
রাশিদ খান ও রহমানুল্লাহ গুরবাজ।
শেষ আপডেট: 30 June 2024 20:20
ত্রিনিদাদের ব্রায়ান লারা ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে আফগানিস্তানের ধসে পড়ার দিনে সবার আগে সমাজমাধ্যমে এসেছিল ছবিটা। ইনিংস ব্রেকে মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে অধিনায়ক রাশিদ খান। পাশে দাঁড়িয়ে ঠোঁট কামড়াচ্ছেন কোচ জোনাথন ট্রট। অলৌকিক কিছু না ঘটলে জয়ের কোনও সম্ভাবনা নেই। মাত্র ৫৬ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছে আফগানিস্তান। অনায়াসেই রান তুলে দিলেন এইডেন মার্করামরা। ম্যাচের শেষে ওই ছবিটাই ছাপা হল সমস্ত সংবাদমাধ্যমে। হতাশ রাশিদ, বিদায় আফগানিস্তান। কিন্তু আফগান ক্রিকেট বোর্ড এক্স হ্যান্ডলে ওই ছবিটাই দিয়ে লিখল, 'মুখ তোলো, ক্যাপ্টেন! তুমি আমাদের দুনিয়া ভরিয়ে দিয়েছো!'
সেমিফাইনালেই শেষ হয়েছে আফগান রূপকথা। ত্রিনিদাদ থেকেই দেশে ফেরার তোড়জোড় শুরু করেছেন রাশিদরা। গতকাল, বার্বেডোজে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের ট্রফি উঠেছে রোহিত শর্মাদের হাতে। অথচ টি২০ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রান ও সর্বাধিক উইকেট, দুই তালিকাতেই সবার ওপরে জ্বলজ্বল করছে দুই আফগান তারকার নাম। সর্বোচ্চ রান, কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে তাক লাগানো ওপেনার রহমানুল্লাহ গুরবাজ। ৮ ম্যাচে ২৮১ রান। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৬০, নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৮০। এদিকে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির তালিকাতেও সবার ওপরে ফজলহক ফারুকি। নিয়েছেন ১৭ উইকেট। ভারতের আরশদীপ সিংহও ১৭ উইকেট পেয়েছেন। কিন্তু তিনি সব মিলিয়ে বল করেছেন ৩০ ওভার। রান দিয়েছেন ২১৫। সেখানে ফজলহক ২৫ ওভার ২ বলেই ১৭ উইকেট তুলেছেন, রান দিয়েছেন মাত্র ১৬০।
আজ দুপুরে রোহিত শর্মাকে বিশ্বজয় উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা জানিয়েছে ফিফা। কাতারের লুসেইল স্টেডিয়ামে লিওনেল মেসির সেই বিশ্বকাপ হাতে নেওয়ার মুহূর্তের সঙ্গে বার্বেডোজে রোহিতদের ট্রফি তোলার ছবি একসঙ্গে করে ফেসবুক পোস্ট দিয়ে দুই নায়কের করমর্দনের ইমোজি দিয়েছে তারা। আফগানিস্তানকে কি তাহলে তুলনা করা যাবে মরক্কোর সঙ্গে?
