রাজনৈতিক মিছিলে, মিটিংয়ে নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু নিজের ফ্যাশন ট্রেন্ড তৈরি করেছিলেন। বড় টিপ, ফুল হাতা চাপা ব্লাউজ সঙ্গে তাঁতের শাড়ি। যা তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আইকনিক আজও।

নয়না সুদীপ
শেষ আপডেট: 18 May 2025 20:23
নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে সুন্দর মুখের জোরে হয়ে গিয়েছিলেন বাংলা ছবির গ্ল্যামারাস অভিনেত্রী। সেখান থেকে সরাসরি চলে আসা রাজনৈতিক অঙ্গনে। রাজনীতিবিদ হিসেবেও সফল তিনি। একদম গরীব পরিবার থেকে জননেত্রী হয়ে ওঠার কাহিনি রীতিমতো রোমাঞ্চকর। সেই অভিনেত্রীর নাম নয়না দাস বন্দ্যোপাধ্যায়। যাঁর স্বামী নামী রাজনৈতিক নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগে তিনি নয়না দাস। একেবারেই গরীব পরিবারে জন্ম হয় সুন্দরী মেয়ের। যদিও ডানা কাটা পরী নয়না ছিলেন না। কিন্তু মুখ, চোখ, নাক ছিল ভীষণ কাটা কাটা।

পরিচালক তরুণ মজুমদার তখন নতুন মুখের মেয়ে খুঁজছিলেন। 'পথ ভোলা' ছবিতে পরিচিত মুখেদের সঙ্গে কয়েকটি নতুন মুখও নিলেন তরুণ মজুমদার। ভাগ্য যদি সহায় হয়, তাহলে সব হয়। সেই গরীব ঘরের মেয়ে যখন দশম শ্রেণীর ছাত্রী তখন চোখে পড়ে গেল তরুণ মজুমদারের। ১৯৮৬ সালে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে নায়িকা হলেন নবাগতা নয়না দাস। এই নয়না নামটাও শোনা যায় তরুণ মজুমদারের দেওয়া। সুন্দর চোখের জন্য 'নয়না' নাম হয় তাঁর। যেমন ভাবে তরুণ মজুমদার মহুয়া, দেবশ্রীর নামকরণ করেছিলেন। 'পথ ভোলা' ছবি ছিল নবাগত অভিষেক চট্টোপাধ্যায়েরও প্রথম ছবি। সাইকেল নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রসেনজিৎ আর নয়নার রোম্যান্টিক ডুয়েট
'সে দিন দুজনে দুলেছিনু বনে, ফুলডোরে বাঁধা ঝুলনা...'

কিন্তু এরপর আর কখনও প্রসেনজিতের বিপরীতে নায়িকা হবার সুযোগ পেলেন না নয়না।
তরুণ মজুমদারের ছবিতে সদ্য ফোটা কলি নয়নাকে দেখেই বীরেশ চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'সুরের আকাশে' ছবিতে নয়নাকে বেছে নেন। যদিও এই ছবিতে নায়িকা দেবশ্রী রায়। তাঁর ভাবী ননদের চরিত্রে ছিলেন নয়না দাস। নয়নার বিপরীতে ছিলেন অভিষেক চট্টোপাধ্যায়। 'জন্মদিনে কী আর দেব তোমায় উপহার' গানে নয়নাকে খুব মিষ্টি লেগেছিল। এরপর বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের 'তুফান' ছবিতেও গ্ল্যামারাস রোলে সুযোগ পান নয়না। পাশাপাশি পেশাদার রঙ্গমঞ্চেও ছড়িয়ে পড়েছিল নয়নার রূপের জোয়ার। 'কী বিভ্রাট' নাটকে অভিনয় করেন নয়না।

কিন্তু নায়িকা হিসেবে সাফল্য নয়নার কখনও আসেনি। প্রথমত নয়নার সঙ্গে মিল ছিল দেবশ্রী রায়ের। দেবশ্রী রায় আর শতাব্দী রায়ের কাছে চলে যেত বেশিরভাগ ছবি। সুন্দর মুখের অভিনেত্রী হয়েও নয়নার ভাগ্যবদল ঘটেনি। তীক্ষ্ণ, চোখ মুখ হয়েও নয়নাকে পরিচালকরা ঠিক মতো ব্যবহার করেননি। আসলে নয়না সুন্দরী কিন্তু সেই সৌন্দর্যে দহন করার ক্ষমতা ছিল না।
সুন্দরী হলেও অভিনয় ক্ষমতায় ধার কম ছিল। এক প্রযোজকের সঙ্গে সম্পর্কেও ছিলেন নায়িকা যার দৌলতে বেশ কিছু ছবি পেতেন। অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক অনেকের সঙ্গেই অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠলেও স্থায়ী হয়নি সম্পর্ক। সঠিক পরিচালকের হাতে পড়লে নয়না হয়তো উন্নতি করতে পারতেন কিন্তু সময় তাঁকে সে সুযোগ দেয়নি।
শেষে টলিউডের নায়িকার সঙ্গে আলাপ হয় কংগ্রেস দলের নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। পরিচয় থেকে পরিণয় হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ১৯৯১ সালে পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই সুদীপের সঙ্গে পঁচিশের কাছাকাছি নয়নার বিয়ে হয়ে গেল। সবাই বলল, একদম মিসম্যাচ জুটি। কিন্তু সেই দাম্পত্যে বিবাদের ছায়া পড়েনি কখনও।

