নয়ের দশকে 'ফায়ার' সেই নিষিদ্ধ হয়েই ছিল। গভীর রাতের কঠোর ভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ছবির তকমা পেয়েছিল 'ফায়ার'।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 23 June 2025 19:52
সময়টা নয়ের দশকের মাঝামাঝি। কেবল টিভির যুগ সবে সবে এসেছে। মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া কিছুই জানত না সাধারণ মানুষ। কলকাতায় ঋতুপর্ণ ঘোষ সবেসবে ছবি করতে শুরু করেছেন। কিন্তু তখন অন্যরকম ভালবাসার ছবি ঋতুপর্ণ করেননি। সেসময় এক অন্যরকমের ভালবাসার গল্প নিয়ে বলিউডে ছবি করলেন দীপা মেহতা। ছবির নাম 'ফায়ার'। দুই সমকামী নারীর গল্পে সত্যি সত্যি আগুন লেগে গেল সমাজে। ঢাক ঢাক গুড় গুড়ের মাঝেই ভালবাসার অন্ধকার দিকে প্রদীপের সলতে জ্বেলে আলো ধরলেন দীপা মেহতা।
দুই সই পাতানোর গল্প নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'চোখের বালি' লিখেছিলেন, কিন্তু সেই গল্পে এক পুরুষকে ঘিরে দুই নারীর গল্প আবর্তিত হয়েছিল। কিন্তু দুই নারীও তো দু'জন দু'জনকে ভালবাসতে পারে। সমাজের বাঁধন ভেঙে সেই লেসবিয়ান প্রেমের গল্প নিয়ে ১৯৯৬ সালে দীপা মেহতা করলেন 'ফায়ার'। দুই বিবাহিতা নারীকে কেন্দ্র করে গল্প, যারা স্বামীসুখ পেয়েও পূর্ণতা পায় না। অসমবয়সী দুই নারী পরস্পরের উষ্ণ সান্নিধ্যে খুঁজে পায় জীবনের সুখ আনন্দ।

REL
'ফায়ার' নয়ের দশকে ছিল বিপ্লব। তখন রামধনু রঙে সমপ্রেমী ভালবাসার শুরু হয়নি। এই জুন মাস প্রাইড মাস বলে চিহ্নিত হয়নি। শহরের পথে রামধনু প্রাইড ওয়ার্ক শুরু হয়নি। সমপ্রেম তখন অপরাধ। সেই সময় আগুনের মতো সমাজে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল 'ফায়ার' ছবির প্লট। শাবানা আজমি ও নন্দিতা দাস, দুই অভিনেত্রী মুখ্য চরিত্রে।
দুই নারীর একের অন্যের প্রতি আকর্ষণ নিয়ে ১৯৭৩ সালে 'সওদাগর' ছবিতে পদ্মা খান্নার লিপে আশা ভোঁসলের বিখ্যাত গান মনে পড়ে? 'সজনা হ্যায় মুঝে'! পদ্মার সেই স্নানের দৃশ্য আর এক মহিলা গাছের ফাঁক দিয়ে দেখছিলেন। যে দৃশ্য দেখে উত্তাল হয়ে ওঠে ঐ সময় জনতা। এ আবার কী বিকৃত মানসিকতার ছায়াছবিতে। কিন্তু সেই আকর্ষণ বিকৃত নয়, বরং স্বাভাবিক - তা সাড়ম্বরে ঘোষণা করল 'ফায়ার'। শাবানা আজমি ও নন্দিতা দাস, ভারতবর্ষের দুই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী এমন সাহসী রোলে অভিনয় করেছিলেন।

দেখতে দেখতে 'ফায়ার' ছবির ৩০ বছর পূর্ণ হতে চলল। সমকামী গল্পে ভারতীয় ছবিতে পথিকৃৎ ছিল 'ফায়ার'। ৩০ বছরে এসে শাবানা আজমি ভাগ করে নিলেন সামাজিক মাধ্যমে এখনকার লুকে তাঁর, নন্দিতা ও দীপার ছবি একসঙ্গে।
ছবির শেষে ইংরেজিতে সংলাপ ছিল শাবানা তাঁর স্বামী কুলভূষণ খারবান্দাকে বলছেন, বর তাঁর যে চাহিদা পূরণ করতে পারেন না, নন্দিতা সেটা পারে। সেই স্পর্শ, সেই রেশ স্বামীর প্রাত্যহিক স্পর্শে মধ্যবয়সী মহিলা খুঁজে পান না। গোপন কথা রইল না গোপনে। পর্দায় এমন সংলাপ যেন বাজ পড়ার মতো ছিল জনজীবনে। সমাজ, সংসার তুচ্ছ করে এই ভালবাসা সম্ভব? কিন্তু দুই নারী সেই ভিন্ন স্রোতেই গা ভাসিয়েছিলেন।
'ফায়ার' হিন্দি ছবি,তাতে ইংরেজি সংলাপ রাখা হবে কিনা তা নিয়ে দ্বিধা ছিল। কিন্তু প্রযোজক ববি বেদী এবং দীপা মেহতাকে শুটিংয়ের দু'দিন আগে বলেন ঐ সেম সেক্স ভালবাসার বিদ্রোহী সংলাপ শাবানার মুখে ইংরেজিতেই রাখা হয়। আর তারপর তো ইতিহাস। কিন্তু নয়ের দশকে 'ফায়ার' সেই নিষিদ্ধ হয়েই ছিল। গভীর রাতের কঠোর ভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ছবির তকমা পেয়েছিল 'ফায়ার'।

১৯৯৬ সালে 'ফায়ার' কতখানি প্রভাব ফেলেছিল জনমানসে? এই প্রসঙ্গে দ্য ওয়ালকে সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় বললেন 'যে সময় 'ফায়ার' রিলিজ করেছিল আমি তখন অনেকটাই ছোট। আমার মনে আছে 'টাইগার' বা 'রিগ্যাল' কোনও একটা সিনেমাহলে 'ফায়ার' ছবির পোস্টার আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেটা অবশ্যই সমকামের গল্প বলে, তাও আবার দু'জন মহিলার লাভস্টোরি। সমাজ মেনে নিতে পারেনি এই ছবির পোস্টার। তাও যেখানে কোনও অশ্লীলতা ছিল না। এক নারীর কাঁধে আর এক নারীর মাথা। কিন্তু দীপা মেহতা ভীষণ দৃপ্ত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তখন তো মানুষ সমপ্রেমের ব্যাপারটা কার্পেটের তলায় রাখতে বেশি পছন্দ করত। শুধু রেখে দেওয়া নয়, কার্পেটের তলায় দুরমুশ করে দেওয়া হত সমপ্রেমকে। একেবারেই নিষিদ্ধ। ঋতুপর্ণ ঘোষ শুরু করেছেন তখন ছবি করা। তবে হ্যাঁ লিঙ্গ বৈষম্য, সমকাম বা যৌনতার যাত্রাপথের অভিমুখ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে তখনও শুরু করেননি। দীপা মেহতা, মীরা নায়ারদের মতো পরিচালকদের পশ্চিমে শিল্পযাপন হয়েছিল। পশ্চিমে বহু আগেই সমপ্রেম পর্দায় এসে গিয়েছিল। তাই দীপা মেহতার ছবি তৈরির উৎস পথ অনেক আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। দুটি মেয়ের মধ্যে প্রেম হওয়া এবং তাঁদের একে অপরের সঙ্গী হয়ে ওঠা, এটা খুব সহজ ছিল না ঐ সময়ে দাঁড়িয়ে। ৩০ বছর পর এখন যদি আমরা 'ফায়ার' ফিরে আবার দেখি তাহলে দেখব যে যেটা গার্হস্থ্য হিংসা দিয়ে শুরু হয়েছিল সেটা আসলে চিরন্তন বন্ধুত্বের সূত্রপাত। প্রেম তো আজ আর লিঙ্গের সংজ্ঞার মধ্যে আবদ্ধ নেই।'

'সমকামী ভালবাসার শুরুটা ভারতীয় ছবিতে দীপা মেহতা করেছিলেন আর সেই সাহস নিয়ে কলকাতায় সমপ্রেমের জোয়ার আনলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। যদিও প্রথম বাংলা ছবিতে লেসবিয়ান প্রেম দেখান সুব্রত সেন 'নীল নির্জনে' ছবিতে। এরপর ঋতুপর্ণর হাত ধরে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'আরেকটি প্রেমের গল্প', সঞ্জয় নাগের 'মেমোরিজ ইন মার্চ' বা ঋতুপর্ণর নিজের 'চিত্রাঙ্গদা'।