পহেলগামের পর দু’দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে ভেন্যু বদলে গিয়েছে। এবার সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে এশিয়া কাপের আসর বসার কথা।

ভারত-পাকিস্তান
শেষ আপডেট: 29 June 2025 13:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: চলতি বছরের এশিয়া কাপ নিয়ে সংশয়ের মেঘ কি কাটতে চলেছে? একটি সর্বভারতীয় ক্রিকেট ওয়েসবসাইট সূত্রে খবর, আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারত-পাকিস্তান দুই দেশই অংশ নিতে পারে। এই বিষয়ে কোনও পক্ষই চূড়ান্ত কিছু জানায়নি। সমস্তটাই আলাপ-আলোচনার স্তরে। যদিও আগাম আন্দাজে মনে করা হচ্ছে, পহেলগাম নাশকতা ও সীমান্ত সংঘর্ষের ইস্যুকে সাময়িকভাবে হলেও দূরে সরিয়ে ক্রিকেটের ময়দানে নামার বিষয়ে দু’দেশের ক্রিকেট বোর্ড সবুজ সংকেত দেখিয়েছে।
ওই ওয়েসবসাইটের দাবি, আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী টুর্নামেন্ট আয়োজিত হবে। আগে ভারত আয়োজক দেশ ছিল। যদিও পহেলগামের পর দু’দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে ভেন্যু বদলে গিয়েছে। এবার সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে এশিয়া কাপের আসর বসার কথা। না বিসিসিআই, না পিসিবি—কেউই ‘বয়কটে’র রাস্তায় হাঁটছে না। যার অর্থ, ভারত ও পাকিস্তান দু’দেশই সম্মুরসমরে হতে চলেছে।
ওয়েবসাইটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘এখনও কিছুই চূড়ান্ত নয়। যদিও প্রাথমিক সংকেত এটাই যে, আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আগামী সপ্তাহে নেওয়া নেওয়া হতে পারে। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে টুর্নামেন্ট সূচি ঘোষিত হবে।’
এতকিছুর মধ্যে প্রতিযোগিতার একগুচ্ছ কর্মসূচির কাজ শুরু হয়েছে। লিডস টেস্টে যখন খেলতে নামছেন শুভমানরা, তখন সামনে আসে এশিয়া কাপের প্রোমোশনাল ভিডিও। যা সোশ্যাল মিডিয়ায় মুহূর্তে ভাইরাল হয়। সেখানে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের টি-২০ অধিনায়করা অংশ নেন। যদিও টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়নস ট্রফির মতো হাইব্রিড ফর্ম্যাটে আয়োজিত হবে কি না—এর জবাব এখনও মেলেনি।
প্রসঙ্গত, শুধু পাকিস্তান নয়। পহেলগামে জঙ্গি নাশকতার জেরে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কও জোর ধাক্কা খায়। আর এর প্রভাব পড়ে খেলার ময়দানেও। বিসিসিআই সাফ জানায়, দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ, যা ২০১২ সাল থেকেই বন্ধ রয়েছে, আপাতত চালু হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। এর পাশাপাশি আগামী দিনে যাতে নক আউট টুর্নামেন্টেও দুটি টিমকে একই গ্রুপে রাখা না হয়—এই মর্মে আইসিসিকে চিঠিও পাঠায় বিসিসিআই।
আইসিসির আসন্ন টুর্নামেন্ট বলতে এশিয়া কাপ। মে মাসে ভেন্যু নির্দিষ্ট না হলেও পহেলগামের আগে এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে এতদিন সংশয় ছিল না। কাশ্মীর সীমান্তে নাশকতার পর এই নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন দেখা দেয়। শর্ত অনুযায়ী, এশিয়া কাপ আয়োজিত হয় নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। কিন্তু পহেলগামে জঙ্গিহানার জেরে দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যেভাবে তলানিতে ঠেকে, তাতে গোটা টুর্নামেন্ট নিয়ে আশঙ্কার মেঘ জমতে শুরু করে।
