেখে শুধু পাক শিবির নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলও হতবাক। সেই মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই শুরু বেদম শোরগোল—খেলোয়াড়সুলভ আচরণ নিয়ে প্রশ্ন, রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে বিতর্ক আর পাকিস্তান শিবির থেকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ—১২ ঘণ্টা পেরনোর আগেই ক্রিকেট দুনিয়া সবকিছু দেখে ফেলল!
যদিও এত তুলকালামে অবিচল সূর্যকুমার যাদব। ম্যাচ শেষে প্রেজেন্টেশন আর প্রেস কনফারেন্সে স্পষ্ট করলেন, এটা দলের একান্ত সিদ্ধান্ত। তাঁর কথায়, ‘আমরা খেলার জন্যই এসেছি। মাঠে জবাব দিয়েছি। কিছু বিষয় খেলার বাইরের। পহেলগাম জঙ্গি হানায় নিহতদের পরিবার ও সেনার পাশে দাঁড়াতে চেয়েছি। এই জয় তাঁদের উৎসর্গ করছি!’
একই সঙ্গে সূর্য স্বীকার করেন, স্পোর্টসম্যান স্পিরিটের ঊর্ধ্বে কিছু মুহূর্ত থাকে। বিশেষত উপত্যকায় ২৬ জন নিরপরাধ ভারতীয় পর্যটককে হত্যা এবং তার পরবর্তী ‘অপারেশন সিঁদুরে’র আবহে পাকিস্তানের সঙ্গে করমর্দন সম্ভব নয় বলেই যে মনে করেছে তাঁর দল—এটা বুঝিয়ে দিতে কসুর করেননি টিম ইন্ডিয়ার অধিনায়ক।
যদিও রিপোর্ট বলছে, এই হ্যান্ডশেক-বয়কট সূর্যের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। পুরো পরিকল্পনার নেপথ্যে গৌতম গম্ভীর। টেলিকম এশিয়া স্পোর্টের খবর, দলের হেডকোচ নাকি খেলোয়াড়দের সাফ নির্দেশ দেন: ‘সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকো। বাইরের আওয়াজ এড়িয়ে যাও। মনে রেখো, তোমরা ভারতের হয়ে খেলছ। পহেলগামের রক্ত ভুলে যেও না। কোনও আলাপ নয়, হাত মেলানো নয়—শুধু মাঠে নামো, জেতো, দেশকে গর্বিত করো!’ অর্থাৎ, সূর্য স্রেফ মুখপাত্র। আসল কৌশল ছকেছিল টিম ম্যানেজমেন্ট। মাথায় গৌতম গম্ভীর।
একে লজ্জার হার। তার উপর এভাবে মুখের উপর দরজা বন্ধের অপমানে পাকিস্তানের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়েছে। ভারতীয় শিবিরের এহেন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ পড়শি মুলুক। পিটিআই সূত্রে খবর, পিসিবি (PCB) আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (ACC) কাছে। এমনকি ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফটকেও কাঠগড়ায় তুলেছে তারা। পাকিস্তানের দাবি, টসের সময় রেফারি নাকি সলমন আঘাকে পরামর্শ সূর্যের সঙ্গে হাত না মেলানোর পরামর্শ দেন। ফলে শুধু প্রতিপক্ষ, ম্যাচ-অফিসিয়ালের বিরুদ্ধেও ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেট’ লঙ্ঘনের আওয়াজ উঠেছে!
পিসিবি-র জারি করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা হাত মেলাতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। সলমন আলি আঘা পরে প্রতিবাদ হিসেবেই প্রেজেন্টেশন অনুষ্ঠানে যাননি!’ এখানেই থেমে থাকেনি বিতর্ক। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ‘স্পিরিট অফ ক্রিকেটে’র মূল শর্তই হল প্রতিপক্ষকে সম্মান জানানো। ভারত সেই নীতি ভেঙেছে।
আর গোটা ঝামেলাকে আরও উস্কে দিয়েছে এক ভাইরাল ভিডিও। যেখানে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা ভারতীয় সাজঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে, করমর্দনের অপেক্ষায়। আর ভেতর থেকে দরজা টেনে বন্ধ করে দিলেন টিম ইন্ডিয়ার কোনও সদস্য। এই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল হইচই। কারও চোখে এটা ‘ঐতিহাসিক অপমান’, কেউ বলছে ‘নীরব প্রতিবাদ’!
প্রচলিত নিয়মে, ম্যাচ শেষে দুই অধিনায়ককে উপস্থাপনা মঞ্চে উপস্থিত থাকতে হয়। কিন্তু টেনশনের টানে দেখা গেল, আঘা গড়হাজির! তাঁর বদলে শুধু কুলদীপ যাদব ও সূর্যকুমার কথা বললেন সঞ্জয় মঞ্জরেকরের সঙ্গে। পরে সাংবাদিক বৈঠকে পাক কোচ মাইক হেসন বলেন, ‘আমরা হাত মেলাতে চেয়েছিলাম। ওরা করল না। সলমনের না আসাটা তারই প্রতিক্রিয়া। বিষয়টা এভাবেই শেষ হয়ে যাক!’ যদিও পাকিস্তানের কোচ পাশাপাশি স্বীকার করেন, দলের বাজে পারফরম্যান্সের হতাশা ঢাকতে আরও তিক্ততা বাড়িয়েছে এই ঘটনা।
আর ভারতের এই কাণ্ডে সবচেয়ে ক্ষুব্ধ প্রাক্তন পাক পেসার শোয়েব আখতার। নিজের ইউটিউব চ্যানেলে রীতিমতো গর্জে উঠলেন ‘রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস’! বললেন, ‘আমি স্তব্ধ। এটা দেখে কষ্ট পেলাম। ক্রিকেট ম্যাচকে রাজনৈতিক করে তুলো না। আমরা তো তোমাদের নিয়ে ভাল কথা বলেছি। আমি এই মুহূর্তে অনেক কিছু বলতে পারি। ঝগড়া হয়, ঘরেও হয়। ভুলে যাও, এগিয়ে যাও। খেলা তো খেলা, হাত মেলানো উচিত!’ শোয়েবের মতে, ভারত যদি এতটাই রাজনৈতিক বার্তা দিতে চায়, তবে মাঠে নেমে পাকিস্তানকে হারানোই যথেষ্ট ছিল। হ্যান্ডশেক এড়িয়ে যাওয়াটা, তাঁর চোখে, বাড়তি নাটক।
এতকিছুর ভিড়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল, ম্যাচের ক্রিকেটীয় উত্তেজনা লড়াই খতম হতেই উধাও। সূর্যর অপরাজিত ৪৭ রানে ৭ উইকেটে সহজ জয়। কুলদীপ নিলেন চার উইকেট। অথচ সব চাপা পড়ল ‘নো হ্যান্ডশেক’ বিতর্কে।
এখন প্রশ্ন, সুপার ফোরে যদি ফের মুখোমুখি হয় দুই দেশ, তখনও কি একই দৃশ্য দেখা যাবে? নাকি বিসিসিআই, এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল, কিংবা আইসিসি হস্তক্ষেপে একটা সমাধানসূত্র বেরোবে? উত্তরটা এখনও অজানা।