অভিনেতা ও মানুষ ভানুর অতল চরিত্রে সাম্যের অনুসন্ধান সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সুভাষিত ভূমিকা সমৃদ্ধ এই বই। মিথকে মিথ্যার আবছায়া থেকে বের করে আসল সত্যে যাঁরা পৌঁছতে চান, এমন সংকলন আসলে তাঁদেরই জন্য।

'পারিবারিক ভানু'
শেষ আপডেট: 17 July 2025 11:56
রচনার পরিমাণ নয়, স্রেফ প্রোডাকশনের গুণমানেই যে গ্রন্থনির্মাণ সম্ভব, দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘পারিবারিক ভানু’ বইটি (প্রকাশক: মান্দাস) তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। কেন্দ্রে অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর জীবনের মিথ ও জল্পনা নিরসন করে আঁকাড়া সত্যি, তা যতই সাদামাটা হোক না কেন, তুলে ধরাই ছিল সম্পাদকের লক্ষ্য। এক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি সফল।
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে এর আগে ছড়ানো-ছিটানো ‘কাজ’ হয়েছে। স্মরণযোগ্য সময়ে ‘চৌরঙ্গী’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার কথা মনে পড়ছে। কিন্তু সেসবই পাঁচমিশেলি রচনার সংকলন। কেউ পূর্বজ অভিনেতা, কেউ সমসাময়িক চিত্র পরিচালক, কেউ সতীর্থ। ঘরের লোক, কাছের মানুষ, ছেলেবেলার বন্ধু—সবার স্মৃতিচারণকে ভিত্তি করে বই তৈরি হলেও অনেক কথার ভিড়ে আসল বক্তব্য অনুচ্চারিত রয়ে গিয়েছে। আলোচ্য গ্রন্থ শুধুমাত্র অভিনেতার স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাদের স্মৃতিচারণ। ফলে ভণিতা নয়, নিখাদ সত্যবচন৷
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কি শুধুই ‘কমেডিয়ান’? দক্ষ ‘অভিনেতা’ নন? যদি হয়ে থাকেন, তাহলে সত্যজিৎ রায় কিংবা মৃণাল সেন অথবা ঋত্বিক ঘটক তাঁকে সুযোগ দিলেন না কেন? তাই নিয়ে কতখানি অভিমান ছিল? তিনি কৈশোরে স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবীমন্ত্রে দীক্ষিত—একথা কিংবদন্তি হলেও নকশাল কিংবা বামপন্থীদের কোন চোখে দেখতেন? বিদেশি ছায়াছবি, বিশেষ করে হিচককের বিশেষ গুণগ্রাহী ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়—কতজন জানে? বাংলাদেশ নিয়ে প্রবল স্মৃতিমেদুরতা সত্ত্বেও কেন ভিসা নিয়ে ওপার বাংলায় যেতে চাননি? এমনই অজস্র দ্বন্দ্বের নিরসন এই গ্রন্থ।
গড্ডলিকাপ্রবাহে না হেঁটে অন্য কিছু করার, ভিন্ন চোখে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনাবিষ্কৃত ‘লেগাসি'-র পাঠোদ্ধার করার দায় থেকেই সম্পাদক ছ'টি প্রবন্ধকে সাজিয়েছেন। অভিনেতার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাদের সাক্ষাৎকার এবং সাক্ষাৎকারভিত্তিক রচনা। ফলে মুখের কথা লিখতে গেলে ‘পলিটিক্যালি কারেক্ট’ থাকার যে গুরুভার কলমের ডগায় চলে আসে, এক্ষেত্রে সেটা হয়নি। ইন্টারভিউ মানেই চটজলদি প্রশ্নের তৎক্ষণাৎ জবাব। লেখা অনেক ভাবনাচিন্তা, মস্তিকের সংস্কার ও সম্পাদনার ফসল। ভানুর মদ্যপান নিয়ে নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় (স্ত্রী) যখন বলেন, ‘... আমি এ ব্যাপারে খুব কড়া ছিলাম। তাই বাড়িতে খেত না। বাইরে খেত’ কিংবা পুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ভাল বন্ধু’ হওয়া সত্ত্বেও ঋত্বিক ঘটক কেন ভানুকে তাঁর ছবিতে নেননি বিষয়ে যখন মন্তব্য করেন, ‘ঋত্বিক ঘটক কম পয়সায় ভাল আর্টিস্ট খুঁজতেন। বাবাকে পারিশ্রমিক দেওয়ার মতো বাজেট ওঁর থাকত না।’ তখন বোঝা যায়, কারও মন জোগানো নয়, নিপাট সত্যির হদিশ মিলতে চলেছে এই গ্রন্থে।
কতজন জানে, স্রেফ অভিনেতা নন, পরিচালনাতেও আসতে চেয়েছিলেন ভানু? খুব ইচ্ছে ছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ প্রযোজনা করার? ঋত্বিক ছবিতে না নিলেও মনোজ ভট্টাচার্যের ‘তথাপি’-তে ভানুর সঙ্গে তিনি অভিনয় করেছেন। ভালবাসতেন নজরুল গীতি, শচীন দেববর্মণের পল্লিগান। লোকে যাঁকে মজার ছবির অভিনেতা, একান্তভাবে সীমাবদ্ধ শিল্পী, যিনি লোক হাসানো ছাড়া আর কিছুই পারেন না বলে মনে করে, অশ্রদ্ধা না হলেও তাঁকে ক্ষমতার চৌখুপিতে পুরে ফেলেছে, তিনিই কিনা ১৯৭৯ সালে একটি সাক্ষাৎকারে বাংলা নাটকের নাট্যসম্ভাবনা নিয়ে বলছেন, ‘আজ যদি আমি গিরিশচন্দ্রের ‘প্রফুল্ল’ করতে যাই, লোকে বলবে, ওটা তো বস্তাপচা। তা, সোফোক্লিসের বই লেখা হয়েছিল কবে? সেটায় তো বস্তা পচল না! প্রফুল্লর বস্তা পচে গেল! প্রফুল্ল-র বস্তা এত ক্যুইক পচল কী করে? কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, পচা বস্তায় যদি সোনা পাই, আমি সেটা নেব, না ইটালিয়ান বস্তায় বিষ্ঠা পেলে সেটা নেব?’
এই স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির উৎস কী? তাঁর পূর্বাশ্রম-অর্জিত বৈজ্ঞানিক যুক্তিবোধ? যখন তিনি পদার্থবিদ্যা নিয়ে বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ছত্রচ্ছায়ায় লেখাপড়া করছেন… সংস্পর্শে আসছেন ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার, কবি মোহিতলালের? কৈশোরে যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী দীনেশ গুপ্তর ‘অনুগত অনুজ’, জীবনের প্রতিষ্ঠা পর্বে ট্রেড ইউনিয়নের ইস্তেহারে অকুতোভয় ঠাটে তাঁর পক্ষেই লেখা সম্ভব, ‘আমাদের বিশ্বাস এবং আস্থা নির্ভর করছে কার্ল মার্কস কথিত নিম্নোক্ত বাক্যের ওপর—‘শ্রমিক শ্রেণির বন্ধনমুক্তির প্রথম পদক্ষেপ হল, রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া।’
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় যতখানি ‘মাসিমা মলপো খামু’, ঠিক ততখানি কার্ল মার্কস! আবার তিনিই বাড়ি থেকে বেরনোর সময় মায়ের ছবির পাশাপাশি রামকৃষ্ণের ছবিকে প্রণাম করেছেন। এই নিয়ে স্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে ভানুর সহাস্য জবাব ছিল, ‘আমার চেয়ে বড় কমিউনিস্ট আর কে আছে! আমার আসল নাম জানো তো, সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়।’
অভিনেতা ও মানুষ ভানুর অতল চরিত্রে সাম্যের অনুসন্ধান সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সুভাষিত ভূমিকা সমৃদ্ধ এই বই। মিথকে মিথ্যার আবছায়া থেকে বের করে আসল সত্যে যাঁরা পৌঁছতে চান, এমন সংকলন আসলে তাঁদেরই জন্য।
পারিবারিক ভানু/ স্ত্রী, কন্যা, দুই পুত্রের স্মৃতিকথন
সম্পাদনা: দেবশঙ্কর মুখোপাধ্যায়
প্রচ্ছদ: সেজুঁতি বন্দ্যোপাধ্যায়