চাপ একদিনে আসে না। প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি স্পেল, প্রতিটি ওভারে বাড়তে বাড়তে একসময় শরীরের সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। ২০২২ সালে পিঠের চোটের পর বুমরাহকে প্রায় ১১ মাস আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে থাকতে হয়েছিল। তা নিছক ‘একটা চোট’ নয়, ছিল বড়সড় বিপদের আগাম সতর্কবার্তা।

জসপ্রীত বুমরাহ
শেষ আপডেট: 12 August 2025 18:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিদ্যুৎ অপূর্ব, মনোহর। কিন্তু বিপজ্জনক। ঠিক যেমন জসপ্রীত বুমরাহর বোলিং অ্যাকশন!
দিল্লির শীতের সকাল। নেটে বল হাতে বুমরাহ। ছোট রান-আপ। তারপর অল্প জাম্প দিয়ে পায়ের গতি হঠাৎ বেড়ে যাওয়া। ঘুরে উঠল কাঁধ। তারপর কবজির মোচড়ে বল ছিটকে বেরনোমাত্র মুহূর্তের মধ্যেই উড়ে গেল স্টাম্প!
প্র্যাকটিসের এই ছবি, চিরচেনা দৃশ্য টেস্টে, ওয়ান ডে-তে আকছার দেখা গিয়েছে। যদিও এর আড়ালে রয়েছে এক অদৃশ্য যুদ্ধ—যেখানে প্রতিটি ডেলিভারিতে সীমার বাইরে বেরিয়ে লড়তে হয়েছে শরীরকে। ফিটনেস ধরে রাখা হয়ে উঠেছে বেজায় মুশকিল। তবু অ্যাকশন পাল্টাননি বুমরাহ। একই ঠাট বজায় রেখে বছরের পর বছর লং স্পেল করে গিয়েছেন।
তাঁর অ্যাকশন ক্রিকেটের প্রচলিত ছাঁচের বাইরে। গড়পড়তা ফাস্ট বোলার লম্বা রান-আপে গতি জমায়, যাতে ধাক্কা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে কিছুটা ছড়িয়ে যেতে পারে। বুমরাহর রান-আপ মাত্র ১০-১২ পদক্ষেপ। অথচ শেষ কয়েক ধাপে বিস্ফোরণশক্তি আকাশছোঁয়া। এই গতি আসে মূলত হিপ রোটেশন আর ফ্রন্ট-অন রিলিজ পয়েন্ট থেকে। শরীরের ঊর্ধাংশ (কাঁধ) আর নিম্নভাগ (পেলভিস) একসঙ্গে ঘুরপাক না খেলে এই ‘টুইস্ট’ মুহূর্তে কোমরের নিচের হাড়ে মারাত্মক চাপ ফেলে!
বায়োমেকানিক্স বলছে, এই ধরনের ‘মিক্সড অ্যাকশন’, যেখানে সাইড-অন ও ফ্রন্ট-অন উপাদান একসাথে থাকে, তা চোট-আঘাতের সবচেয়ে বড় কারণ। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট সায়েন্স রিসার্চে দেখা গিয়েছে, ১৫-২০ বছরের মধ্যে যে ফাস্ট বোলাররা মিক্সড অ্যাকশন ব্যবহার করেছেন, তাঁদের মধ্যে লুম্বার স্পাইন স্ট্রেস ফ্র্যাকচারের হার প্রায় দ্বিগুণ। রান-আপ বড় হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ আফ্রিকার শন পোলককে কেরিয়ারের মাঝামাঝি সময়ে একই সমস্যায় ভুগতে হয়েছিল। বুমরাহর ক্ষেত্রে রান-আপ খাটো হওয়ায় শরীরের ধাক্কা কম সময়ে অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত হয়।
আর এখানেই দানা বাঁধে আসল বিপদ। কারণ, এই চাপ একদিনে আসে না। প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি স্পেল, প্রতিটি ওভারে বাড়তে বাড়তে একসময় শরীরের সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। ২০২২ সালে পিঠের চোটের পর বুমরাহকে প্রায় ১১ মাস আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে থাকতে হয়েছিল। তা নিছক ‘একটা চোট’ নয়, ছিল বড়সড় বিপদের আগাম সতর্কবার্তা।
তবে অ্যাকশনকেই পুরো দায় দেওয়াটা ভুল। চোটের আড়ালে থাকে অনেক কারণ।
প্রথমত—ওয়ার্কলোড। যেটা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিস্তর চর্চা চলছে। বুমরাহ গত কয়েক বছরে টেস্ট, ওডিআই, টি-টোয়েন্টি, আইপিএল—প্রায় সব খেলেছেন, নিরবচ্ছিন্নভাবে মাঠে নেমেছেন। এক ফরম্যাট থেকে অন্য ফরম্যাটে বলের দৈর্ঘ্য, গতি, লোড—সব বদলায়, কিন্তু শরীর মানিয়ে নেওয়ার সময় পায় না।
দ্বিতীয় কারণ—রিকভারি টাইমের অভাব। ফাস্ট বোলারদের প্রতিটি ম্যাচের পর অন্তত ৪৮ ঘণ্টা শরীরের পেশি মেরামতির (টিস্যু রিপেয়ারের) সময় দরকার। সেটা না পেলে ছোট ছোট আঘাত জমে বড় আকার ধারণ করে। যে কারণে, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড ‘ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট’ নীতি চালু করেছে। এবার থেকে ঠিক হয়েছে, বুমরাহর কেরিয়ার দীর্ঘায়িত করতে তাঁকে বড় সিরিজ বা টুর্নামেন্টের আগে হাতেগোনা ম্যাচে নামানো হবে। পালটা পক্ষের দাবি, এতে ম্যাচ-ফিটনেস নষ্ট হয়। যদিও আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্স ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের পক্ষে। একবাক্যে মেনে নিয়েছে—এটাই দীর্ঘ কেরিয়ারের সঠিক পন্থা, আসল চাবিকাঠি।
তাহলে বুমরাহর ক্ষেত্রে আশু সমাধান কী?
প্রথমত, ভারতীয় দলের তারকা পেসারের অ্যাকশনে বড়মাপের পরিবর্তন আনা যাবে না। কারণ ওটাই তাঁর আসল অস্ত্র। তবে সূক্ষ্ম টেকনিক্যাল এডজাস্টমেন্ট, যেমন: রিলিজের সময় শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখা কোমরের চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, কোর স্ট্রেংথ ট্রেনিং—শক্তিশালী অ্যাবডোমিনাল ও ব্যাক মাসল স্পাইনকে সাপোর্ট দেয়।
তৃতীয়ত, স্পেল ম্যানেজমেন্ট—টেস্টে একটানা ৬-৭ ওভারের বেশি বোলিং না দেওয়া, টি-টোয়েন্টিতে ছোট কিন্তু কার্যকরী স্পেল করানো।
চতুর্থত, রিকভারি প্রটোকল—আইস বাথ, ফিজিওথেরাপি, সঠিক ডায়েট এবং ঘুমের শৃঙ্খলা মেনে চলা।