এদিকে, কাল থেকেই নতুন সপ্তাহ। সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনই, মঙ্গলবার, হোলি। শেয়ার বাজার বন্ধ থাকবে। ফলে বিনিয়োগকারীদের হাতেও কার্যত কম সময় থাকবে পদক্ষেপ করার। এমন পরিস্থিতিতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক সূচকও বাজারের দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ
স্বস্তির আবহ আগেই নড়বড়ে ছিল, তার ওপর সপ্তাহান্তের এই নতুন সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
স্বস্তিকা ইনভেস্টমার্ট লিমিটেডের গবেষণা বিভাগের প্রধান সন্তোষ মীনা বলেন, ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য দীর্ঘদিন ধরে অপরিশোধিত তেলের উচ্চ দাম বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে, রাজকোষের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে এবং সুদের হার কমানোর সম্ভাবনাও চাপে পড়তে পারে। তাঁর মতে, এই বাইরের ধাক্কা এমন সময়ে এসেছে, যখন বাজার প্রযুক্তিগত দিক থেকেও দুর্বল অবস্থায় ছিল।
সোমবারের লেনদেন শুরুর সময় বাজারে সতর্ক কিংবা নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যেতে পারে বলেই ধারণা তাঁর। ভূরাজনৈতিক চাপ ও তেলের উচ্চমূল্য—এই দুটি বিষয়ই বিনিয়োগকারীদের মনোভাবে প্রভাব ফেলবে।
অর্থনৈতিক তথ্যের দিকে নজর
শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিই নয়, দেশীয় অর্থনীতির একাধিক তথ্যও বাজারের গতিপথ ঠিক করবে। তৃতীয় ত্রৈমাসিকের জিডিপি পরিসংখ্যান এবং মাসিক গাড়ি বিক্রির তথ্য প্রকাশিত হবে। এর পাশাপাশি শিল্পোৎপাদন সূচক (IIP) ও পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (PMI) বাজারকে ইঙ্গিত দেবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি সম্পর্কে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চিন থেকে প্রকাশিত অর্থনৈতিক সূচক এবং অপরিশোধিত তেলের দামের গতিবিধি বিশ্ববাজারে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাকে প্রভাবিত করবে।
মীনার মতে, আপাতত সূচকের ওঠানামা নির্ধারণে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাই মুখ্য চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
তেলের দামে লাফ
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক লাফে প্রায় ২.৮৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৭২.৮৭ ডলারে পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে তেলের দামে।
ইনফোমেরিক্স রেটিংসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মনোরঞ্জন শর্মার মতে, আমেরিকা, ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা উত্তেজনা হঠাৎ করেই ফেটে পড়েছে শনিবার। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ধাক্কা খেয়েছে। ভারতের মতো দেশ, যা বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, সেখানে চড়া দামের কারণে মুদ্রাস্ফীতির চাপ দ্রুত বাড়তে পারে।
তিনি মনে করেন, বাজার সূচকগুলি নিম্নমুখী হয়ে লেনদেন শুরু করতে পারে এবং বিনিয়োগকারীরা নতুন করে ভূরাজনৈতিক ও পণ্যদ্রব্য-সংক্রান্ত ঝুঁকি মূল্যায়ন করবেন। ফলে ওঠানামা বাড়ার সম্ভাবনাও প্রবল।
আমদানিনির্ভর অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ
জিওজিত ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ ভি কে বিজয়কুমারের মতে, এই অশান্তির প্রভাব স্বল্পমেয়াদে নেতিবাচক হবেই। তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে, আর যদি তা দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তবে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ও চলতি হিসাবের ভারসাম্যে চাপ পড়বে। কারণ দেশের মোট তেল চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর।
তাঁর কথায়, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাজারে প্রভাবও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। পরিস্থিতি যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে, তাহলে ধাক্কা সীমিত থাকতে পারে। তবে আপাতত বাজার খুব নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই দেখাবে বলে তাঁর অনুমান।
আগের সপ্তাহের ধাক্কা
গত সপ্তাহেও শেয়ারবাজার চাপের মুখে ছিল। স্থায়ী ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং প্রযুক্তি খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়িয়ে দেয়।
বিএসই সেনসেক্স সূচক গত সপ্তাহে ১,৫২৭.৫২ পয়েন্ট বা ১.৮৪ শতাংশ পড়ে যায়। একই সময়ে নিফটি সূচক ৩৯২.৬ পয়েন্ট বা ১.৫৩ শতাংশ নেমে আসে।
রেলিগেয়ার ব্রোকিং লিমিটেডের গবেষণা বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অজিত মিশ্র বলেন, বাজারে চাপের আবহ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছিল, তার ওপর নতুন সংঘাত পরিস্থিতি বাড়তি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল
ইরান-ইজরায়েল সংঘাত শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই, তার অভিঘাত পৌঁছে যাচ্ছে আর্থিক বাজারেও। তেলের দাম, বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ, অর্থনৈতিক সূচক— সব মিলিয়ে সপ্তাহের শুরুতেই বাজারে চাপে লেনদেনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
এখন নজর থাকবে মূলত দুটি বিষয়ের দিকে। এই সংঘাত কতদিন চলে এবং তেলের দাম কোথায় গিয়ে স্থির হয়। সেই উত্তরই ঠিক করবে বাজারের পরবর্তী পথচলা।