দেশজুড়ে রুপোর দামে নজিরবিহীন বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও শিল্প চাহিদার জেরে প্রতি কেজি রুপো ২ লাখের দোরগোড়ায়।

ছবি AI
শেষ আপডেট: 16 December 2025 16:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত কয়েকদিন ধরেই দেশীয় বাজারে রুপোর দামে (Silver Price) পারদের মতো চড়া গতি দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, এই মূল্যবান সাদা ধাতু দ্রুতই প্রতি কেজি ২ লাখ টাকার ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা ও সম্ভাবনা—দুটিই তৈরি হয়েছে। সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে বড় বিনিয়োগকারী—সবার নজর এখন রুপোর এই অস্থির দামের গতিপথের দিকে।
আন্তর্জাতিক বাজারে লাগাতার অস্থিরতা, পাশাপাশি ভারতের বাজারে সোনার সঙ্গে সঙ্গে রুপোর গয়না ও শিল্পক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান চাহিদা—এই দুইয়ের যুগলবন্দিতেই মূলত রুপোর দামে এমন অভাবনীয় উত্থান ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—রুপো কি সত্যিই ২ লাখ টাকার গণ্ডি পেরিয়ে যাবে, নাকি এই ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা এখানেই থামবে?
রুপোর দামের নতুন রেকর্ড
ভারতীয় বাজারে রুপোর দাম ইতিমধ্যেই এক নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে। এই মূল্যবান সাদা ধাতুটির দর ভেঙেছে সমস্ত পূর্ববর্তী রেকর্ড, পৌঁছেছে সর্বকালের সর্বোচ্চ স্তরে। দেশের বিভিন্ন বড় শহরে বর্তমানে প্রতি কেজি রুপোর দাম ২ লাখ টাকার কাছাকাছি, এমনকি কোথাও কোথাও সেই সীমা অতিক্রমও করেছে।
উদাহরণস্বরূপ, গত ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে চেন্নাইতে রুপোর দাম ছিল প্রতি কেজি ২,০৯,০০০ টাকা। দিল্লিতে এই দাম দাঁড়ায় ২,০১,০০০ টাকা। মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুতে রুপোর দর প্রায় ১,৯৯,৯০০ টাকায় পৌঁছেছিল। অন্যদিকে, মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ (MCX)-এ রুপোর ফিউচার চুক্তি প্রতি কেজি ২,০০,৩৬২ টাকায় লেনদেন হয়েছে, যা বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা।
চলতি বছরের শুরু থেকেই রুপোর দামে যে উত্থান শুরু হয়েছে, তা নজিরবিহীন। বছরের শুরুতে প্রতি কেজি রুপোর দাম ছিল প্রায় ৮৯,৭০০ টাকা। ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে সেই দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১,৯৪,৪০০ টাকায়। অর্থাৎ, প্রায় ২১৬ শতাংশ বৃদ্ধির রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
অন্য একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চলতি বছরে রুপোর দাম ১১৫ শতাংশ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা গত ৪৬ বছরের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এই অভূতপূর্ব মূল্যবৃদ্ধি বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ ক্রেতা—দু’পক্ষের মধ্যেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রুপোর দাম বাড়ার কারণ
রুপোর দামে এই অসাধারণ উত্থানের পিছনে একাধিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ নিচে তুলে ধরা হলো—
শিল্পক্ষেত্রে বাড়তি চাহিদা:
আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তিতে রুপো এখন একটি অপরিহার্য ধাতু। বিশেষ করে সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV), ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার, মোবাইল ও ল্যাপটপ তৈরিতে রুপোর ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী রুপোর মোট চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি আসে শিল্প খাত থেকেই।
২০২৩ সালে ভারতে রুপোর চাহিদা ২,৬০০ মেট্রিক টনেরও বেশি ছাড়িয়েছে, যা ভারতকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রুপো ব্যবহারকারী দেশে পরিণত করেছে।
সরবরাহের অভাব:
বিশ্ববাজারে রুপোর উৎপাদন ও সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম থাকায় দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ:
অস্থির বিশ্ব অর্থনীতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে রুপোর প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।
ভারতীয় টাকার দুর্বলতা:
রুপির অবমূল্যায়নের ফলে আমদানি নির্ভর রুপোর দাম ঘরোয়া বাজারে আরও বেড়েছে।
বিনিয়োগকারীদের ভাবনা
রুপোর দামের এই অবিশ্বাস্য উল্লম্ফন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ জাগিয়েছে। চলতি বছরে রুপো সোনার তুলনায় ভালো রিটার্ন দিয়েছে, যা এই ধাতুর প্রতি আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা সাধারণত কয়েকটি পথে রুপোয় বিনিয়োগ করে থাকেন—
ফিজিক্যাল রুপো, যেমন রুপোর বার বা কয়েন।
সিলভার ETF, যা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও ঝামেলাহীন বিনিয়োগ মাধ্যম।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। রুপোর দাম যেমন দ্রুত বাড়তে পারে, তেমনই হঠাৎ করে কমেও যেতে পারে। শিল্প চাহিদা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের উপর রুপোর দাম অত্যন্ত নির্ভরশীল। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, মোট পোর্টফোলিওর ২ থেকে ৫ শতাংশের বেশি রুপোয় বিনিয়োগ না করাই নিরাপদ।
ভবিষ্যৎ এবং বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, রুপোর দামের এই ঊর্ধ্বমুখী গতি আপাতত থামার কোনও লক্ষণ নেই। বিভিন্ন পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালের মধ্যে প্রতি কেজি রুপোর দাম ২.৪০ লাখ থেকে ২.৫০ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে। এমনকি কিছু বিশেষজ্ঞের দাবি, ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে ভারতীয় বাজারে রুপোর দাম ২.৪৫ লাখ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে।
এই মূল্যবৃদ্ধির পিছনে রয়েছে শক্তিশালী মৌলিক কারণ—বিশেষ করে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা। সবুজ শক্তি প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে রুপোর ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে চাহিদা বজায় রাখবে।
তবে স্বল্পমেয়াদে কিছু সংশোধনও দেখা যেতে পারে। উৎসবের মরসুম শেষ হলে বাজারের অস্থিরতা কমতে পারে এবং অনেক বিনিয়োগকারী লাভ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে দামের উপর চাপ তৈরি হতে পারে।