মহম্মদ ইউনুস
শেষ আপডেট: 4 December 2024 08:55
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস বুধবার ঢাকায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করবেন। মঙ্গলবার রাতে তিনি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র নেতৃত্ব ছাড়াও একাধিক ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। শনিবার পর্যন্ত তিনি লাগাতার বিভিন্ন দল ও সংগঠনের সঙ্গে কথা বলবেন। প্রধান উপদেষ্টার অফিস থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে জামাত-ই-ইসলামি-সহ সমস্ত ইসলামি দল ও মুসলিম ধর্মীয় সংগঠনগুলিকে।
জানা যাচ্ছে, সংখ্যালঘু নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে দেশে-বিদেশে লাগাতার সমালোচনার মুখে ইউনুস জাতীয় ঐক্যকে ঢাল করছেন। যদিও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কোনও সংগঠনকে বৈঠকে না ডাকায় তাঁর বিরুদ্ধে বিভাজনকে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ছাড়াও এই মুহূর্তে হিন্দু জাগরণ ঐক্য মঞ্চ সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়নের ঘটনার প্রতিবাদে ময়দানে আছে। কিন্তু প্রশাসক হিসাবে ইউনুস সংখ্যালঘু নেতাদের এর আগেও সংঘাত নিরশনে হওয়া ধারাবাহিক বৈঠকগুলিতে ডাকেননি। জানার চেষ্টা করেননি তাঁদের অভাব-অভিযোগের কথা। দূরে দূরে রেখেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নেতৃত্বকেও যারা মূলত খ্রিস্টান। দেশের সংবিধান সংশোধন কমিটিতেও রাখা হয়নি কোনও সংখ্যালঘুকে। ফলে সংখ্যালঘুরাই দেশের বিপদের কারণ, এমন ধারণা ক্রমে সরকারের শীর্ষ মহল থেকে তৈরি করা হচ্ছে বলে সে দেশের বহু শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ মনে করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জুবাইদা নাসরিন যেমন সংবাদমাধ্যমকে বলেছন, চলতি পরিস্থিতিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সরকারি স্তরে আলোচনা শুরু হওয়া দরকার। একই সঙ্গে ইউনুস সরকারকে তাঁর পরামর্শ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংগঠনগুলির সঙ্গে প্রশাসনের কথা বলা উচিত। তাঁর সাফ কথা, স্বাধীনতার সময় থেকেই সংখ্যালঘুরা বিপন্ন, এটা বিবেচনায় রেখেই আলোচনা হওয়া দরকার। দুই দেশের মধ্যে কথা শুরুর পরামর্শ দিয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। বাংলাদেশের হিন্দু নেতাদেরও অনেকেই মনে করছেন ভারতে বসে বিজেপি নেতাদের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া ভাল হচ্ছে না। উগ্র ইসলামিক শক্তিগুলি এতে আরও উৎসাহ পাচ্ছে এবং হিন্দুদের ভারতের দালাল বলে প্রচার চালিয়ে সামাজিক বয়কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁরাও চান, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে কথা শুরু হোক।
মঙ্গলবার রাতে ইউনুসের সঙ্গে বৈঠকে ছাত্র নেতারা হাসিনা সরকারের আমলে হওয়া সমস্ত চুক্তি বাতিলের দাবি জানালেও প্রধান উপদেষ্টা এই ব্যাপারে কথা বাড়াননি। কারণ, দু’দিন আগেই তাঁর তৈরি একটি কমিটি হাসিনা সরকারের সময়ে বিদেশের সঙ্গে হওয়া সমস্ত চুক্তি বহাল রাখার পরামর্শ দিয়েছে। ইউনুস ছাত্র নেতাদের সংখ্যালঘু ইস্যুতে পাল্টা প্রচারে শামিল হতে পরামর্শ দেন।
আসলে আচমকাই ইউনুস সরকারের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে ব্রিটেন-সহ একাধিক দেশ। ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাজ্যের হাই কমিশন জানিয়েছে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদী হামলার আশঙ্কা বেড়ে গিয়েছে। যে কোনও সময় যে কারও উপর হামলা করতে পারে ইসলামি মৌলদাবীরা। এই জাতীয় সতর্কবার্তা এই মুহূর্তে পাকিস্তান নিয়েও নেই।
দু’দিন আগে ব্রিটিশ এমপি বব ব্ল্যাকম্যান সে দেশের পার্লামেন্টে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে জোরালো ভাষণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জাতিগতভাবে নিকেশ করার প্রচেষ্টা চলছে। সরকার কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তারপরই ব্রিটিশ সরকারের বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভয়ানক রিপোর্ট সামনে এসেছে। যুক্তরাজ্য একপ্রকার বাংলাদেশ না যাওয়ারই পরামর্শ দিয়েছে। সে দেশে থাকা নাগরিকদের সতর্কভাবে চলাফেরা করার পরামর্শ দিয়েছে।
গত সপ্তাহে জেনিভায় রাষ্ট্রসংঘের সংখ্যালঘু বিষয়ক ফোরামে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নিপীড়ন, নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়। ফলে হিন্দুদের উপর নিপীড়ন, নির্যাতনের অভিযোগ এখন আর শুধু ভারতের নয়। ইউরোপ-আমেরিকায় বহু দেশে স্থানীয় বাংলাদেশিরা সরব হয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক এমপি’ও সরব হয়েছেন। মনে করা হচ্ছে, শান্তিতে নোবেনজয়ী ইউনুস এখন বিশ্বব্যাপী হিংসাকে প্রশ্রয় দেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত হয়ে দেশের সব দল ও ইসলামিক সংগঠনগুলিকে পাশে নিয়ে ‘বাংলাদেশ বিপন্ন’ রব তুলেছেন।