
সহজ টার্গেট পেয়েও ৬ রানে হার মানতে হল পাকিস্তানকে।
শেষ আপডেট: 10 June 2024 01:27
কী ছিল না আজ? আমেরিকার মাটিতে প্রথম ভারত-পাকিস্তান মহারণ! নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি, কানেটিকাট, নেওয়ার্কের প্রবাসী ভারতীয় ও পাকিস্তানি দর্শকদের ঢালাও উপস্থিতি! মাত্র ৩৪,০০০ আসন, এদিকে শোনা যাচ্ছে পশ্চিম উপকূলের সান ফ্রানসিস্কো, সিয়াটল থেকেও নাকি অনেকে বিমান ধরে চলে এসেছেন! স্রেফ বিরাট কোহলি-বাবর আজমের দ্বৈরথ চাক্ষুষ করবেন বলে! এক একটা বল হতেই ডিজে তারস্বরে বাজাচ্ছেন হিন্দি-পাঞ্জাবি গান! গ্যালারিতে বসে সপরিবার শচীন তেণ্ডুলকর থেকে জয় শাহ। সবই ছিল।
শুধু ক্রিকেটটা বাদে।
এমনিতে অরণ্যের প্রাচীন প্রবাদ, যত যাই হোক, বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কার্যত অপরাজেয় ভারত। অথচ ম্যাচ যে কোনদিকে গড়াবে, সেসব টসের মুহূর্ত থেকেই বোঝা গিয়েছিল। বাবর আজম টস জিতলেন, সামনে রবি শাস্ত্রী, ফিল্ডিং-এর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দলের বিষয়ে বলছেন। রোহিত তখন পিছনে দাঁড়িয়ে এক মনে তাকিয়ে পিচের দিকে। এমন ভাবে দেখছেন যেন লাদাখে ট্রেক করতে গিয়েছেন, সামনে রাস্তা শেষ, পাথুরে কোনও নালা-টালা আছে, গাড়ি টপকাবে কিনা। রবি প্রশ্ন ছুঁড়েই দিলেন, 'তুমি জিতলেও তো ফিল্ডিং-ই নিতে, নাকি?' রোহিত তখনও পিচের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলে গেলেন, 'এ যে কী হবে কিছুই জানা নেই।
ম্যাচটা তাও একপেশে হয়নি, সৌজন্যে মহম্মদ রিজওয়ান। একটা সময় মনে হচ্ছিল, পাকিস্তান বুঝি বের করে নেবে সোজাসুজি। ভারত ১১৯ রানে অল-আউট। এই অবস্থায় নেমে ওপেনে যা করা উচিত, বাবর-রিজওয়ান জুটি তাই করলেন। টুক টুক করে ধরে খেলো। ঠাণ্ডা মাথায় রানরেট ৬ রেখে বের করে নাও। রিজওয়ান দাঁড়িয়েই গিয়েছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। সেই মিডল অর্ডার। শুরুটা মন্দ করেনি ভারত। এই পিচে আইপিএলের মত রানের ফোয়ারা ছুটবে না, জানা কথাই। রোহিত আর বিরাট শুরুতে ফিরে যেতে ঋষভ-অক্ষর প্যাটেল জুটি ভাল হাল ধরেছিলেন। অন্তত পাওয়ার-প্লেতে মন্দ খেলেনি ভারত। রান রেট আটের ঘরে ছিল। ডোবাল তারপরের মিডল অর্ডার। দশ ওভারের পরে সেই রান রেট গিয়ে দাঁড়াল তিনের ঘরে। ৯৫ রানে ৫ উইকেট দেখে একটু জল খেতে গিয়ে ফিরে এসে দেখা যাচ্ছে ৯৬ রানে ৭ হয়ে গিয়েছে। ভোটের ফলাফলের পরে মুম্বইয়ের শেয়ার বাজারের সেনসেক্সের মত উইকেট পড়লে তখন কার আর কী করার থাকে!