হাকিম জিয়েশ, আশরাফ হাকিমি, ইউসুফ এন-নেসায়রিদের সঙ্গে এক হিসেবে কয়েকটা মিলও আছে গুরবাজ-রাশিদদের। ঘরোয়া লিগে মরোক্কার ফুটবলাররা অনেকেই ইউরোপের নামী লিগে খেলেন। জিয়েশ খেলতেন আয়াখসে, হাকিমি পিএসজিতে, এন নেসায়রি সেভিয়াতে। আফগানদের জন্য সেই মঞ্চটা দিয়েছে আইপিএল। রাশিদ, নূর আহমেদ, গুরবাজ, আজমাতুল্লাহ ওমরজাই, নবীন উল-হকরা প্রত্যেকে আইপিএলে নজরকাড়া পারফর্ম করেছেন। কিন্তু স্রেফ এই দিয়ে আফগানিস্তানকে বিচার করলে ক্রিকেটঈশ্বর ক্ষমা করবেন না। এই মুহূর্তে তালিবান শাসনে রয়েছে আফগানিস্তান। মাত্রাছাড়া দারিদ্র্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অনটন লেগে রয়েছে কাবুল থেকে কান্দাহারে। প্রায় তিন দশক ধরে ঠাণ্ডা যুদ্ধের শিকার হয়েছে আফগানিস্তান। সোভিয়েত-মার্কিন টানাপোড়েনে মধ্যযুগের সোনার শহর কাবুল-কান্দাহার-হেরাট বিধ্বস্ত হয়েছে। তার মধ্যে রক্তকরবীর মতোই টিকে গিয়েছে ক্রিকেট।
আফগানিস্তান এমন একটা দল, যাদের অভিধানে হোম-সিরিজ বলে কিছু নেই। কাবুলে কোনও আন্তর্জাতিক দল খেলতে যায় না। নিজেদের ঘরের ম্যাচ আফগানরা খেলে শারজাতে, নয়ত ভারতে। অনুশীলন করেছে দেরাদুনে। অথচ এই অবস্থা থেকেও আফগানদের আগাগোড়া লক্ষ্য ছিল বড় দলকে হারানো। ত্রিনিদাদে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে বিদায় নিয়েও রাশিদ সাফ বলেছিলেন, 'বড় দলকে হারানো আমাদের কাছে খুব স্পেশ্যাল। এই তো সবে শুরু!'
এই লক্ষ্যতেই এবারের টি২০ বিশ্বকাপে সোনা ঝরিয়েছেন আফগানরা। গ্রুপ সি-তে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে পড়েছিলেন গুরবাজরা। সেখানে নিউজিল্যান্ডকে ৭৫ রানে চুরমার করে দিয়েছে আফগানিস্তান। টসে জিতে আফগানদের ফিল্ডিং করতে পাঠান কেন উইলিয়ামসন। ১৫৯ তোলে আফগানিস্তান। ওপেনার গুরবাজ নেমেই তুলে দেন ৮০। জবাবে ব্যাট করতে নেমে গ্লেন ফিলিপস আর ম্যাট হেনরি বাদে কেউ দু' অঙ্কের রানে পৌঁছননি। সুপার এইটে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে রীতিমত সাড়া ফেলে দেন রাশিদরা। আফগানিস্তানের ১৪৮ রান তাড়া করতে নেমে ১২৭ রানেই গুটিয়ে যেতে হয় গ্লেন ম্যাক্সওয়েলদের। একই অবস্থা হয় বাংলাদেশের। ১১৫ তাড়া করতে নেমে ১০৫ রানেই শেষ হয়ে যায় সাকিবদের ইনিংস। একা লিটনই ৫৪ রান করেছিলেন, আর কেউ দাঁড়াতে পারেননি।
সেমিফাইনালে আফগানিস্তানের ভরাডুবির পিছনে ক্রিকেটের বাইরের কিছু ঘটনাও ছিল। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সুপার এইটের ম্যাচ খেলার পরেরদিনই সেমিফাইনাল খেলতে ত্রিনিদাদের বিমান ধরতে হয়েছিল রাশিদদের। বিমান বিভ্রাটে চার ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় বিমানবন্দরে। ত্রিনিদাদের ব্রায়ান লারা অ্যাকাডেমির মাঠের সঙ্গেও পরিচয় ছিল না রাশিদদের। ঠিক মত অনুশীলনের সুযোগও পাননি। কিন্তু দিনের শেষে এইসব অজুহাতে কান দিতে চান না রাশিদ। দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের পরে বলেছেন, 'যে কোনও পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে হবে। ওরা (প্রোটিয়ারা) খুব ভাল বল করেছে। আমরা স্রেফ ব্যাট করতে পারিনি।' কিন্তু পরে যোগ করেন, 'আমরা এখন এইটুকু বিশ্বাস করতে পারছি, আমরা নিজেদের দিনে যে কাউকে হারাতে পারি! অনেক কিছু শিখলাম আমরা এই টুর্নামেন্ট থেকে।'
নায়ক এরকমই হ'ন। যুদ্ধ যাদের দমাতে পারেনি, সামান্য একটা সেমিফাইনালে হার আর তাঁদের কী করতে পারে!