
ভারতীয় দলের কোচ হবার দৌড়ে আপাতত এগিয়ে গম্ভীর ও লক্ষণ, অন্তত এমনটাই জল্পনা বোর্ডের অন্দরে।
শেষ আপডেট: 25 May 2024 19:33
দেশের উঠতি ক্রিকেট প্রতিভাদের নিজেদের প্রমাণ করার মঞ্চ হিসেবে আইপিএলের কোনও জুড়ি মেলা ভার। জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ে আইপিএলে তুফানি খেলে আবার জাতীয় দলে ফিরে এসেছেন, এমন উদাহরণও ভূরি ভূরি। আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট তারকাদের টিপস নিয়ে তরুণ ক্রিকেটারদের ঘষেমেজে নিজেকে ধারালো করে নেওয়ার দৃশ্য প্রায়ই ঘুরেফিরে বেড়ায় সমাজমাধ্যমে। এবার সেই ধারাটাই আরও এক ধাপ ওপরে উঠল। কানাঘুষো যা শোনা যাচ্ছে, ভারতীয় কোচ খোঁজার দৌড়েও নির্বাচকরা আতসকাঁচ নিয়ে নেমে পড়েছেন আইপিএলে।
সামনেই টি-২০ বিশ্বকাপ। মোটামুটি রোহিত শর্মাদের দল ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই বোর্ডের তরফে এটা-সেটা বলে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এই বিশ্বকাপই ভারতীয় কোচ হিসেবে রাহুল দ্রাবিড়ের শেষ টুর্নামেন্ট। ২০২১ থেকে ভারতীয় দলের দায়িত্বে রয়েছেন দ্রাবিড়। তার আগে একাধিক কোচিং দায়িত্ব সামলেছেন। কাজ করেছেন বেঙ্গালুরুতে ন্যাশনাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমির (এনসিএ) প্রধান হিসেবে। কিন্তু কোচ দ্রাবিড়ের আমলে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে ভাল ফল হলেও, ভারতের ট্রফি খরা আর কাটেনি। পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপে অনবদ্য খেলেও ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারতে হয়েছে। তাও দ্রাবিড় বলেই আচমকা কোনও রকম সিদ্ধান্ত নিতে চায়নি বোর্ড। ধীরেসুস্থে অপেক্ষা করা হয়েছে মেয়াদ শেষ অবধি। সেই মেয়াদই বিশ্বকাপের পর শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে আপাতত জোরকদমে নতুন কোচের খোঁজে নেমেছেন বোর্ডকর্তারা।
আপাতত বাজারে যা খবর, দু'টি নাম নাকি দৌড়ে বেশ এগিয়ে রয়েছে। তালিকায় ওপরে রয়েছেন ন্যাশনাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমির প্রধান ভিভিএস লক্ষণ। তাঁর নাম নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠার জায়গা নেই। ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা আইকন লক্ষণের এনসিএ-তে মেয়াদ শেষ হচ্ছে সেপ্টেম্বরে। এদিকে আইপিএলের একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে কোচিং করানোর অফার রয়েছে তাঁর কাছে। তার ওপর আছে কমেন্ট্রির কাজের অফার। সবক'টিতেই লক্ষ্মীলাভের আশা বিপুল। বস্তুত, বিসিসিআইয়ের অন্দরে যা খবর, অমন একটি লোভনীয় অফার ছেড়েই তুলনায় অনেক কম পারিশ্রমিকে এনসিএ-তে যোগ দিতে রাজি হয়েছিলেন লক্ষণ। কিন্তু প্রশ্ন অন্যত্র। ভারতের সিনিয়র দলের কোচের দায়িত্ব নিতে লক্ষণের বিরাগ সুবিদিত। সংবাদসংস্থা পিটিআই যা জানিয়েছে, লক্ষণ এখনও কোচের পদের জন্য আবেদন করেননি। ভারতীয় দলের কোচ হওয়ার হ্যাপা অনেক। তিন ফর্ম্যাটে কোচ হিসেবে সাড়ে তিন বছর দুনিয়াজুড়ে চরকিপাক খেতে হবে। সেখানে আইপিএল অনেক সহজ। লক্ষণ কি রাজি হবেন?
