.jpeg)
শেষ আপডেট: 20 February 2025 14:57
‘জুলাই-অগাস্ট গণ-বিপ্লবের সময় আন্দোলনকারীদের উপর হামলার অভিযোগ নেই, আওয়ামী লিগের এমন নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে দল ছাড়লে তাদের রাজনীতি করতে দেওয়া হবে। জাতীয় সংসদ-সহ সব নির্বাচনে অংশগ্রহণও করতে পারবেন তাঁরা।’
দু’দিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন বার্তা দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা তথা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। একাধিক সুত্র থেকে জানা যাচ্ছে, মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারও এমনই একটি প্রস্তাব নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
গত বছর ছাত্রদের কোটা বিরোধী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতে সক্ষম হয়। ওই আন্দোলন দমনে সরকারি বাহিনীর দমনপীড়ন নিয়ে সম্প্রতি রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশনারের দফতর যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ইউনুস সরকার সেটিকে হাতিয়ার করতে চাইছে। সরকারের দাবি, রিপোর্টে সরাসরি শেখ হাসিনাকে গণহত্যার জন্য দায়ী করা হয়েছে।
যদিও আওয়ামী লিগের দাবি, রিপোর্টে কোথায় গণহত্যা শব্দটি নেই। বরং যে ১৪০০ মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলা হয়েছে তাদের চারশো জন মারা যান ১৫ জুলাই থেকে ৪ অগাস্টের মধ্যে। বাকি এক হাজার জনের মৃত্যু হয় ৫ থেকে ১৫ অগাস্টের মধে। ওই সময় প্রথম তিনদিন বাংলাদেশ কোনও সরকার ছিল না। দেশ ছিল সেনাবাহিনীর হাতে। ৮ অগাস্ট দেশের দায়িত্ব নেয় মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সয়ম। ওই সাত দিনে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। নিহতরা বেশিরভাগই আওয়ামী লিগ কর্মী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ।
রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশন ওই রিপোর্টে আওয়ামী লিগ-সহ কোনও দলকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা না করার পরামর্শ দিয়েছে। তাৎপর্যুপূর্ণ হল, রিপোর্টটি প্রকাশের পর পরই মহম্মদ ইউনুস আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে সুর নরম করে মিটমাটের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমরা হিংসার পথে হাঁটব না। তা যদি করি তাহলে বাংলাদেশে প্রতিহিংসার রাজনীতিই জিতে যাবে। এমনকী শেখ হাসিনা-সহ আওয়ামী লিগ নেতাদের বিচারে তাড়াহুড়ো করার পক্ষপাতী নন, সেই কথাও স্পষ্ট করে দেন।
এখন জানা যাচ্ছে, ইউনুসের রিকনসিলিয়েশন অর্থাৎ মিটমাট বা পুনর্মিলন প্রস্তাব বাস্তবায়নে রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্টটিকেই হাতিয়ার করার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। থানা পর্যায়ে এজন্য ক্যাম্প করে আওয়ামী লিগের নেতা-কর্মীদের ভুল স্বীকার, ক্ষমা প্রার্থনার লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ সাপ মরল, লাঠি ভাঙল না কৌশল নিয়ে এগচ্ছেন ইউনুস। আওয়ামী লিগকে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ না করে দলটির অস্তিত্বই মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
সরকার এই ভাবে সরাসরি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষণা হতে যাওয়া রাজনৈতিক দলের জন্য জনবল সরবরাহ করতে চাইছে বলে বিএনপি ইতিমধ্যেই সরব হয়েছে। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, ছাত্রদের নতুন দলটির সঙ্গে আওয়ামী লিগের নেতা-কর্মীরা হাত মেলালে তাদের ‘সাত খুন মাফ’ করার রাস্তা খোলা হচ্ছে। দেশে বিপদের মধ্যে থাকা শেখ হাসিনার দলের নেতা-কর্মীদের অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে নতুন দলে হাত মেলাতে পারে বলে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতৃত্ব আশাবাদী। আর এই ব্যাপারে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে চলেছে মহম্মদ ইউনুসের সরকার।
আর এখানেই প্রমাদ গুণছে বিএনপি। রাজনীতিতে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হলেও শেখ হাসিনার দলকে ভাঙার এই পরিকল্পনায় চিন্তিত খালেদা জিয়া, তারেক জিয়াদের দল। তাদের বক্তব্য, দুর্দিনেও আওয়ামী লিগের ২৭-২৮ শতাংশ ভোটের নড়চড় হয় না। সুদিনে দলটি ৪০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়ে থাকে। অতীতে নানা রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখেও ২৭-২৮ শতাংশ বাঁধা ভোটার দূরে সরে যাননি। এমনকী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যার পর যখন আওয়ামী লিগে নাম উচ্চারণ করা যেত না তখনও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের দীর্ঘদিনের ভোটাররা দলীয় প্রতীকে ভোট দিয়েছেন। বিএনপি নেতৃত্ব মনে করছে, এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। প্রাণ বাঁচাতে হাসিনার দলের কিছু ভোটার বৈষম্য বিরোধীদের সঙ্গে হাত মেলাতে পারেন। সাড়া না দিলে তাদের উপর পুলিশ-সেনার জোর-জুলুম বেড়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, আওয়ামী লিগকে নিকেশ করা এখন ‘ওয়ান-পয়েন্ট প্রোগ্রাম’ করে নিয়েছেন ইউনুস। হাসিনার সময় আদালত ইউনুসকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছিল। তিনি জামিনে ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মামলাটিই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
ইউনুসের অভিযোগ, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ছিল হাসিনার ষড়যন্ত্র। এখন সুযোগ পেয়ে তিনি শেখ হাসিনার উপর ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চাইছেন। আওয়ামী লিগের প্রথমসারির নেতারা বেশিরভাগই এলাকা ছাড়া। অনেকে দেশে নেই। এই অবস্থায় এলাকায় থাকা নেতা-কর্মীদের নেতত্বের প্রতি ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। ইউনুস এই সুযোগটাও নিতে চাইছেন। এক কথায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৈরি দলে নাম লেখানোই হতে চলেছে আওয়ামী লিগের অসহায় নেতা-কর্মীদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অলিখিত শর্ত। এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লিগ কী করে সেটাই এখন দেখার।