কলকাতায় ২২ ও ২৪ ক্যারেট সোনার দামে বড় ওঠানামা। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে বিয়ের মরসুমে ক্রেতাদের বাড়ছে চিন্তা।

ছবি AI
শেষ আপডেট: 15 December 2025 14:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতার বাজারে সোনার দামে (Gold Price Hike) এই মুহূর্তে চরম অস্থিরতা চলছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। উৎসবের মরসুম ও আসন্ন বিয়ের অনুষ্ঠানের ঠিক আগেই এই লাগামহীন ওঠানামা মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চয়তার দিকে। গত কয়েকদিন ধরে কখনও সোনার দাম ঊর্ধ্বমুখী, আবার কখনও নিম্নমুখী হওয়ায় বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সাধারণ ক্রেতা—সকলেই বিভ্রান্তিতে ভুগছেন। বাজারের এই আকস্মিক পরিবর্তন শহরের ছোট-বড় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ পরিবারের বাজেটেও নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে।
সোনার দামে লাগাতার অস্থিরতা: কলকাতার বাজার পরিস্থিতি
ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে পৌঁছেও কলকাতার সোনার বাজারে অস্থিরতা কাটেনি। প্রায় প্রতিদিনই দামে চড়া উত্থান-পতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা বিনিয়োগকারী ও সাধারণ ক্রেতা—দু’পক্ষকেই উদ্বিগ্ন করে তুলছে। গত কয়েক মাস ধরেই হলুদ ধাতুর দাম মূলত ঊর্ধ্বমুখী। মাঝেমধ্যে সামান্য পতন দেখা গেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না।
১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, কলকাতায়
২৪ ক্যারেট সোনা (১০ গ্রাম): ১,৩৩,৯১০ টাকা
২২ ক্যারেট সোনা (১০ গ্রাম): ১,২২,৭৫০ টাকা
এর পরবর্তী দিনগুলিতেও দামের অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ডলারের দামের ওঠানামাই সোনার এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। পাশাপাশি উৎসব ও বিয়ের মরসুমে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে এই অস্থিরতা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
কেন বাড়ছে সোনার দাম? বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ
সোনার দাম বৃদ্ধির পেছনে একাধিক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির সোনা কেনা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক তাদের আর্থিক রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বিপুল পরিমাণে সোনা কিনছে। ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্কও (RBI) চলতি বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোনা সংগ্রহ করেছে, যা আন্তর্জাতিক চাহিদা ও দামের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
মুদ্রাস্ফীতির চাপ
মুদ্রাস্ফীতির সময় কাগজের মুদ্রার মান কমে যায়। ফলে বিনিয়োগকারীরা তাদের সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে সোনার দিকে ঝুঁকছেন, যা চাহিদা ও দাম—দুটোই বাড়াচ্ছে।
ডলারের দুর্বলতা
মার্কিন ডলারের মান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা বাড়লে বিভিন্ন দেশ তাদের রিজার্ভে সোনার অংশ বাড়ায়। এর ফলেও সোনার দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়।
সুদের হার সংক্রান্ত ইঙ্গিত
সুদের হার কমার সম্ভাবনা থাকলে সোনার মতো নন-ইয়েল্ডিং অ্যাসেট বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, যা দাম বাড়াতে সহায়ক।
ক্রেতাদের উপর প্রভাব: বিনিয়োগ থেকে বিবাহ
সোনার দামের এই লাগাতার অস্থিরতা সাধারণ মানুষের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ভারতে সোনা শুধু গহনা নয়, এটি বিনিয়োগ ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক।
বিবাহের মরসুমে উদ্বেগ
নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিয়ের মরসুমে সাধারণত সোনার চাহিদা বাড়ে। কিন্তু উচ্চ দামের কারণে বহু পরিবারকে গহনার বাজেট কমাতে হচ্ছে। অনেকেই গহনার ওজন বা আকার কমাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ দাম কমার আশায় কেনাকাটা পিছিয়ে দিচ্ছেন।
বিনিয়োগকারীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
আগে সোনা কিনে রাখা বিনিয়োগকারীরা এই মুহূর্তে লাভের মুখ দেখছেন। তবে নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য এত উচ্চ দামে সোনা কেনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও বিশেষজ্ঞরা এখনও সোনাকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবেই দেখছেন।
ছোট ব্যবসায়ীদের চাপ
গহনার দোকানদারদের মধ্যে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে ভারী গহনার চাহিদা কমলে ছোট ব্যবসায়ী ও কারিগরদের আর্থিক সংকটে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: ভবিষ্যৎ কী বলছে?
কোটাক সিকিউরিটিজের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে ২০২৬ সালের মধ্যে সোনার দাম প্রতি আউন্স ৫,০০০ ডলার ছুঁতে পারে। সেই হিসেবে ভারতে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম ১.৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ দিকে বিশ্ববাজারে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৪,৯০০ ডলার হতে পারে। একইসঙ্গে ব্যাংক অব আমেরিকাও ২০২৬ সালে সোনার দাম ৫,০০০ ডলার প্রতি আউন্স ছোঁয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতা, ডলারের দুর্বলতা ও সুদের হার কমানোর প্রবণতা বজায় থাকলে সোনার দামের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সাময়িকভাবে দাম কিছুটা কমতেও পারে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই সোনা একাধিকবার নতুন রেকর্ড গড়েছে।
সোনা কেনার আগে কী ভাববেন?
এই অস্থির বাজারে সোনা কেনার আগে ক্রেতাদের বাড়তি সতর্কতা জরুরি।
বাজার পর্যবেক্ষণ: আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারের গতিবিধি ভালোভাবে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি: বিনিয়োগের জন্য সোনা কিনলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা জরুরি।
বিশুদ্ধতা যাচাই: ক্যারেট ও হলমার্ক চিহ্ন অবশ্যই যাচাই করে নিতে হবে।
বিকল্প বিনিয়োগ: গহনা না কিনে ডিজিটাল গোল্ড, গোল্ড ETF বা গোল্ড বন্ডের মতো বিকল্পেও বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
সরকারের ভূমিকা ও বাজার নীতি
ভারত সরকার আমদানি শুল্ক ও বিভিন্ন নীতির মাধ্যমে সোনার বাজারকে প্রভাবিত করে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজার সোনার দামের মূল চালিকাশক্তি, তবুও দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিগুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া ধারাবাহিকভাবে সোনার মজুত বাড়াচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক। তবে একইসঙ্গে উচ্চ আমদানি ব্যয় রুপির উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।