নয়ের দশকের মাঝামাঝি নয়না দাস, অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অনিল চট্টোপাধ্যায় অভিনীত 'কানামাছি' ধারাবাহিক বিশাল হিট করেছিল কলকাতা দূরদর্শনে। সত্যি কথা বলতে, এই সিরিয়ালে দুর্দান্ত অভিনয় করেন নায়িকা নয়না। নয়নার পরনের ঢাকাই শাড়ি রীতিমতো ফ্যাশন ট্রেন্ড হয়ে গিয়েছিল। বিষ্ণু পালচৌধুরীর 'কনকাঞ্জলি' সিরিয়ালেও প্রধান চরিত্রে ছিলেন নয়না।
তবে এরপরেও বেশ কিছু ছবি করেছিলেন নয়না। তাপস পালের বিপরীতে 'সিঁথির সিঁদুর' সবথেকে চর্চিত ছবি। রাজা সেনের 'দেশ' ছবিতেও দেখা মেলে তাঁর।
এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান হল বাংলায়। ২০০১ সালে বউবাজার বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক হয়ে জয়ী হন নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়। সুদীপও তখন মধ্যগগনে। বারবার জয়ী প্রার্থী ছিলেন নয়না। কিন্তু হঠাৎই একদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দূরত্ব এসেছিল তাঁর। সুদীপও রাজনৈতিক ওঠাপড়ায় দেখেছেন অন্ধকার দিন। কিন্তু সিঁথির সিঁদুরের জোরে নয়না তাঁর নিরবচ্ছিন্ন দাম্পত্য বজায় রেখেছিলেন।

বামপন্থায় বিশ্বাসী তরুণ মজুমদার কিন্তু নয়নাকে ভোলেননি। নয়নার স্বামী বিরোধী দলের সাংসদ, নয়না নিজেও বিরোধী দলের বিধায়ক, তারপরও তরুণ মজুমদার একমাত্র যিনি নয়নাকে অভিনয়ে ফিরতে সাহায্য করেছিলেন।
দূরদর্শনে রবীন্দ্রনাথের 'চিরকুমার সভা' সিরিয়ালে তাপস পালের বিপরীতে মূল নায়িকা চরিত্রে নয়নাকে নেন তরুণ বাবু। এরপর ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত 'আলো' ছবিতেও ছোট্ট রোলে নয়নাকে অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে বহুদিন পর দেখা যায় পর্দায়। নিজের আবিস্কারকে তরুণ বাবু কখনও ভোলেননি। এখানেই তিনি বড় মনের মানুষ। প্রভাত রায়ের 'পিতৃভূমি' ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা মেলে নয়নার।
রাজনীতির মঞ্চে নেত্রী হতে গিয়ে নয়নার অভিনয় জীবনে অনেক খানি সময় কমে গিয়েছিল। যদিও তাঁকে ভাল সুযোগ দেননি কোনও পরিচালক। নায়কদের প্রথম পছন্দের নায়িকাও তিনি হতে পারেননি। একটা সময়ের পর, কাজ না পাবার কারণে হতাশায় ভুগতেন অভিনেত্রী। শোনা যায়, তাঁর এই মানসিক অবসাদ চোখে পড়ত সারা স্টুডিও পাড়ার। যে ভাবে নিজেকে ঘষেমেজে তৈরি করেছিলেন নয়না, সে কদর তো তিনি পাননি। বৃত্তের বাইরে থাকা এক নায়িকা হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
রাজনৈতিক মিছিলে, মিটিংয়ে নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু নিজের ফ্যাশন ট্রেন্ড তৈরি করেছিলেন। বড় টিপ, ফুল হাতা চাপা ব্লাউজ সঙ্গে তাঁতের শাড়ি। যা তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আইকনিক হয়ে ওঠে।
নয়না-সুদীপের সংসারে কালো ছায়া এসেছে বারবার, নয়না কোনদিনই মা হতে পারেননি, কিন্তু সংসারটা তিনি মন দিয়ে আগলে রেখেছেন। হাজার অবসাদের মাঝেও নয়নাকে দেখতে কখনও খারাপ লাগেনি ক্যামেরার সামনে। অন্য অভিনেত্রীদের তুলনায় নয়না নেত্রী হিসেবে অনেক এগিয়ে থাকবেন।

নয়নার লিপে একমাত্র সুপারহিট গান কিন্তু আজও ঘরেঘরে জনপ্রিয়। 'বলিদান' ছবিতে নেগেটিভ চরিত্রেও নয়না ভীষণ গ্ল্যামারাস ডান্স নাম্বার নেচেছিলেন। নয়নার লিপে ছিল ঊষা উত্থুপের সেই দমদার গান
'প্রেম জেগেছে আমার মনে
বলছি আমি তাই
তোমায় আমি ভালবাসি
তোমায় আমি চাই
উরি উরি বাবা কি দারুণ ... '