আন্তর্জাতিক বাজার ও দেশীয় অর্থনীতির প্রভাবে আজ ভারতে রুপোর দামে বড় পরিবর্তন। দেখে নিন আপনার শহরের সর্বশেষ দর ও বিনিয়োগের নতুন দিকনির্দেশ।
.jpeg.webp)
শেষ আপডেট: 28 October 2025 13:27
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতজুড়ে রুপোর দামে দেখা যাচ্ছে এক নতুন চমক, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড়সড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আজ সকালে বাজার খুলতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রুপোর দরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। সাধারণ ক্রেতা থেকে বড় বিনিয়োগকারী—সবারই নজর এখন এই মূল্য পরিবর্তনের দিকে। আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও রুপোর দামে বড় ভূমিকা রাখছে। যারা এতদিন রুপোকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছিলেন, তাদের জন্যও এই পরিবর্তন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি ভবিষ্যতের বাজার প্রবণতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দেশজুড়ে রুপোর বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে ভারতের রুপোর বাজারে দেখা যাচ্ছে এক আকর্ষণীয় পরিবর্তন। ২৮ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে দেশের বিভিন্ন শহরে রুপোর দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যদিও আগের দিনের তুলনায় সামান্য তারতম্য দেখা গেছে। ২৭ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে, ১০ গ্রাম রুপোর দাম ছিল দিল্লিতে ₹১৫৮০, জয়পুরে ₹১৫৮৪, বেঙ্গালুরুতে ₹১৫৯০ এবং চণ্ডীগড়ে ₹১৫৭৪। প্রতি কেজি রুপোর দাম মুম্বাইয়ে প্রায় ₹১,৫৭,০০০ এবং কলকাতায় ₹১,৫৮,০০০ টাকায় লেনদেন হয়েছে। রুপো শুধু গয়নার জন্য নয়, শিল্প ক্ষেত্রেও অপরিহার্য একটি ধাতু। ভারতে রুপোর বিপুল চাহিদা বিশ্ববাজারের দামের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামা, আমদানি শুল্ক ও কর ব্যবস্থার প্রভাব—সব মিলিয়ে দেশীয় বাজারেও পরিবর্তন ঘটে। বিনিয়োগের নিরাপদ উপাদান হিসেবে রুপো ক্রমেই আরও জনপ্রিয় হচ্ছে, তাই আজকের দামের হাল জানা বিনিয়োগকারী ও সাধারণ ক্রেতা—দু’জনের জন্যই জরুরি।
রুপোর দামে সাম্প্রতিক ওঠানামা
গত কয়েক মাসে ভারতের বাজারে রুপোর দামে ধারাবাহিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৫ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল—প্রতি কেজি রুপোর দাম ₹১,২০,০০০ অতিক্রম করে কখনও ₹১,২৮,০০০ থেকে ₹১,৩২,০০০ পর্যন্ত উঠেছিল। দীপাবলির পর কিছুটা পতন দেখা গেলেও, বছরের শুরু থেকে সামগ্রিক দাম এখনও অনেক বেশি।
বিগত বছরে রুপোর দাম প্রায় ৩৪ শতাংশ বেড়েছে—যা সোনার বৃদ্ধির কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে রুপোর দিকেই শক্তিশালী বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে সোনার তুলনায় রুপোর বিনিয়োগে বেশি লাভের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এই ওঠানামার মূল কারণ—বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, সরবরাহে ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার বৃদ্ধি। ভারতীয় পরিবারগুলি উৎসব ও বিবাহের সময় রুপোর গয়না, পাত্র, মুদ্রা এবং বার কেনেন, যা চাহিদা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কেন বাড়ছে রুপোর দাম?
রুপোর দামে এই ধারাবাহিক বৃদ্ধির পেছনে একাধিক বৈশ্বিক কারণ রয়েছে—
শিল্পক্ষেত্রে চাহিদা বৃদ্ধি:
রুপো এখন শুধু অলঙ্কার নয়, প্রযুক্তি ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, তার, সেন্সর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-ভিত্তিক ডিভাইস—সবেতেই রুপোর ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী রুপোর মোট চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি আসে শিল্পখাত থেকে।
সরবরাহ ঘাটতি:
গত পাঁচ বছর ধরে বিশ্ববাজারে রুপোর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম। প্রায় ১৪৯ মিলিয়ন আউন্স ঘাটতি রয়েছে। খনিজ উত্তোলনের ব্যয় বৃদ্ধি, আকরিকের মান হ্রাস, এবং প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলিতে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে। পুনর্ব্যবহারের হারও কমে গেছে।
বিনিয়োগের চাহিদা বৃদ্ধি:
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকির মধ্যে বিনিয়োগকারীরা রুপোকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা মূল্যবান ধাতুতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোনা-রুপোর অনুপাত এখনও কম, যা ইঙ্গিত দেয় যে রুপো তুলনামূলকভাবে অবমূল্যায়িত। ভবিষ্যতে এর দাম আরও বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা, ফেডারেল রিজার্ভের নীতি এবং মুদ্রাস্ফীতির উদ্বেগ রুপোর দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
উল্লেখ্য, ভারত তার রুপোর প্রায় ৮০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে আমদানি শুল্ক ও অন্যান্য কর দেশীয় দামে প্রভাব ফেলে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য রুপো: সোনা নাকি রুপো?
