ট্রোল আর অসূয়াদীর্ণ নশ্বর দুনিয়ায় এমন কিছু চরিত্রালেখ্যই তো পৃথিবীকে, এ জীবনকে আরও একটু ভালবাসার, আরও খানিক লড়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়! ‘তাহাদের শেষ তর্পণ’-ও তাই স্মৃতির বস্তুময় স্মরণিকা ডিঙিয়ে হয়ে ওঠে সংবেদী পাঠকের চির একান্ত, চিরনিভৃত অথচ চিরচেনা এক গন্তব্য৷

বই: 'তাহাদের শেষ তর্পণ'
শেষ আপডেট: 1 February 2026 11:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘তর্পণে'র ধাতুমূল ‘তৃপ্’। অর্থ, অভিধানমতে, ‘মৃত পূর্বপুরুষের প্রীতি ও তৃপ্তির জন্য জীবিত বংশধরের জলদান’। বিকল্পে ‘পিতৃযজ্ঞ’। সেই হিসেবে কোনও বইয়ের নাম যদি ‘তাহাদের শেষ তর্পণ’ হয়, একটা ভক্তিবিগলিত অর্চনার সম্ভাবনা পাঠককে পাতা ওল্টানোর আগেই কুঁকড়ে রাখতে পারে। যেন যা কিছু লেখা হবে, সবই অকপট স্মৃতিচারণার ছদ্মবেশে অপার স্তুতি, বিহ্বলিত প্রশস্তি!
অনুমান যে ভুল, তার আভাস মিলেছিল ভূমিকায় (‘সেই তো আবার কাছে এলে’)। প্রায় একই সুরে লেখা বই ‘তারাদের শেষ চিঠি’। প্রকাশ মাত্রেই যা বিতর্কের ঝড় তোলে। লেখক গৌতম ভট্টাচার্যের অনুমান-মতে এই গ্রন্থ ‘হয়তো একদিন প্রজাপতি বা বিবরের মতোই বাংলার সবচেয়ে বিতর্কিত বইয়ের ইতিহাসে ঢুকবে। তাকে ঘিরে বছরের পর বছর চলতে থাকা আইনি বিতর্ক ও চাপানউতরের জন্য।’
এক্ষেত্রেও যে খুব একটা অন্যথা হবে না, লেখক মসৃণ হাইওয়ে না ধরে নির্মোহ সমালোচনার আলখেত বেয়ে হাঁটতে চান, প্রমাণ মিলল প্রথম লেখাতেই! ‘কর্ণ ভট্টাচার্য’ শিরোনামে প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্মৃতি-আলেখ্য। বিক্ষত-দগ্ধ বঙ্গদেশে স্মৃতিতাড়িত বাঙালির ট্র্যাজিক হিরো তিনি৷ সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয় প্রাচীন সাক্ষাৎকার। ‘নবীন বাংলা গড়ার যে ডাক তিনি দিয়েছিলেন, সময়ে তার মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারিনি, পারলে আজকের এই দুর্দশা দেখতে হত না’—গোছের অবোধ, অবুঝ কাতরানি আছড়ে পড়ে দাবানলের মতো, ছড়িয়ে পড়া বুদ্ধ-বচনের কমেন্ট বক্সে! ‘পার্টি খারাপ, তিনি ভাল’—সূচক দ্বন্দ্বমূলক সমালোচনা পেশ করেন বিরোধী শিবিরের অনুগামীরাও!
কিন্তু গৌতম, তেতল্লিশ বছরের সাংবাদিক যিনি, চষে বেরিয়েছেন ময়দান, ঢুঁ মেরেছেন সেলেব্রিটিদের ডার্ক রুমে, খেলোয়াড়দের অজস্র নিভৃত মানুষী দুর্বলতার একমাত্র সাক্ষী, তিনি কী করলেন? তিক্ত নিন্দাবাদ, অযুত প্রশংসার নিনাদ—কোনও পথ নিলেন না। পেশাদার জীবনে যে অ-প্রস্তুত, বিবর্তিত, সমৃদ্ধ ও ভঙ্গুর বুদ্ধদেবকে দেখেছেন কাছ থেকে, নিয়েছেন সাক্ষাৎকার, তাঁর নির্মম বাস্তব চেহারা আঁকলেন। ট্র্যাজিক হিরোর ট্র্যাজিকত্বের সন্ধান চালালেন। বেরিয়ে এল হঠকারি, কানপাতলা, উদ্ধত এবং ‘লিখতে খারাপ লাগছে’ সত্ত্বেও প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতিবিদের ইমেজ। আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতায় সিএবি প্রেসিডেন্ট তথা মুখ্যমন্ত্রীর কাছের লোক প্রসূণ মুখোপাধ্যায়ের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন গৌতম। সেই শাস্তি দিতে দপ্তর থেকে দুর্বিনীত, রূঢ় ঢঙে ফোন মারফত জানিয়ে দেওয়া হয়, ক্রীড়া সাংবাদিক ক্লাবের হীরক জয়ন্তী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে হাজির থাকতে পারবেন না বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য!