পাকিস্তানকেও ডোবাল সেই একই মিডল অর্ডার। বিশ্বকাপের শেষ আঁতে ওঠার সহজ অঙ্কে পড়তে হলে বাবর-রিজওয়ানদের এই ম্যাচ জিততেই হত। প্রথম ম্যাচে আমেরিকার কাছে বেমক্কা হেরে এবারেও হারলে কঠিন নেট রানরেটের অঙ্ক নিয়ে মাথা চুলকোতে হবে পাকিস্তানকে। অথচ রিজওয়ান-বাবরের পরে কেউ একটা নূন্যতম রক্ষণ ধরে রাখতে পারলেন না। ভারতের যেমন ঋষভ পন্থ বাদে কেউ ২০ রান টপকাতে পারেনি। সূর্যকুমার-হার্দিকদের অবস্থা কহতব্য নয়। সেখানে পাকিস্তানের অবস্থা চোখে দেখা যাচ্ছে না। রিজওয়ান বাদে একজনও ১৫ রান টপকালেন না।
আমেরিকায় কেন ক্রিকেট বিশ্বকাপ হবে, এই প্রশ্ন তুলে লাভ নেই। বিশ্বকাপ চাইলে মঙ্গোলিয়াতেও আয়োজন করা যেতে পারে। তুমি বলার কে হে? ওটা তো আইসিসি ঠিক করবে। ক্রিস্টোফার কলম্বাস যদি অতলান্তিক পেরোতে পারেন, ক্রিকেটে দোষ কোথায়? ক্রিকেট তো ক্যারিবিয়ান সাগরের আশেপাশের দ্বীপে শুরু থেকেই আছে, দুইবার পর পর বিশ্বকাপও নিয়ে গিয়েছে। এবার তো শুধু মেক্সিকো উপসাগর টপকালেই মার্কিন উপকূলে পৌঁছতে পারে। সমস্যাটা অন্য। নিউ ইয়র্ক। মাত্র পাঁচ মাসে ধর-তক্তা-মার-পেরেক করে একটা মাঠ বানিয়েছে আইসিসি। বিস্তর হ্যাপার পর ফ্লোরিডায় পিচ বানিয়ে ট্রলারে করে নিয়ে আসা হয়েছে সেখানে। এরকম 'ড্রপ-ইন' পিচের চরিত্র কিউরেটরের পক্ষেও বোঝা মুশকিলের হয়ে দাঁড়ায়। আগের দিন রোহিত শর্মা সাংবাদিক সম্মেলনে এসে সেটাই বলে গেলেন। এক পাক সাংবাদিক প্রশ্ন রেখেছিলেন, ভারত তো দিব্যি মানিয়ে-টানিয়ে নেওয়ার সুবিধে পেয়েছে, আপনারা কীরকম অ্যাডভান্টেজ পাবেন? রোহিত হাত উলটে বললেন, কিউরেটরও জানে না এই পিচ কীরকম হবে!
টুকটাক কিছু যে সুবিধে ভারত পায়নি, তা নয়। আইপিএল শেষ হবার আগেই নীল ব্রিগেডের বেশিরভাগ ক্রিকেটার নিউ ইয়র্কে ঢুকে পড়েছিলেন, একটা প্রস্তুতি ম্যাচ ও আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে প্রথম ম্যাচ খেলে নিয়েছেন বিরাট-রোহিতরা। সেখানে পাকিস্তান শুরু থেকেই ভুল চালে চলছে। বিশ্বকাপের আগে তারা প্রস্তুতি সেরেছে ইংল্যান্ডে। এসে ডালাসে প্রথম ম্যাচেই আনকোরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হারতে হয়েছে। বিমানে টেক্সাস থেকে নিউ ইয়র্কে এসেও হোটেল সমস্যায় পড়েছিলেন বাবর আজমরা। নতুন মাঠ বানানো হয়েছে লং আইল্যান্ডের নাসাই কাউন্টির আইজেনহাওয়ার পার্কে। পাকিস্তানের হোটেল থেকে সেখানে টিম বাসে যেতেই ঘন্টাদেড়েক লেগে যাবে। শ্রীলঙ্কাও একই সমস্যায় পড়েছিল। তাদের হোটেল দেওয়া হয়েছে একেবারে খাস নিউ ইয়র্ক শহরের ব্রুকলিনে। সেও ঘন্টাদেড়েক দূরে। পাক ম্যানেজমেন্ট আর দেরি করেনি। পত্রপাঠ মাঠের কাছে নতুন হোটেল খুঁজে নেওয়া হয়েছে।
ভারতের অবশ্য সেই ঝামেলা হয়নি। মাঠ থেকে দশ মিনিট দূরেই হোটেল দেওয়া হয়েছে। তাতেও ভরাডুবি ঠেকানো যায়নি। ১১৯ রানটাকে টি২০ ক্রিকেটে মোটামুটি নড়বড়েই বলতে হবে। স্যার রবীন্দ্র জাডেজা, বুমরাহ নেমেই আউট হয়েছেন। সূর্যকুমার, শিবম দুবে, হার্দিক যা খেল দেখালেন, এইবার প্রশ্ন উঠতে পারে দল বাছাই নিয়ে। ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে গাঁইগুঁই শুরু হয়েছে। রিঙ্কু সিংহ বা সঞ্জু স্যামসনকে নিলে এইসব হত না ইত্যাদি! যদিও পাল্টা অনেকে বলছেন, তার গ্যারান্টি কোথায়? বরং এই মাঠে স্কোর যে ১০০ পেরিয়েছে এতেই খুশি থাকা উচিত।
অথচ পাকিস্তানের দুই ওপেনার বাবর-রিজওয়ান যা টিকে গিয়েছিলেন, খানিকক্ষণের জন্য মাঠে ভারতীয় সমর্থকরা প্রায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলেন। গোল বাঁধল ১৩-তে। হ্যাঁ, ১৩ সংখ্যাটাকে অনেকে অপয়া বলেন। পাকিস্তানের পর পর তিনজন, বাবর, উসমান খান, ফখর জমান আউট হলেন ১৩-তে। এরপর আর কারোর কিছু বলার থাকতে পারে না। ভারতের মত উইকেটে ধস নামেনি। কিন্তু ১৪ ওভারের প্রথম বলে রিজওয়ান আউট হতেই সম্ভবত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। আর ফেরানো যায়নি। নিউ ইয়র্কে আরও একবার 'বিশ্বকাপে পাকিস্তান ভারতকে হারাতে পারে না'-গুজবকে সত্যি করেই হোটেলে ফিরতে হচ্ছে পাকিস্তানকে।