বোর্ডের কর্তারা বলছেন, বল এখন সবটাই সচিব জয় শাহের হাতে। এমনিতে বিসিসিআই সভাপতি পদে রজার বিনি আছেন বটে। কিন্তু শেষ কথা সবরমতীর ওপার থেকেই আসবে। ফলে জয় শাহ লক্ষণকে রাজি করাতে পারলে আলাদা কথা। লাল বলে লক্ষণের অভিজ্ঞতা প্রশ্নাতীত। যদি একান্তই কোচ হিসেবে রাজি না হ'ন, তাঁকে কনসালট্যান্ট বা মেন্টর ইত্যাদি পদে রেখে সিরিজে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে। তাহলে কোচ হবেন কে? শোনা যাচ্ছে, আইপিএলে একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজিতে কোচ বা মেন্টর হিসেবে নজর কাড়া কয়েকজনের ওপর বোর্ডের নজর রয়েছে। এই তালিকায় আবার সবার আগে রয়েছেন কলকাতা নাইট রাইডার্সের মেন্টর গৌতম গম্ভীর।
তালিকায় বাকি কারা আছেন, সেসব নিয়ে যদিও বোর্ড-কর্তারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। কিন্তু খবর ঠিকই বেরিয়ে গিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, একাধিক অস্ট্রেলীয় তারকার কাছে প্রস্তাব গিয়েছিল। ইতিমধ্যেই যা নিয়ে বিবৃতি দিয়ে দিয়েছেন রিকি পন্টিং ও জাস্টিন ল্যাঙ্গার। বস্তুত, ওই হ্যাপার যুক্তিতেই দু'জনে সবিনয়ে কোচ হওয়ার আবেদন ফিরিয়ে দিয়েছেন। প্রাক্তন অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক ও বর্তমানে দিল্লি ক্যাপিটালসের কোচ পন্টিং যেমন বলেছেন, তাঁর সঙ্গে আইপিএলের মাঝেই কোচ হওয়া নিয়ে কিছু কথাবার্তা এগিয়েছিল। বুঝতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি আগ্রহী কিনা। কিন্তু তিন মাসের আইপিএল ছেড়ে তিন বছরের জন্য দশ-এগারো মাস ধরে টানা ঝক্কি এখন তাঁর পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর 'লাইফস্টাইলের সঙ্গেও' সেসব যায় না। আইপিএল অনেক ভাল। লখনউ সুপার জায়ান্টসের জাস্টিন ল্যাঙ্গারও একই যুক্তিতে এটা-সেটা বলে কাটিয়েছেন। তিনি নাকি অধিনায়ক কেএল রাহুলের সঙ্গে কথা-টথাও বলেছেন। শেষে সরে এসেছেন। ওদিকে চেন্নাই সুপার কিংসের স্টিভেন ফ্লেমিংকে নিয়েও বোর্ড আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু সিএসকের সিইও বলেছেন, তাঁদের কোচ এই গুরুদায়িত্ব নিতে আগ্রহী নন।
এসব খবর চাউর হতেই যথারীতি আসরে নেমে পড়েছেন জয় শাহ। তড়িঘড়ি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, বিসিসিআই বা সচিব জয় শাহ, কারোর পক্ষ থেকেই কোনও অস্ট্রেলীয় তারকার কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। এসব রিপোর্ট সবই ভুল। বরং তাঁরা ভারতীয় কাউকেই চাইছেন, যিনি দেশে ক্রিকেটের পরিকাঠামো বা গঠন খুব ভাল বোঝেন। অতএব পাল্লা ভারি হয়েছে কলকাতার মেন্টর গৌতম গম্ভীরের। কলকাতাকে দুইবার আইপিএল জেতানো গম্ভীরের