আটের দশকে দেবিকা মুখোপাধ্যায় সাদা লাল পাড় শাড়ি পরে পুজোর ডালা হাতে কালীঘাট মন্দির থেকে ফিরছিলেন। সেই বেশে দেবিকাকে দেখে অঞ্জন চৌধুরী বলেন 'এই তো আমি আমার ছোট বউ পেয়ে গিয়েছি।'

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 30 June 2025 19:11
১৯৮৮ সালের 'রথযাত্রা'র দিন মুক্তি পেয়েছিল অঞ্জন চৌধুরীর 'ছোট বউ'। আটের দশকের সুপারস্টার ডুপার হিট ছায়াছবি। আটপৌরে বাঙালি একান্নবর্তী পরিবারের রোজকার গল্পেই বক্সঅফিসে সোনা ফলিয়েছিলেন টালিগঞ্জ পাড়ার অন্নদাতা অঞ্জন চৌধুরী। তাঁর কলমের প্রতিটি সংলাপ মারকাটারি এমন হিট হয় যে 'ছোট বউ' ছবির ডায়লগের ক্যাসেট ছিল হটকেক। এখনও নেটদুনিয়ায় অঞ্জন চৌধুরীর কলমের সংলাপ বিশাল জনপ্রিয়। 'ছোট বউ' হিট করার পরেই নয়ের দশক জুড়ে একের পর এক 'বউ' নামে ছবি বানাতে শুরু করেন অঞ্জন চৌধুরী। 'মেজ বউ', 'বড় বউ, 'সেজ বউ'প্রতিটি ছবি সুপারহিট হতে শুরু করে। ইন্ডাস্ট্রিতে অঞ্জন চৌধুরীর নাম হয়ে যায় 'বউ' সিরিজ মেকার'।
রোববার ২৯ শে জুন অঞ্জন চৌধুরীর ছোট মেয়ে রিনা চৌধুরীর পরিচালনায় নতুন ছবি 'সোহাগ' রাত'-এর ২৫ দিন সেলিব্রেশন ছিল।এদিন রিনার ডাকে এত বছর পর একসঙ্গে হাজির হলেন অঞ্জন চৌধুরীর তিন বউ। বড় বউ রত্না সরকার, মেজ বউ চুমকি চৌধুরী আর ছোট বউ দেবিকা মুখোপাধ্যায়। এই প্রথম তিন সময়ের তিন বউ একসঙ্গে, বসলেন পাশাপাশি। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এ ঘটনা সত্যি ঐতিহাসিক। এক সময়কার কলকাতা দূরদর্শন কেন্দ্রের রাধা স্টুডিও এখন 'রাধা সিনেমা'। সেখানেই হল 'সোহাগ রাত' ছবির প্রদর্শন ও মিলনোৎসব।

অঞ্জন চৌধুরীর ঘরানার ছবিই বানিয়েছেন রিনা। তবে রিনার এই ছবি লাভস্টোরি। অশুভর বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয় আর মায়ের গল্প। মায়ের ভালবাসায় হিন্দু-মুসলিম ভেদ হয় না।
আটের দশকে দেবিকা মুখোপাধ্যায় সাদা লাল পাড় শাড়ি পরে পুজোর ডালা হাতে কালীঘাট মন্দির থেকে ফিরছিলেন। সেই বেশে দেবিকাকে দেখে অঞ্জন চৌধুরী বলেন 'এই তো আমি আমার ছোট বউ পেয়ে গিয়েছি।' দেবিকা, সন্ধ্যা রায়, মীনাক্ষী গোস্বামী, সংঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়, কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ ও রঞ্জিত মল্লিক সবাইকে নিয়ে গেরস্ত পরিবারের গল্প। সেই গল্পের রেশ, আমেজ এখনও বঙ্গজীবনে শান্তির জলের মতো। যে স্বাদ, গন্ধ এখনকার বাংলা ছবিতে পায় না দর্শক।

