বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে নজরুলের সমাধির পাশাপাশি যেখানে একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রথিতযশা শিক্ষকের সমাধি রয়েছে, সেখানেই হাদিকে সমাধিস্থ করা কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে।

ছবি-সংগৃহীত।
শেষ আপডেট: 20 December 2025 10:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলাদেশের (Bangladesh) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশেই শেষ ঠিকানা হচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক তথা বাংলাদেশের কট্টোরপন্থী তরুণ নেতা, তীব্র ভারতবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত ওসমান হাদির (Osman Hadi)। শুক্রবার গভীর রাতে জরুরি বৈঠকের পর এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ (Dhaka University)।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে নজরুলের সমাধির পাশাপাশি যেখানে একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রথিতযশা শিক্ষকের সমাধি রয়েছে, সেখানেই হাদিকে সমাধিস্থ করা কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। ফলে হাদির সমাধিকে ঘিরে নতুন করে অশান্তির আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছে না নিরাপত্তা আধিকারিকরা।
বিবিসি বাংলার খবর অনুযায়ী, হাদির পরিবার নজরুলের পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করার আর্জি জানিয়েছিল। পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের তরফ থেকেও একই অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। সেই প্রেক্ষিতেই শুক্রবার রাতে অনলাইন মাধ্যমে জরুরি বৈঠকে বসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। বৈঠকেই হাদির সমাধিস্থল নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। যদিও সমাধিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হন বাংলাদেশের কট্টোরপন্থী তরুণ নেতা, তীব্র ভারতবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত ওসমান হাদি। ছ’দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত হার মানেন তিনি। সরকারি উদ্যোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হলেও বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ্যে আসে। সেই খবর ছড়াতেই বাংলাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র উত্তেজনা। সংগঠিত জনরোষে ভাঙচুর চালানো হয় একাধিক সরকারি ভবন ও আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে। হামলার শিকার হয় সংবাদমাধ্যমও— প্রথম আলো ও ডেলি স্টার-এর দফতরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রেহাই পায়নি ছায়ানট ভবন, উদীচীর কার্যালয়ের মতো খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও।
এই পরিস্থিতিতে শনিবার হাদির শেষকৃত্য ঘিরে নতুন করে অশান্তি ছড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। বাংলাদেশের কট্টোরপন্থী তরুণ নেতা, তীব্র ভারতবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত হাদির স্মৃতিতে শনিবার বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। ইউনূসের প্রেস উইং সূত্রে জানানো হয়েছে, দুপুর দু’টো নাগাদ সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজ়ায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। তার পর দেহ নিয়ে যাওয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থলের প্রস্তুতি চলছে।
সমাজ মাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন কোন মানদণ্ডে জাতীয় কবির সমাধির পাশে ইনকিলাব মঞ্চের এই কট্টরপন্থী উগ্র ইসলামবাদী নেতাকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল? গত বছর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জামাতি ইসলামের হয়ে ময়দানে সক্রিয় হোন হাদি। তৈরি হয় কট্টর ইসলামিক মতাদর্শ প্রচারের সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ। হাদি ছিলেন সেই মঞ্চের আহ্বায়ক। সেই সংগঠনের ব্যানারে বাংলাদেশের নানা প্রান্তে সফর করে তিনি ভারত বিরোধী জিগির তৈরি করেন। বাংলাদেশের যা কিছু ক্ষতি, বিপদ, ব্যর্থতার দায় ভারতের উপর চাপাতে থাকেন এই তরুণ নেতা। সে দেশে ভারত বিরোধী শক্তি এরফলে নতুন করে মাথাচাড়া দেয়। ভারতীয় গোয়েন্দা সংখ্যাগুলির খবর, এই তরুণের পিছনে বাংলাদেশ প্রশাসন এবং জামায়াতে ইসলামের প্রত্যক্ষ মদত ছিল। তারা সরাসরি এই কাজটি না করে ইনকিলাব মঞ্চকে দিয়ে করাচ্ছিল বলে জানা গিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের বড় অংশের মত, সেই কারণেই হাজির হত্যাকাণ্ডকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকার প্রত্যাশার অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া এবং পদক্ষেপ করছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর মৃত্যু সংবাদ আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই শোক জ্ঞাপন করেন প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস। মাঝরাতে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও রেডিওতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে হাদিকে প্রধান উপদেষ্টা 'শহিদ' আখ্যা দেন এবং আজ শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক পালনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে হাদির অন্তেষ্টি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় করার সিদ্ধান্ত হয়।
যদিও বিগত কয়েক মাসের রাজনৈতিক তৎপরতা ছাড়া রাজনীতি এবং সংস্কৃতি ও সমাজ জীবনে হাদির কোনও বিশেষ অবদানের কথা কারও জানা নেই। অনেকেরই বক্তব্য, জাতীয় কবি নজরুলসহ বিশিষ্টজনদের সমাধিস্থলের পাশে সমাহিত করার মত কোন ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় যোগ্যতা হাজির ছিল না। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাঁকে সমাহিত করার সিদ্ধান্তের পিছনে সরকার এবং জামাতি ইসলামের রাজনৈতিক অঙ্কই দেখছে ওয়াকিবহাল মহল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্র সংসদ হাদিকে জাতীয় কবির সমাধির পাশে সমাহিত করার দাবি তুলেছে সেটি এখন জামাতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের দখলে। হাদিকে খুনের ঘটনায় প্রথম থেকেই ভারতের দিকে আঙুল তোলার চেষ্টা করে জামাত। গত পরশু হাদির মৃত্যু সংবাদ আসার পরেই জামাতে ইসলামি এক বিবৃতি জারি করে দাবি করে ভারতকে হাদির খুনিদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে হবে। যদিও বাংলাদেশ সরকার এখনও পর্যন্ত কোনও তথ্য প্রমাণ সহ ভারতকে জানাতে পারেনি যে হাদির হত্যাকারীরা সীমান্ত পেরিয়েছে। উল্টে এই ঘটনায় তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, তাদের কাছে হাদির খুনিদের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার কোন তথ্য প্রমাণ নেই।