এই শুরু৷ এরপর যত সময় গড়িয়েছে, কখনও সিএবি নির্বাচন ঘিরে, কখনও-বা টুকরো-টাকরা ইন্টারভিউ সূত্রে সুযোগ পেলেই হুল ফুটিয়েছেন, চাকরি খেয়ে নেওয়ার সম্ভাব্য পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে! আবার গৌতমেরই মুখের কথাকে সত্য মেনে দিয়েছেন ট্র্যাফিক গার্ডকে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি—আপাত-ঋজুতার আড়ালে তীব্র ভঙ্গুর, বিখণ্ড চরিত্র ছাড়া একে আর কী বলা যেতে পারে! এই স্ববিরোধিতার কারণেই হয়তো লেখার শিরোনামও প্রথমে অভিমন্যু ভট্টাচার্য ভেবে পরে কর্ণ ভট্টাচার্য রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এক পৌরাণিক সমর্থন পেয়ে যায়৷
চরিত্রের খোলনলচে ভেঙে দেখানো আরও একটি লেখা 'রাজা গুহ'। বুদ্ধদেব গুহর স্মরণিকা। যেখানে গৌতম লিখেছেন, ‘সুনীল-বুদ্ধদেবে নিয়মিত মনকষাকষি ছিল অঞ্চলভিত্তিক সংঘর্ষ। আনন্দবাজার হাউসে প্রতিপত্তি। সামাজিক সিংহাসনের দখল। অরণ্যের অধিকার।’ শেষোক্ত ইঙ্গিত অব্যর্থ। একদিকে জঙ্গলকে ভিত্তি করে অজস্র স্মরণীয় লেখার মালিক বুদ্ধদেব, অন্যদিকে সুনীলের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’। অথচ ‘সুনীলের অরণ্যবোধ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় বুদ্ধদেব উড়িয়ে দিয়েছিলেন, “ধুর, ও আবার জঙ্গল বোঝে নাকি?” ক্রীড়া সাংবাদিক গৌতম। সেই সত্তা বেরিয়ে আসে উপমায়: ‘সাহসী ব্যাটসম্যান যেমন বুকেপিঠে বল লাগা নিয়েও অকুতোভয়ে ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যায় সেভাবেই জীবনের ওপর এগিয়ে গিয়েছেন বুদ্ধদেব।’
‘লাল বলের নন্দী’ প্রীতীশ নন্দীর স্মৃতি-তর্পণ। এখানেও তুলনা-প্রতিতুলনা। কিন্তু কম্পাস-মাপা যুক্তিতে নয়, চোখে দেখা অভিজ্ঞতায়৷ একদিকে প্রীতীশ। অন্যদিকে এম জে আকবর। প্রথমজন, গৌতমের চোখে ‘লাবণ্যমাখা পদ্য'। দ্বিতীয় জন ‘রক্তমাংসের গদ্য’। ইঙ্গিতে ব্যাপ্তিকে ধরার এর চাইতে অব্যর্থ বিশেষণ আর কী হতে পারে! লাবণ্যের গুণেই কি প্রীতীশের জীবনের যা কিছু অর্জন? ছাব্বিশ বছরে কবিতা লিখে পদ্মশ্রী প্রাপ্তি? সায়েন্স নিয়ে অগাধ জ্ঞান? সুনীলের কবিতার স্বচ্ছন্দ ইংরেজি অনুবাদ? সংস্কৃত প্রেমকাব্যের নির্ভার তর্জমা? কারণ খুঁজেছেন গৌতম। জানিয়েছেন, তাঁর পেশাদার মননকেও কীভাবে গড়েপিটে নেন প্রীতীশ—অলক্ষ্যে—কখনও-বা নিজেরই আড়ালে!
অদ্ভুত লেখা ‘কেদারবদ্রী’। ফোকাসে তাপস পাল৷ এক অর্থে, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অ্যান্টিথিসিস৷ বিতর্কিত মন্তব্যে, রাজনৈতিক টানাটানিতে যিনি নায়ক থেকে খলনায়ক! অথচ দাদার কীর্তি এবং সাহেব—মাত্র দুটো ছবিই যে একজন নাদান অভিনেতাকে হিরোইজমের তুঙ্গে নিয়ে যেতে পারে—টলিউড ইন্ডাস্ট্রি না আগে দেখেছে না পরে! অথচ ভাগ্যের বরপুত্র কীভাবে অভিশপ্ত ধূমকেতু হয়ে গেলেন? আজও কেন স্মৃতিরক্ষার চেষ্টা হল না? তাঁর নামে কোনও স্মৃতি পুরস্কার… রয়েছে কি কোথাও? নিদেপক্ষে রাস্তার নাম? টলিউড এত নিরাসক্ত, সরকার উদাসীন… কেন? অভিনেতা নয়, রাজনীতিবিদ হিসেবে মূল্যায়নই কি কাল হল? এভাবে মাপা কতটা সঙ্গত? ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তাপস পাল কতটা খাঁটি? মেলে ধরেছেন গৌতম!
