দুই লাখ ছুঁয়ে রুপোর দামে পতন। ১৫ ডিসেম্বরের সর্বশেষ দর, শহরভিত্তিক রেট ও বাজার বিশ্লেষণ জানুন।

ছবি AI
শেষ আপডেট: 15 December 2025 15:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় বাজারে রুপোর দামে বড়সড় পতন নজরে এসেছে। সম্প্রতি প্রতি কেজি দুই লাখ টাকার ঐতিহাসিক উচ্চতা ছুঁয়ে রেকর্ড গড়ার পরই আজ সকালে রুপোর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উৎসবের মরসুমের ঠিক আগে এই পতন কি সোনা-রুপোর ক্রেতাদের মুখে হাসি ফোটাবে, না কি বাজারের এই অস্থিরতা শুধুই সাময়িক—তা নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।
রুপোর দামে বড় পরিবর্তন: ২ লাখ ছুঁয়েই কেন পতন?
ভারতীয় বাজারে মূল্যবান ধাতু রুপোর দামে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা গেছে। অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে রুপোর দর প্রতি কেজি ২ লাখ টাকা ছুঁয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছিল। কিন্তু সেই উচ্চতা স্পর্শ করার পরই দামে পতন শুরু হওয়ায় বিনিয়োগকারী থেকে সাধারণ ক্রেতা—সকলের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, তবে কি বাজারে স্বস্তি ফিরছে?
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রুপোর দাম অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়ছিল। বিশেষ করে মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জে (MCX) রুপোর ফিউচার প্রতি কেজি ২ লক্ষ ৩৬২ টাকা রেকর্ড সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল। একই সময়ে চেন্নাই ও হায়দ্রাবাদের মতো শহরে রুপোর দাম প্রতি কেজি ২,০৭,০০০ থেকে ২,০৯,০০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। এই উল্লম্ফন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছিল।
তবে রেকর্ড ছুঁয়েই দ্রুত দামের পতন শুরু হয়। ১৫ ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, রুপোর দামে সামান্য হলেও নিম্নগতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পতন আপাতত সাময়িক হলেও এর পেছনের কারণগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দাম কমার পেছনের কারণ কী?
প্রথমত, দাম অত্যধিক বেড়ে গেলে বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তোলার জন্য বিক্রি শুরু করেন—যাকে বলা হয় প্রফিট বুকিং। এর ফলে বাজারে রুপোর জোগান বাড়ে এবং স্বাভাবিকভাবেই দাম কমে যায়। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারেও রুপোর সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। লন্ডন সিলভার মার্কেটে রুপোর জোগান বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ববাজারে ঘাটতি অনেকটাই কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়াও, উৎসবের মরসুম শেষ হওয়ার পর ভারতের বাজারে সোনা ও রুপোর চাহিদা কিছুটা কমে আসে, যা দামের উপর প্রভাব ফেলে। ডলারের ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। শক্তিশালী ডলার অনেক সময় মূল্যবান ধাতুর দাম কমায়, আবার ডলার দুর্বল হলে রুপো বিনিয়োগের জন্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে রুপোর দামে আরও কিছুটা সংশোধন হতে পারে। উৎসবের মরসুম শেষ হলে বাজারের অস্থিরতা কমার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাঁদের মতে, বর্তমান দাম অনেকটাই বেশি হওয়ায় একটি ‘টেকনিক্যাল কারেকশন’ অস্বাভাবিক নয়।
শিল্প খাতে রুপোর বাড়তি চাহিদা
দীর্ঘমেয়াদে রুপোর ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিল্প খাতে এর চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। রুপো এখন আর শুধুমাত্র গয়নার ধাতু নয়, আধুনিক প্রযুক্তির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সৌর প্যানেল ও সবুজ শক্তি উৎপাদনে রুপো অপরিহার্য
বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) শিল্পে রুপোর ব্যবহার বাড়ছে
ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
এআই প্রযুক্তি ও ডেটা সেন্টারে রুপোর প্রয়োজন
মোবাইল, ল্যাপটপ ও ডিজিটাল ঘড়ি তৈরিতেও ব্যাপক ব্যবহার
২০২৩ সালে ভারতে রুপোর চাহিদা ২,৬০০ মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে, যা বিশ্ববাজারে ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। বিশ্বব্যাপী রুপোর মোট চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি আসে শিল্প খাত থেকে। অথচ গত ৪–৫ বছর ধরে রুপোর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম, যার ফলে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪৯ মিলিয়ন আউন্স ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে অনুমান।
আজকের রুপোর দাম: কোথায় কত?
১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে ভারতের বিভিন্ন শহরে রুপোর দাম আগের রেকর্ড উচ্চতা থেকে কিছুটা কমেছে।
প্রতি কেজি রুপোর আনুমানিক দর:
কলকাতা: ₹১,৯৭,৯০০ – ₹১,৯৮,০০০
মুম্বাই: ₹১,৯৭,৯০০ – ₹২,০৪,০০০
নয়াদিল্লি: ₹১,৯৯,৯০০ – ₹২,০১,০০০
চেন্নাই: ₹২,০৭,০০০ – ₹২,০৯,০০০ (১৫ অক্টোবর থেকে প্রায় ₹৪২,৮০০ কম)
হায়দ্রাবাদ: ₹২,০৭,০০০ – ₹২,০৯,০০০ (১৫ অক্টোবর থেকে প্রায় ₹৪২,৮০০ কম)
এই দামগুলি বাজারভিত্তিক ও নির্দেশক মাত্র। বিভিন্ন বুলিয়ন ডিলার বা দোকানে দামের সামান্য তারতম্য হতে পারে। রুপো কেনার সময় দামের সঙ্গে GST ও TCS যোগ হবে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য বার্তা
রুপোর দামে এই ওঠানামা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। যারা উচ্চ দামে রুপো কিনেছিলেন, তারা স্বল্পমেয়াদে কিছুটা চাপের মুখে পড়তে পারেন। তবে দাম কমায় নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগও তৈরি হয়েছে।
আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের সোনা ও রুপোর মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে টানছে। সুদের হার কমলে ডলার দুর্বল হয়, ফলে মূল্যবান ধাতুর দাম বাড়ে। ডলারের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ায় অনেকেই এখন রুপোকে নতুন নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখছেন।
সব মিলিয়ে, আজ রুপোর দামে কিছুটা পতন হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর চাহিদা ও গুরুত্ব অটুট রয়েছে। তবে বিনিয়োগের আগে বাজার পরিস্থিতি ভালোভাবে বিশ্লেষণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।