নেতৃত্বের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। লখনউয়ের মেন্টর হিসেবে নজর কেড়েছেন। কলকাতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে তাঁর। টি-২০ ফর্ম্যাটে তিনি রীতিমত বিশেষজ্ঞ। খেলোয়াড়দের সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারেন, ইগো সমস্যা নেই, ছোটখাটো অবদানও গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। ২০১২ আইপিএল ফাইনালে ব্রেন্ডন ম্যাকালামকে বসিয়ে মনবিন্দর বিসলার মত অনামী মুখকে নিতে দু'বার ভাবেননি। এবারেও মিচেল স্টার্কের পিছনে ২৪ কোটি টাকা গচ্চা দিয়েছে কেকেআর। স্টার্ক একেবারেই ছন্দে ছিলেন না। কিন্তু হাল ছাড়েননি গোতি। প্লে-অফে এসে স্টার্ক বুঝিয়েছেন, কেন তিনি বড় ম্যাচের বিশেষজ্ঞ। অভিজ্ঞতাতেও তিন ফর্ম্যাটেই অভিজ্ঞতা আছে গম্ভীরের। ভারতের হয়ে টি-২০ ও পঞ্চাশ ওভার দুই বিশ্বকাপেই দলে তিনি ছিলেন। দেশের হয়ে ৫৮ টেস্টে ৪১৫৪ রান আছে তাঁর। কিন্তু প্রশ্ন অনেকগুলো। গম্ভীর আগে কোনও ফর্ম্যাটেই পুরো সময়ের কোচের দায়িত্বে থাকেননি। আইপিএলের মেন্টর আর সাড়ে তিন বছরের জন্য দেশের জাতীয় দলের কোচ থাকা এক নয়।
সোমবার, ২৭ মে কোচ হিসেবে আবেদন করার শেষ দিন। তার আগে আপাতত গম্ভীর, লক্ষণের পাশাপাশি দলের বর্তমান ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোরের নামও জল্পনায় আছে। তবে আইপিএলে এই বছর পন্টিং, ল্যাঙ্গারের পাশাপাশি হায়দরাবাদের ড্যানিয়েল ভেত্তোরি বা রাজস্থান রয়্যালসের কুমার সঙ্গাকারা নজর কেড়েছেন। কুমার সঙ্গকারার মত স্থিতধী, অভিজ্ঞ কাউকে নিয়ে আসা তো অভাবনীয় হবে। কিন্তু জয় শাহ বলেছেন, 'ভারতীয় দলের জন্য সঠিক কোচ খোঁজা একটা দীর্ঘ ও জটিল কাজ। আমরা এখনও উপযুক্ত কাউকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। যিনি ভারতীয় ক্রিকেটের পরিকাঠামো নিয়ে গভীরভাবে জানেন এবং ধাপে ধাপে ওপরে উঠে এসেছেন।'
বিশ্লেষকরা অনেকেই বলছেন, এই কাজে গম্ভীর খুবই উপযুক্ত পছন্দ হতে পারেন। অভিজ্ঞতা নেই ঠিকই কিন্তু যে কোনও কাজেরই একটা শুরু থাকে। গম্ভীরের মত কাউকে এই মুহূর্তে দলের খুবই দরকার। পুরনোরা এখনও সগৌরবে বিরাজমান। এদিকে একঝাঁক নতুন প্রতিভা উঠে আসছে। এখানে নবীন-প্রবীণ মেলবন্ধন করাটা গম্ভীরের মত কেউ থাকলে অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। এখন অন্য একটা প্রশ্নও আছে। কেকেআরের সঙ্গে গম্ভীরের সম্পর্ক। সদ্য এই বছর গম্ভীরকে ফিরিয়েছে কলকাতা। আর প্রথমেই তিনি কামাল করে দিয়েছেন। কলকাতা ম্যানেজমেন্টের অন্দরে অনেকেই বলছেন, শেষ অবধি যদি গম্ভীরের কাছে চূড়ান্ত প্রস্তাব আসে এবং গম্ভীর সেটা বিবেচনা করেন, সম্ভবত শাহরুখ খানের সঙ্গেও তিনি এই নিয়ে বিশদে আলোচনা করবেন। দেশের দায়িত্ব তো সবকিছুর আগে!