সাদা-কালো থেকে রঙিন, দুই যুগের চলচ্চিত্রেই বঙ্কিম ঘোষ ছিলেন পরিচিত মুখ।

বঙ্কিম ঘোষ । গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 5 June 2025 16:41
বঙ্কিম ঘোষ এক অনালোচিত অভিনেতা, যিনি ২০২২ সালে নীরবে পার করলেন জন্মশতবার্ষিকী। সিনেমা জগতের কেউই মনে করলেন না তাঁকে। কিন্তু 'গল্প হলেও সত্যি' ছবির সেই স্কুলমাস্টার সেজো ভাইটিকে কি ভোলা যায়? সেজদার চরিত্রে তিনি প্রতিটি বাঙালির মনে এক আইকনিক মুখ। কী বলিষ্ঠ তাঁর অভিনয়!
স্বর্ণযুগ থেকে নয়ের দশক অবধি বহু ছবিতেই তিনি অভিনয় করেছেন দারুণ দক্ষতার সঙ্গে। কিন্তু এমন একটি রত্ন অভিনেতা কখনওই কদর পেলেন না ফিল্ম সমালোচকদের কাছে। অনুপকুমার, রবি ঘোষের জমানাতেই বঙ্কিম ঘোষের অভিনয় সাম্রাজ্য, কিন্তু তিনি সেই অর্থে প্রচারের আলো পাননি। হরেক রকমের চরিত্র করেছেন, কখনও ভিলেন, কখনও কমেডি। তবে কুচক্রী ও লোলুপ ভিলেন চরিত্রেই তিনি কিছুটা টাইপকাস্ট হয়ে গিয়েছিলেন।

২২ অক্টোবর ১৯২২ সালে কলকাতায় বঙ্কিম ঘোষের জন্ম। ওরিয়েন্টাল অ্যাকাডেমি থেকে পড়াশোনা শেষ করে, ভর্তি হন কলকাতার সিটি কলেজে। অভিনয়প্রীতি ছোট থেকেই। পড়াশোনা শেষ করার আগেই মঞ্চে চলে আসা। 'আনন্দ ভারতী’, ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’, ‘রূপকার’ এবং ‘আনন্দলোক’-সহ তৎকালীন বিভিন্ন নাটকের দলে তিনি অভিনয় করেছেন।
বঙ্কিমের এই অভিনয় প্রীতি তাঁর বাড়ির লোকরা ভাল চোখে দেখতেন না। অভিনয় চালিয়ে যাবেন বলেই বাড়ি ছাড়তে হয় বঙ্কিম ঘোষকে। তবে অভিনয়কে একমাত্র পেশা তিনি করেননি। কারণ ফিল্মে বা নাটকে অভিনয় করে তাঁর সেই মাপের রোজগার হত না। প্রথম দিকে গ্রিন্ডলেস অ্যান্ড কোং, তারপর যাদবপুর ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস এবং কলকাতা হাইকোর্ট-সহ বিভিন্ন জায়গায় করণিক পদে চাকরিও করেছেন বেশ কিছু বছর।
অভিনয়ের পাশাপাশি ফুটবল, বক্সিং ও শরীরচর্চায় গভীর ভাবে আগ্রহী ছিলেন। ছোট বেলায় টানা পাঁচ বছর বেঙ্গল বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপও জিতেছিলেন বঙ্কিম ঘোষ, যা কেউই আর মনে রাখেননি। তবে রবি ঘোষ বা বঙ্কিম ঘোষের মতো বলিষ্ঠ অভিনেতারা ব্যায়ামবীর ছিলেন। কিন্তু ওঁদের নায়কোচিত চেহারা বা সুন্দর মুখশ্রী না হওয়ার জন্যই কখনও নায়ক চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ ঘটেনি।

'৪২', 'আনন্দমঠ' ছবির পরিচালক হেমেন গুপ্ত প্রথম দিকে ছিলেন বঙ্কিম ঘোষের প্রতিবেশী। তিনিই তাঁর 'ভুলি নাই' ছবিতে বঙ্কিম ঘোষকে ছোট চরিত্রে অভিনয় করতে বলেন। সে অনুরোধ ফেরাননি তিনি। এরপর ১৯৬১ সালে সুশীল ঘোষের ‘দিল্লি থেকে কলকাতা’ ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে নজর কেড়ে নেন বঙ্কিম ঘোষ।
সত্যজিৎ রায়ের 'চিড়িয়াখানা' ও 'চারুলতা' ছবিতেও ছিলেন তিনি। উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, অপর্ণা সেন-- বহু স্টারের সঙ্গে অভিনয় করেন তিনি। সাদা-কালো থেকে রঙিন, দুই যুগের চলচ্চিত্রেই বঙ্কিম ঘোষ ছিলেন পরিচিত মুখ।
তবে তাঁর সেরা কাজ, তপন সিংহের 'গল্প হলেও সত্যি'। একান্নবর্তী পরিবারের সেজ খোকা তিনি। স্কুল মাস্টার। ভারতী দেবীর মতো অভিনেত্রী বঙ্কিম ঘোষের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন। বঙ্কিম ঘোষের বিখ্যাত সংলাপ ছিল 'কলতলায় আমি পা পিছলে পড়লে তোমাদের এই সেজো বৌ ছাড়া আমাকে তো আর কেউ তুলতে আসবে না।' ছবিতে ছায়া দেবী হন তাঁর বড় বৌদি। ছায়া দেবী, রবি ঘোষ বা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতার সঙ্গে সমান টক্কর দিয়ে অভিনয় করে মন জিতে নেন বঙ্কিম ঘোষ।
স্নেহময় ভৃত্যের ভূমিকায় নজর কেড়েছিলেন, 'বাবা তারকনাথ' ছবিতে। সাপে কাটা বিশ্বজিৎকে বাঁচাতে সুধা সন্ধ্যা রায়ই শুধু বাঁক কাঁধে পতিব্রতা স্ত্রীর প্রমাণ দেননি, বঙ্কিম ঘোষ তারকনাথের মন্দিরে ঘণ্টা বাজিয়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছিলেন। এক অনবদ্য মর্মস্পর্শী অভিনয়।

'স্বয়ংসিদ্ধা' ছবিতে বঙ্কিম ঘোষের বাগানে মিঠু মুখার্জীর ফল চুরি করতে যাওয়ার মজার দৃশ্য। আবার মিঠু মুখার্জীর শেষ ছবি 'আশ্রিতা' তেও বঙ্কিম ছিলেন। মিঠুর লিপে লতা মঙ্গেশকরের 'আজা নয় রাজা, আনি নয় রানি' গানে বঙ্কিম ঘোষ আর মনোজ মিত্রের অভিনয় নয়ের দশকে সবার মন জয় করে নিয়েছিল।
শিশু অধিকার নিয়ে একসময় খুব সরব ছিলেন বঙ্কিমবাবু। শিশুকল্যাণ গোষ্ঠীর কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৯২ সালের ৩ জুন ৭০ বছর বয়সে প্রয়াত হন এই অভিনেতা। মৃত্যুর আগে আগেই অভিনয় করেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষের 'হীরের আংটি' ছবিতে। বড্ড আগেই চলে গেছেন তিনি, তাই আরওই তাঁর কাজের মূল্যায়ন হয়নি। তবু নতুন ধারার পরিচালকের ছবিতেও তিনি তাঁর অভিনয়ের চিহ্ন রেখে গেলেন। 'হীরের আংটি'র সময় ঋতুপর্ণ ঘোষকে কেউ চিনত না, সেটাই প্রথম ছবি ছিল তাঁর। কিন্তু বঙ্কিম ঘোষ নবাগত পরিচালককে ফেরাননি। সেই ঋতুপর্ণর 'হীরের আংটি' দিয়েই বঙ্কিম ঘোষ নতুন ভাবে নতুন প্রজন্মের ভিতর জনপ্রিয় হলেন তাঁর মৃত্যুর পর।