বল আর বুলেটের এই যুদ্ধে হারিয়ে যাচ্ছে সেই ক্রিকেট-বন্ধুত্ব, যা একসময় এই দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে মানবিক দিক বলে মনে করা হত।

পাকিস্তান বনাম আফগানিস্তান
শেষ আপডেট: 14 October 2025 17:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দু’দেশের সীমান্ত থেকে শুরু করে বাউন্ডারির প্রান্ত—সব জায়গাতেই এখন টানটান উত্তেজনা। পাকিস্তান (Pakistan) ও আফগানিস্তানের (Afghanistan) নিয়ন্ত্রণরেখায় (Durand Line) লাগাতার সংঘর্ষের আঁচ এবার ছড়িয়ে পড়ছে ক্রিকেটের চৌহদ্দিতে। নভেম্বরের নির্ধারিত ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজ (T20I Tri-Series) এই মুহূর্তে কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই সীমান্তে যত সংঘর্ষ হয়েছে, তার প্রায় প্রতিটিকে ‘প্রাণঘাতী’ বলেই বর্ণনা করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। দু’দেশের সেনা—পাকিস্তান আর্মি (Pakistan Army) ও তালিবান (Taliban)—একাধিক জায়গায় মর্টার ও ভারি অস্ত্রে লড়ছে। কেবল হামলার পাল্টা হামলাই নয়, দাবি উঠছে শত্রুপক্ষের একাধিক চৌকি দখলেরও। শনিবার পর্যন্ত যে সংঘর্ষ চলেছে, তাতে অন্তত ২০০ জন তালিবান যোদ্ধা ও ২৩ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে বলে ইসলামাবাদের দাবি। আফগানিস্তান তুলেছে পাল্টা ধুয়ো: ৯ জন যোদ্ধা মারা গিয়েছেন ঠিকই। তবে ৫৮ জন পাকিস্তানি সেনাকে তারা ‘নিষ্ক্রিয়’ করেছে।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা বৃহস্পতিবারের বিমান হামলা থেকে। কাবুলে (Kabul) সন্দেহভাজন জঙ্গি ঘাঁটিতে আঘাত হানে যুদ্ধবিমান। পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে দায় না নিলেও, এই আক্রমণ ছিল তাদের প্রতিশোধ—এমনই বিশ্লেষণ পর্যবেক্ষক মহলের। আফগানিস্তান প্রতিক্রিয়ায় সীমান্তে একযোগে হামলা চালায় আদ্দা, বাজওর, কুররাম, দির, চিত্রাল ও বেলুচিস্তানের বাহরাম চাহ এলাকায়।
এমন এক সময়, যখন ক্রিকেটকে ‘শান্তির সেতু’ বলেই ধরা হচ্ছিল, সীমান্ত সংঘাত সেই সেতুতেই ফাটল ধরিয়েছে। কারণ, নভেম্বরে পাকিস্তানের মাটিতে আয়োজন হওয়ার কথা ছিল একটি ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজের—পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে (Sri Lanka) নিয়ে। তারিখও ঠিক—১৭ থেকে ২৯ নভেম্বর, ভেন্যু রাওয়ালপিন্ডি ও লাহোর (Rawalpindi & Lahore)। কিন্তু এখন সেই প্রস্তুতি ঘিরে গভীর সংশয়।
আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (ACB) জানিয়ে দেয়, তারা এই সিরিজে অংশ নেবে। তবে বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতি দেখে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তালিবান সরকারের অনুমতি হয়তো আর মিলবে না। টুর্নামেন্ট থেকে আফগানিস্তান যদি সরে দাঁড়ায়, তা হলে শুধু রাজনৈতিক পরিসরে নয়, ক্রিকেট-সম্পর্কও নয়া সংকটে পড়বে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (PCB) চেয়ারম্যান মহসিন নকভি (Mohsin Naqvi) অবশ্য এখনও আশাবাদী। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (ICC) বিকল্প পরিকল্পনার নির্দেশ দিয়েছেন। এক সূত্রের দাবি, “নকভি চান টুর্নামেন্ট যেনতেন প্রকারে অনুষ্ঠিত হোক। আফগানিস্তান না এলে অন্য দেশকে বিকল্প ভাবা হচ্ছে।”
এর মধ্যেই খবর, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা জানুয়ারি মাসে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে পারে, যদি এই ত্রিদেশীয় সিরিজ বাতিল হয়। যদিও সেক্ষেত্রে আবার বিপদে পড়বেন বেশ কিছু পাকিস্তানি ক্রিকেটার, কারণ সেই সময় তাঁদের বিগ ব্যাশ লিগে (BBL) খেলার কথা। তা ছাড়া এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (ACC) চেয়ারম্যান হিসেবে নকভি আগেই বিতর্কে জড়িয়েছেন, বিশেষ করে এশিয়া কাপ (Asia Cup 2025) ফাইনালে ট্রফি নিয়ে ভারতীয় দলের সঙ্গে বিরোধের পর। শোনা যাচ্ছে, বিসিসিআই (BCCI) এখন এএসসি-তে তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে চলেছে। এই অস্থিরতার মধ্যেই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ক্রিকেটীয় সম্পর্ককে আরও তিক্ত করছে। অর্থাৎ একদিকে সীমান্তে ধোঁয়া আর আগুন, অন্যদিকে ক্রিকেটে সন্দেহ আর শীতলতা। বল আর বুলেটের এই যুদ্ধে হারিয়ে যাচ্ছে সেই ক্রিকেট-বন্ধুত্ব, যা একসময় এই দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে মানবিক দিক বলে মনে করা হত।