তীব্রভাবে প্যাশনেট লেখা গালিবের কবিতা (বিষেন সিং বেদী), নতুন প্রস্তর যুগের মহাতারা (ধর্মেন্দ্র) কিংবা চুনী থাকতে হীরেপান্না কেন (চুনী গোস্বামী)। সাধারণের চোখে যাঁরা কেউ তারকা, কেউ মহাতারকা, তাঁদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধরে একটা স্কেচ আঁকা আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভার পাঠকদের দরবারে ছাড়া—এখানেই এ বইয়ের আসল জিত! লেখক গৌতম ভট্টাচার্য কিছুই চাপিয়ে দেননি৷ কেউ নায়ক নন৷ কেউ ভিলেন নন৷ তিনি নিজেও স্রেফ দর্শক৷ অনুমান আছে, দাবি নেই। দর্শন আছে, তত্ত্ব নেই। একটা অ্যাকসেস পেয়েছেন পেশাগত ট্রাম্প কার্ডে। তারকাদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের। দর্শক তিনি। অভিজ্ঞতা পুঞ্জীভূত করেছেন। সেটুকুই আলতো রেণুর মতো অধ্যায়ের পর অধ্যায় জুড়ে বর্ণনা করে চলেছেন অননুকরণীয় গদ্যে। যে গদ্যভাষার তিনিই স্বরাট। ‘দেওয়ানজী জলের ন্যায় সহজ ভাষায় লিখিতেন’—রামমোহন রায়ের গদ্যকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন ঈশ্বর গুপ্ত। বাংলা সাংবাদিকতা শুধু বলব না, সামগ্রিকভাবে সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যে হাতেগোনা যে সমস্ত লেখক জলের মতো তরতরে, প্রবহমান, নির্ভার অথচ ছন্দময় গদ্য লিখে থাকেন, গৌতম ভট্টাচার্য তাঁদের প্রতিনিধিস্থানীয়।
ঈর্ষা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা অতিস্তুতিতে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিচরিত্রের বিশ্লেষণ আবিল হয়ে পড়ে। এই বইয়ের ব্যক্তিগত শোক-জারিত লেখাগুলি এক অর্থে নৈব্যর্ক্তিক স্মৃতিতর্পণের হ্যান্ডবুক। মানস চক্রবর্তী থেকে মৌ রায়চৌধুরী। এঁদের কাউকে আমরা চিনি, কাউকে চিনি না। কিন্তু চেনা-না চেনার ঊর্ধ্বে যে ‘জানা’র স্তর থাকে, সেখানে আলো ফেলেছেন গৌতম৷ যেমন, সাংবাদিক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণে তাঁর সঙ্গে দাদা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের (অধুনা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্য উপদেষ্টা) সম্পর্কের ধূসর কোণে পেতেছেন নজর৷ তুলেছেন প্রশ্ন, ‘দু'ভাই-ই আদ্যন্ত পরিশ্রমী এবং বুদ্ধিমান। নিজেদের মধ্যে বরাবর এত ভাল সম্পর্ক৷ অথচ আশ্চর্য লাগে কোনওদিন আমি একজনকে আরেকজন সম্পর্কে কিছু বলতে শুনিনি। একসঙ্গে ওদের ছবিও দেখিনি।’ এরপরই ট্রেডমার্ক স্টাইলে দিয়েছেন সম্ভাব্য ব্যাখ্যা, ‘ভাইয়ের শোকে বিদীর্ণ আলাপনের লেখাটা পড়ে কিন্তু মনে হয়েছিল টুমুনি নদের ধার থেকে উঠে আসা বাঁড়ুজ্যে ভাইরা এক অনিশ্চিত, ঘোলাটে, বৃহদাকার শহরের অনুকম্পার বস্তু না হয়ে তাকে পোষ মানানোর এমন অনমনীয় প্রতিজ্ঞায় ভরপুর ছল যে অদৃশ্য ডাবলস ম্যাচ পাশাপাশি কোর্ট থেকে অনবরত খেলে গিয়েছে।’
ট্রোল আর অসূয়াদীর্ণ নশ্বর দুনিয়ায় এমন কিছু চরিত্রালেখ্যই তো পৃথিবীকে, এ জীবনকে আরও একটু ভালবাসার, আরও খানিক লড়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়! ‘তাহাদের শেষ তর্পণ’-ও তাই স্মৃতির বস্তুময় স্মরণিকা ডিঙিয়ে হয়ে ওঠে সংবেদী পাঠকের চির একান্ত, চিরনিভৃত অথচ চিরচেনা এক গন্তব্য৷
বই: 'তাহাদের শেষ তর্পণ'
লেখক: গৌতম ভট্টাচার্য
দীপ প্রকাশন
দাম: ৪০০ টাকা