মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা স্থাপনে একটি জাতির প্রচেষ্টা এবং আতৎস্বর্গ দুনিয়ার অন্য কোনও জাতির ইতিহাসে নেই।

শেষ আপডেট: 20 February 2026 23:26
বাংলা আমার মাতৃভাষা এবং আমি বাঙালি। বাংলা আমার পরিচয়, আমার অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাকে কখনও আমার অস্তিত্ব থেকে আলাদা করা যাবে না। পাকিস্তানিরা সেটি বুঝেছিল। সে কারণেই পাকিস্তান জন্মের শুরু থেকে বারবার তারা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আঘাত করেছে। পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা তো দূরে থাক, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক ভাষা করতেও রাজি হয়নি। বাংলা ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য আরবি বর্ণমালায় বাংলা লেখার প্রচলন করতে চেয়েছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করেছিল। বাংলা সাহিত্যকে বিদায় করে উর্দু সাহিত্যের বিস্তার ঘটাতে চেয়েছিল। কিন্তু বাঙালি তাদের সেই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরেছিল। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিল।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন করাচিতে শুরু হলে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষার ওপর একটি সংশোধনী প্রস্তাবে বলেন, উর্দু এবং ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হোক। সংশোধনী প্রস্তাবটির ওপর আলোচনায় ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান বলেন, ‘পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা এবং একটি সাধারণ ভাষার দ্বারা ঐক্যসূত্র স্থাপনের প্রচেষ্টা হইতে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করাই এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য।’
পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন বলেন, ‘পূর্ব বাংলার অধিকাংশ অধিবাসীরই এই মনোভাব যে, একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে।’ (নওবেলাল, ৪ মার্চ, ১৯৪৮)।
মুসলিম লিগ দলীয় বাঙালি সদস্যদের বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার খবর ঢাকায় এলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মুসলিম লিগারদের উর্দুভাষা প্রীতির বিরুদ্ধে ঢাকায় ২৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-ধর্মঘট পালিত হয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল শেষে বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক প্রতিবাদ সভায় মিলিত হয়।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন পরিচালনার উদ্দেশ্যে ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে কামরুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ নামে সর্বদলীয় সংগঠন দাঁড় করানো হয়। সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ১১, ১৩ ও ১৪ মার্চ (১৯৪৮) সারা পূর্ব বাংলায় হরতাল পালিত হয়। প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের বর্ধমান হাউজস্থ (বর্তমানে বাংলা আকাদেমি) বাসভবনে ১৫ মার্চ মুসলিম লিগ সংসদীয় দলের বৈঠক চলাকালে ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
ওই দিনই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আলোচনা হয়। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন ৭ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। দফাগুলি ছিল: ১. বন্দি-মুক্তি, ২. তদন্ত অনুষ্ঠান, ৩. ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার, ৪. আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা রহিতকরণ, ৫. বাংলাকে প্রাদেশিক সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রদান, ৬. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রাদেশিক সংসদীয় সভায় বাংলার প্রচলন, ৭. সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। ছাত্রদের চাপে প্রধানমন্ত্রী ৭ম দফার পরে ৮ম দফায় নিজ হাতে লেখেন, ‘সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনার পর আমি এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হইয়াছি যে, এই আন্দোলন রাষ্ট্রের দুশমন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় নাই।’ এই চুক্তি ছিল বাঙালিদের এক বিশাল বিজয়ের প্রতীক।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ৩১ জানুয়ারি (১৯৫২) বিকেলে আওয়ামী মুসলিম লিগ ও পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে ঢাকা বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে উক্ত সভায় সর্বসম্মতভাবে ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ গঠন করে নিয়ে বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় : ক. চুক্তি ভঙ্গ করে খাজা নাজিমউদ্দিনের দম্ভোক্তির নিন্দা, খ. বাংলা ভাষা লেখার জন্য আরবি অক্ষর প্রচলনের অপচেষ্টায় ক্ষোভ প্রকাশ, গ. ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের সাধারণ ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন দান, ঘ. জননিরাপত্তা আইন প্রত্যাহার ও এই আইনের আওতায় বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি দাবি।
মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা স্থাপনে একটি জাতির প্রচেষ্টা এবং আতৎস্বর্গ দুনিয়ার অন্য কোনও জাতির ইতিহাসে নেই।