সোনা ও রুপো উভয়ই ঐতিহাসিকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত, তবে সাম্প্রতিক প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রুপোর প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক এক বিনিয়োগ সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে রুপোর দাম সোনার লাভকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছরে সোনার দাম ১৭% বাড়লেও রুপো বাড়তে পারে ২৩% পর্যন্ত।
রুপোর বাজার ছোট হওয়ায় সামান্য চাহিদা-যোগানের পরিবর্তনও দামে বড় প্রভাব ফেলে। অনেক বিনিয়োগকারী মনে করেন, রুপো বর্তমানে সোনার তুলনায় অবমূল্যায়িত এবং এর বৃদ্ধির সম্ভাবনা অনেক বেশি।
ডি-ম্যাট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এখন সিলভার ইটিএফ (Silver ETF)-এ বিনিয়োগ করা সম্ভব, যা জনপ্রিয় বিকল্প হয়ে উঠছে। দীপাবলির পর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছু মিউচুয়াল ফান্ড সংস্থা নতুন সিলভার ফান্ড সাবস্ক্রিপশন সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
এইচএসবিসি পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৫ সালে রুপোর গড় মূল্য আউন্সপ্রতি ৩৫.১৪ ডলার হতে পারে, যা পূর্বের তুলনায় বেশি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পোর্টফোলিওতে সোনা ও রুপো উভয় রাখাই দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য আদর্শ কৌশল।
মধ্যবিত্তের উপর প্রভাব ও শিল্পে রুপোর গুরুত্ব
রুপোর দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটেও প্রভাব ফেলছে। ভারতীয় ও বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে উৎসব ও বিবাহে সোনা-রুপোর গহনা কেনা ঐতিহ্য। কিন্তু উচ্চমূল্যের কারণে অনেকে এখন হালকা গহনা বা কম ক্যারেটের রুপো বেছে নিচ্ছেন।
এদিকে, আধুনিক শিল্পেও রুপোর গুরুত্ব বাড়ছে—সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সেন্সর, AI প্রযুক্তি ও ডেটা সেন্টারে রুপো অপরিহার্য উপাদান। ফটোভোল্টাইক (সৌর) সিস্টেম, 5G নেটওয়ার্ক ও স্বয়ংচালিত ইলেকট্রনিক্সে রুপোর চাহিদা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে, যা বাজার ও গ্রাহক—দু’পক্ষের ওপর প্রভাব ফেলছে। এ ছাড়াও রুপোর থালা-বাসন, পূজার সামগ্রী ও অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্যেও রুপো ব্যবহৃত হয়, যা সামগ্রিক চাহিদা বাড়িয়ে তুলছে। প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস ও বাজারের দিকনির্দেশ
বিশেষজ্ঞদের মতে, রুপোর বাজারে আশাবাদী প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। কোটাক মিউচুয়াল ফান্ডের ফান্ড ম্যানেজার সতীশ দোন্ডাপতি জানিয়েছেন, রুপো ক্রমশ বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। যদিও বাজার অস্থির এবং সুদের হারের প্রতি সংবেদনশীল, তবুও সামগ্রিকভাবে রুপোর গতি ইতিবাচক থাকবে।
বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস অনুযায়ী—
UBS: ২০২৪ সালের শেষে রুপোর দাম আউন্সপ্রতি ৩৪–৩৬ ডলার।
Citi: আগামী ১২ মাসে আউন্সপ্রতি ৩৫–৩৮ ডলার।
JP Morgan: ২০২৫ সালে গড়ে ৩৬ ডলার প্রতি আউন্স।
Motilal Oswal: রুপোর দাম মাঝারি থেকে দীর্ঘমেয়াদে কেজি প্রতি ₹১,০০,০০০ থেকে ₹১,২০,০০০ পর্যন্ত যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা WisdomTree-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, সরবরাহ ঘাটতি ও শিল্পচাহিদা বৃদ্ধির কারণে ২০২৫ সালে রুপোর দাম সোনাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্বজুড়ে রুপোর মোট চাহিদা ২০২৪ সালে ১.২১ বিলিয়ন আউন্সে পৌঁছাতে পারে, যা দাম বাড়িয়ে দেবে বলে অনুমান।