রিনা চৌধুরী অকপটে বললেন ' ওঁরা তিনজনে এখন আর খুব একটা বেরোন না। কিন্তু আমার কথা রেখে এসেছেন । বাবা তিন বউয়ের চরিত্র এমন ভাবেই তৈরি করে দিয়েছিলেন যে রত্না সরকারকে দেখলে মনে হবে না ছোট বউ, দেবিকাদিকে দেখলে মনে হবে না মেজো বউ বা আমার দিদিকে দেখলে মনে হবে না ও বড় বউ। বাবা বউ সিরিজ করেছেন বটে কিন্তু প্রতিটা গল্প প্রতিটার থেকে আলাদা। আমার ছবি 'সোহাগ রাত'ও আলাদা। কিন্তু বাবার মতো সংলাপে ছন্দমিল আমার ছবিতেও আছে।
বাবার ছবির সংলাপের জনপ্রিয়তা এখনও সবার সেরা। আমি সেদিন একজন ইউটিউবার মেয়ের ব্লগ দেখছিলাম। সে বাড়িতে কচুর শাক ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে রান্না করেছে। সে বলছে জানেন তো কচুর শাক করলেই অঞ্জন চৌধুরীর 'ছোট বউ' ছবির কথা মনে পড়ে। আমি তখন অবাক হয়ে ভাবছি ছোট বউ হয়েছিল সেই ১৯৮৮ তে, আর এখনকার মেয়েরা সেই ছবির কথা বলছে। যারা হয়তো তখন জন্মায়নি, কিন্তু বাবার ছবি দেখে আজও। এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে।'
এদিন মেজ বউ চুমকি চৌধুরীও হাসিমুখে স্নিগ্ধ রূপে উপস্থিত ছিলেন। বললেন 'বাবার হাত ধরেই আমার এই সিনেমা জগতে আসা। বাবা আমাকে তৈরি করেছেন। আমি মেজ বউ আর সেজ বউ দুটো চরিত্রই করেছি। প্রতিটি বউকেই যে মানুষ মনে রেখেছেন সেটাই তো অঞ্জন চৌধুরীর ম্যাজিক।'

ছবি শেষে আমন্ত্রিত অতিথিদের আহারাদির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দেখে মজা করে বড় বউ রত্না সরকার বললেন 'বড় বউ তো নিজে কিছু খায় না। বাড়ির সবাইকে রেঁধেবেড়ে দিয়ে হাঁড়িতে বড় বউয়ের জন্য আর এক দানাও ভাত থাকে না।' অঞ্জনের যে ফর্মুলা মেনে একের পর এক ছবি, সিরিয়াল করেছেন অন্য পরিচালকরাও।
ছোট বউ দেবিকা লাস্যে আজও আগুন লেগে যায় যেন। তেমনই তাঁর আদা। তবে এখনকার দেবিকার ভিতর মাতৃত্বের পরশ অনেক বেশি। ছোট বউ বললেন 'ছোট বউ ছবি তো শেষ হবার নয়। যখন পৃথিবীতে আমিও থাকব না তখনও ছোট বউ চলবে। এটা গল্পের জন্য, এটা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর জন্য। এই গল্পে সেন্টিমেন্ট আছে। যারা ঘর-সংসার করতে ভালবাসেন তাদের যুগেযুগে এই ছবি ভাল লাগবে। একটা মেয়ের কাছে লাল পাড় সাদা শাড়ি খুব মূল্যবান ,দামি গয়নার থেকেও। আমি তো ঐ শাড়ির জন্যই ছোট বউ হতে পারলাম। আর আজ আমরা তিন বউ এক হয়েছি সেটা যে কী ভাল লাগছে। যেন ওপর থেকে অঞ্জনদা দেখছেন।'

সবশেষে একান্তে জানলাম রিনা চৌধুরীর মনের কথা। সেই 'পূজা' এখনও একই রকমের প্রাণশক্তিময়ী। রিনা বললেন 'আমার বাবা অঞ্জন চৌধুরী 'বউ সিরিজ' বানাতেন বলে সবাই হাসি, ঠাট্টা করত। কিন্তু সবথেকে হিট হত বাবার বউ নামের ছবিগুলোই। বাবা চলে যাবার পর তো বউ সিরিজ বন্ধ হয়ে গেল। আমি সেই বৌ সিরিজের ছবি আবার বানাতে চাই। সেই 'বউ"থেকেই আবার শুরু করব। শুধু তাই নয়, আজ তিন বৌকে একসঙ্গে দেখে আমি ভেবে ফেলেছি এই তিন বৌকে নিয়েই একটা ছবি করব। বড় বৌ, মেজ বৌ আর ছোট বৌ, থাকবেন এবার আমার ছবিতে। আমি অনুরোধ করলে জানি ওঁরা তিনজন ফেরাবেন না। তিনজনের কামব্যাক একসঙ্গে এবার।'

অঞ্জন চৌধুরীর জীবিতকালে তিন বউ কিন্তু কখনও একসঙ্গে হননি। হবার সুযোগ হয়নি। এই মাহেন্দ্রক্ষণ সত্যি অভূতপূর্ব। রিনা চৌধুরী সেই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন। ছোট বউ দেবিকা যেমন প্রথম দেখলেন বড় বউ রত্না সরকারকে। রত্নাও তাই। এই মিলনমেলাতে যেন একটা একান্নবর্তীর ছবি ভেসে উঠল। ঐ ক্ষণটা যেন অঞ্জন চৌধুরী তাঁর সোনার কলম দিয়ে লিখে দিলেন। অভিনেত্রীর পর পরিচালক রিনা চৌধুরীর ছবিতে এবার তিন অভিনেত্রীকে একসঙ্গে দেখার পালা, যা হবে বাংলা ছবির ঐতিহাসিক মূহুর্ত।