বাংলাভাষার গৌরবময় সংগ্রামের ইতিহাস বিশ্ববাসীর নিকট চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম প্রথম চিন্তা করেন। তারা বিশ্বের মাতৃভাষাপ্রেমী সংস্থার মাধ্যমে জাতিসংঘের নিকট ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব উপস্থাপনের উদ্যোগ নেন। প্রস্তাবটি পেয়ে জাতিসংঘ কর্তৃপক্ষ জানায় এটি বাংলাদেশ সরকার দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবিত হতে হবে। এই সংবাদ জানার পর তৎকালীন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিক সরকার তড়িৎ গতিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। যার ফল হিসেবে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালের ১৫ নভেম্বর প্যারিসে তাাদের ৩০তম সাধারণ সভায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে সর্বসম্মতিক্রমে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তারপর থেকে পৃথিবীর ১৮৮টি দেশের ৬০০ কোটিরও অধিক মানুষ প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে।
ইউনেসকো কর্তৃক এই স্বীকৃতি বাংলা ভাষা আন্দোলনকে এবং তার উৎস-প্রতীক ২১ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্বজনতার বাক, বিবেক, লেখা, প্রকাশনের অলঙ্ঘনীয় অধিকারের স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সেদিন ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ইউনেস্কো বলেছিল: ‘মাতৃভাষা প্রচলন ও বিকাশের সকল প্রচেষ্টা কেবল ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহুভাষী শিক্ষাকে উৎসাহিত করবে না, তাদের বিশ্বব্যাপী বিকাশেও ভূমিকা পালন করবে এবং সংলাপ, সমঝোতা ও সহনশীলতার ভিত্তিতে সংহতিকে উৎসাহিত করবে।’
আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদার দাবি, স্বাধীকার সংগ্রাম ও আর্থ-সামাজিক অর্জনের ভিত্তি মহান একুশ। ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে আওয়ামী লিগের নেতৃত্বে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে তাদের প্রতিশ্রুত ২১-দফার প্রথম দফাই ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দান। অন্য কোনও উপায় না দেখে বাঙালির ভাষার দাবি মেনে ১৯৫৬ ও ১৯৬২ সালে পাকিস্তানে প্রথম ও দ্বিতীয় সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গৌরবোজ্জ্বল এই স্বীকৃতি আদায়ের পর ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঐতিহাসিক ৬-দফা ঘোষণা করেন। তারপর ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুথান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে সংবিধান সম্পর্কিত আইন গৃহীত হয়। সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়: এই প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ১৯৭১ সালে পাক-বাহিনী ও তাদের এ দেশিয় দোসর গোলাম আজম-নিজামীগং কর্তৃক ধ্বংসকৃত শহিদ মিনার বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭২ সালে পুনর্নিমাণ, সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রচলন, ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রথম বাংলায় ভাষণ-এই সবই প্রমাণ করে বাঙালির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি বাংলাভাষার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আপসহীন।
আজীবন মাতৃভাষাপ্রেমী এই মহান নেতা ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্বে, ১৯৪৮ সালে রাজপথের আন্দোলনে অংশ নেন এবং কারাবরণ করেন। পরে আইনসভার সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম ও র্মযাদা প্রতষ্ঠায় অতুলনীয় ভ‚মিকা রাখেন। এক কথায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ এবং গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হিসেবে প্রতিবারই জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। তাঁর সরকার বাংলাভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টায় ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলির নিজস্ব ভাষা চর্চার ব্যবস্থা করেন। তিনি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছেন, যেখানে হারিয়ে যাওয়া মাতৃভাষা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে।
অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের শিল্প, কলা, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে আমরা আরো উন্নতমানের করে শুধু আমাদের দেশে না, বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সাহিত্য আরও অনুবাদ হোক। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ আমাদের সাহিত্যকে জানুক, আমাদের সংস্কৃতিকে জানুক, সেটাই আমরা চাই।’
সেইসঙ্গে বলতে চাই, সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারদের রক্তের বিনিময়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছে। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
সেই ভাষার সম্মান আমাদের রাখতে হবে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আজও ষড়যন্ত্র চলছে। কয়েক মাস আগেও মাজারে হামলা হয়েছে। বাউলদের ওপর হামলা হয়েছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাআঘাত করা হচ্ছে, ছায়ানট ও উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনের অফিসে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে- এসব সেই পাকিস্তানি ভাবধারারই আগ্রাসন। এসব রুখে দিতে হবে। ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হবে।
লেখক: অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত।