গত সপ্তাহে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ১,৭৫১ কোটি টাকা ঢুকিয়ে শেয়ার বাজারে নতুন আশার সঞ্চার করেছেন। যদিও বছরের শুরু থেকে বাইরে নেওয়া তহবিল রয়েছে, তবু বিদেশি আকর্ষণ দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
.jpg.webp)
ছবি- এআই নির্মিত
শেষ আপডেট: 14 October 2025 19:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতীয় শেয়ার বাজারে (Indian Stock Market) বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফের বাড়ছে। গত কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলি ভারতের ইক্যুইটি মার্কেটে বড় অঙ্কের অর্থ ঢালোয়ায় সূচক বাড়ছে এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৃদ্ধির পথও সুগম হচ্ছে। এমন এক সময়ে যখন বিশ্বের অনেক বড় অর্থনীতি মন্দার মুখে, ভারতের প্রতি এই বিদেশি আকর্ষণ দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে, যা লক্ষ কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক গতিবিধি: যে সংখ্যাগুলো বলছে কাহিনি
ন্যাশনাল সিকিউরিটিজ ডিপোজিটরি লিমিটেড (NSDL)-এর তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১০ অক্টোবর, ২০২৫ সময়কালে ভারতীয় বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ১ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা নিটভাবে বিনিয়োগ করেছেন। এটি বেশ কিছু সপ্তাহ ধরেই চলা ধারাবাহিক বিক্রির পর একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
তবে মাসভিত্তিক চিত্র একটু মিশ্র। অক্টোবর মাসে মোট মিলিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ এই মূহূর্তে ২ হাজার ৯১ কোটি টাকার লোকসান দেখাচ্ছে। এর আগের মাসে, সেপ্টেম্বর-এ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিপুল পরিমাণ ২৩ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা তুলে নিয়েছিলেন। সামগ্রিকভাবে, ২০২৫ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে ১ লক্ষ ৫৬ হাজার ৬১১ কোটি টাকা শেয়ার তুলে নিয়েছেন।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জুন ২০২৫ পর্যন্ত), বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা মোট প্রায় ৯৫ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা ইক্যুইটি বিক্রি করেছেন। এর মধ্যে, অগস্টের ১৮ তারিখ পর্যন্ত তাদের বিক্রি ছিল ২২,১৮৩ কোটি টাকা, যা জুলাই-র ১৭,৭৪১ কোটি টাকার তুলনায় বেশি। তবে কিছুটা স্থিতিশীলতা লক্ষ করা গেছে—জুনে তারা ১৪,৫৯০ কোটি টাকা বিনিয়োগও করেছিল, যা এপ্রিলের ৪ হাজার ২২৩ কোটি ও মে মাসের ১৯ হাজার ৮৬০ কোটি বিনিয়োগের পর টানা তৃতীয় মাসের বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। এই অস্থিরতার সময় দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (DIIs) বাজারকে ধরেছে ও স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
কেন ভারতে বিনিয়োগের ঝোঁক বাড়ছে এবং কখন শঙ্কা থাকে?
বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে — কিছু বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করছে, আবার কিছু বিষয় তাদের সতর্কও করছে।
আকর্ষণের কারণগুলো:
শক্তিশালী অর্থনৈতিক বৃদ্ধি: ভারত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রাকৃতিক GDP বৃদ্ধির হার ৬.৪% অর্জন করে; এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৬.৩% থেকে ৬.৮% পর্যন্ত বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
নীতিগত স্থিতিশীলতা ও সংস্কার: 'মেক ইন ইন্ডিয়া'ের মতো উদ্যোগ ও উদার FDI নীতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে।
বৃহৎ বাজার ও তরুণ কর্মশক্তি: অভ্যন্তরীণ বাজারের আকর্ষণ ও যুবশক্তি বিদেশি মূলধনকে টেনে আনে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সুদ কমানো: রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI)-এর নীতিগত সিদ্ধান্ত, বিশেষত জুন ২০২৫-এ ৫০ বেসিস পয়েন্ট রেপো রেট কমানো, বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
অন্যান্য উদীয়মান বাজারের তুলনায় তুলনামূলক স্থিতিশীলতা: বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে ভারত অপেক্ষাকৃত আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগের কারণগুলো:
শেয়ারের উচ্চ মূল্যায়ন: বাজারের উচ্চ ভ্যালুয়েশন অনেককে মুনাফা তুলে নিতে প্ররোচিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধি: যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনীতি ও হার বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা US বন্ড ও শেয়ারে অর্থ সরিয়ে নিতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বাণিজ্য সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা (যেমন মার্কিন-চীন টেনশন) বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তোলে।
রুপির দুর্বলতা: ভারতের মুদ্রার অবমূল্যায়নও বিদেশি লগ্নি কমানোর একটি কারণ।
নীতিগত ও প্রশাসনিক জটিলতা: আইনি কাঠামো, বিনিয়োগ অনুমোদন প্রক্রিয়া ও কর নীতি সম্পর্কিত জটিলতা FDI আকর্ষণে বাধা হতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগের অর্থনীতিতে প্রভাব — সুবিধা ও ঝুঁকি
বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ (FPI)-এর কিছু ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট; তবু ঝুঁকিও রয়েছে—দুটোই বাজারের ওপর বড়ভাবে ফেরা দেখা যায়।
ইতিবাচক প্রভাব:
বিদেশি তহবিল শেয়ার ও বন্ড বাজারে তারল্য বাড়ায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে সাহায্য করে এবং ফলে টাকার মান শক্তিশালী হতে পারে। এছাড়া পুঁজি বাজার উন্নত হলে শেয়ারের দাম ও সূচকও উন্নতি পায় এবং বন্ডে বিনিয়োগ পরিকাঠামো উন্নয়নে কাজে লাগে।
ঝুঁকি ও দুর্বলতা:
FPI সাধারণত বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল; হঠাৎ বড় পরিমাণে তহবিল বেরিয়ে এলে বাজারে তীব্র অস্থিরতা ও রুপির দ্রুত পতন ঘটতে পারে। তাছাড়া FPI-র অনেকটাই সংক্ষিপ্তমেয়াদী আর লক্ষ্য থাকে দ্রুত মুনাফা; তাই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরাসরি অংশগ্রহণ FDI-র মতো হয় না। বিদেশি মূলধনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে বৈশ্বিক বাজারের চক্রের ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।
কোথায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি?
আশার খবর: বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেশ কিছু নির্দিষ্ট খাতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। জুন ২০২৫-এ আর্থিক পরিষেবা (Financials) খাতে প্রবাহে তারা প্রধানত ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ করেছেন। এর পাশাপাশি আগ্রহ বাড়ছে: তেল ও গ্যাস, IT & ITeS, বৈদ্যুতিক গতিশীলতা (e-mobility), ফিনটেক, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং মেডটেক। সরকারের নীতিগত উদ্যোগ, বিশেষত প্রোডাকশন-লিংকড ইনসেনটিভ (PLI) প্রকল্প এসব খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করছে।
ভবিষ্যৎ ভাবনা- ধীর কিন্তু ইতিবাচক সম্ভাবনা
বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ভারত দ্রুতবর্ধনশীল ও আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে টিকে আছে—এটাই বিশ্লেষকদের প্রধান মেসেজ। দেশের শক্তিশালী মৌলিক অর্থনৈতিক ফার্মাসিং, সংস্কারের দিকনির্দেশনা এবং অভ্যন্তরীণ শক্ত চাহিদা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে দীর্ঘমেয়াদী সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বিশ্ব বাজারের অবস্থা এবং দেশের নিজস্ব নীতিগত ধারাবাহিকতার উপর। বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত রাখতে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের অবদানও অপরিহার্য—তারা বিদেশি বিক্রির চাপ সামাল দিয়ে বাজারকে সহায়তা করছে। সরকারের উচিত হবে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, প্রশাসন সহজ করা এবং কর কাঠামো সংস্কার করে বিদেশি আস্থা ধরে রাখার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।