এই পরিস্থিতি জটিলতর করে বাংলাদেশ। আগামী অগস্ট মাসে প্রতিবেশী দেশে যাওয়ার কথা রোহিতদের। তিনটি করে ওয়ান ডে এবং টি-২০ ম্যাচের সূচি ঘোষিত না হলেও প্রস্তুত। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির আঁচে সেই ট্যুর কি আদৌ হবে? বিসিসিআইয়ের এক আধিকারিকের কথায়, ‘বাংলাদেশ সফর টিম ইন্ডিয়ার ক্যালেন্ডারে রয়েছে। যদিও কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। সাম্প্রতিক অবস্থায় এই সফর বাতিল হওয়ার জোরদার সম্ভাবনা রয়েছে।’
প্রসঙ্গত, এই সম্পর্কের অবনতির জেরে ভারতের উপর কতটা আঁচ পড়বে সেটা নিয়ে চর্চার অবকাশ থাকলেও পাকিস্তানের রাজস্বের ভাঁড়ারে যে ব্যাপক টান পড়তে চলেছে তা বলাই বাহুল্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত বয়কট করলে পাকিস্তানের প্রভূত আর্থিক ধাক্কার সামনে পড়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা।
আইসিসি প্রতিযোগিতায় আড়ি:
দ্বিপাক্ষিক সিরিজ দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ। ইত্যবসরে ভারত আর পাকিস্তান (IND vs PAK) মুখোমুখি হত শুধুমাত্র আইসিসি টুর্নামেন্টে। এরপর থেকে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও যদি দুই দেশ পরস্পরের বিরুদ্ধে না খেলে তাহলে তাদের দ্বৈরথের সম্ভাবনাই মুছে যাবে। আয়োজকরা মুনাফার কথা মাথায় রেখে রোহিত, বাবরদের একই গ্রুপে রাখার চেষ্টা করেন। এই পরিস্থিতিতে, বিসিসিআইয়ের আইসিসিকে চিঠি লিখে একই গ্রুপে না রাখার আর্জি জানানোর অর্থ সেই আর্থিক মুনাফায় টান পড়া।
ঠিক কতটা ঘাটতি পড়তে পারে এই নিয়ে একটা হিসেব পেশ করেছে ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। সংস্থার মতে, দুই দেশের ম্যাচ থেকে গত দুই দশকে মোটামুটি ১০ হাজার কোটি টাকার মুনাফা এসেছে। এতে বিজ্ঞাপনদাতারাও বড় ভূমিকা পালন করেছেন। ভারত-পাক ম্যাচের অন্তরালে ১০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনও বিপুল অঙ্কের বিনিময়ে ছাড়তে রাজি হয় একাধিক গোষ্ঠী। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড লাভের জন্য এই জাতীয় অ্যাডের মুখ চেয়ে থাকে। বিসিসিআইয়ের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক মানে সে আশায় গুড়ে বালি!
চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আয়োজক দেশ হিসেবে মনোনীত হয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু গ্রুপ স্টেজ থেকে বিদায় নেন বাবর আজমরা। এর জেরে মুনাফা তো জোটেইনি, উপরন্তু বিপুল লোকসান ভোগ করতে হয়েছে পিসিবিকে।
ব্রডকাস্ট বয়কট:
পহেলগাম ইস্যুর জেরে ইতিমধ্যে ভারতে পাকিস্তানের ক্রিকেট লিগ (পিএসএল) (PSL) সম্প্রচার বন্ধ করে স্ট্রিমিং অ্যাপ ‘ফ্যানকোড’ (Fancode)। পাশাপাশি শোয়েব আখতার, বাসিত আলি, রশিদ লতিফের ইউটিউব চ্যানেল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কেন্দ্র। যার ফলে পাকিস্তানের প্রাক্তন ক্রিকেটারদের একটা বড় অংশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাঁদের লাভের একটা বড় অংশ এদেশ থেকে আসত। ভারতে শোয়েবদের অকপট বিশ্লেষণ শোনার বড় ফ্যানবেস রয়েছে। অনেকেই তাঁদের বক্তব্য শুনতে মুখিয়ে থাকেন। এই সম্পর্কচ্ছেদ তাই শুধু পিসিবি নয়, ব্যক্তিবিশেষে অনেক ক্রিকেটারের পকেটে টান ফেলে।
অতীতে এই ভারত-নির্ভরতা নিয়ে সরব হন রামিজ রাজা। আশঙ্কা প্রকাশের সুরে যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘আইসিসি আসলে আদ্যন্ত রাজনৈতিক সংস্থা। স্পষ্টভাবে এশীয় এবং ইউরোপীয়—এই দুই প্রকোষ্ঠে বিভক্ত। আর তাদের মোট লাভের ৯০ শতাংশই আসে ভারত থেকে। এটা ভয়ানক! এক অর্থে ভারতের বাণিজ্য সংস্থাগুলি পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে চালনা করছে। কাল যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা পাকিস্তানকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া বন্ধ করবেন, তাহলে পাক ক্রিকেট বোর্ড ভেঙে পড়বে।’