বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিয়ে অনেক মায়াকান্না হয়েছে। গণতন্ত্র হত্যাকারীরা নিজেদের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা দাবি করেছে। সুশীল নামধারী কিছু ব্যক্তি নিকট অতীতে গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না ছাড়িয়ে রীতিমতো মরা-কান্না জুড়ে দিয়েছিল। কিন্তু কোথায় সেই গণতন্ত্র? কোথায় আইনের শাসন? কোথায় মানবাধিকার?

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 30 May 2025 00:23
এম নজরুল ইসলাম
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, এ দেশে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সংবাদপত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা স্বনির্ভরতা, উন্নয়ন ও নিজস্ব জাতীয়তাবাদ সৃষ্টির অনন্য রূপকার শহিদ জিয়া। যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা আর সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেছেন, সেই গণতন্ত্রের নিরবচ্ছিন্ন যাত্রা আজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রতি পদে পদে। শিগগিরই আমরা বাংলাদেশকে গণতন্ত্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত দেখতে পাব। এই হোক জিয়ার শাহাদাত বার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার। (সুত্র ও কৃতজ্ঞতা: দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইন, ২৯ মে, ২০২৫)।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিয়ে অনেক মায়াকান্না হয়েছে। গণতন্ত্র হত্যাকারীরা নিজেদের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা দাবি করেছে। সুশীল নামধারী কিছু ব্যক্তি নিকট অতীতে গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না ছাড়িয়ে রীতিমতো মরা-কান্না জুড়ে দিয়েছিল। কিন্তু কোথায় সেই গণতন্ত্র? কোথায় আইনের শাসন? কোথায় মানবাধিকার?
দেশের মানুষ আজ ভণ্ডদের স্বরূপ দেখছে। ভাঁওতাবাজির কুৎসিত চেহারা দেখছে। আর জীবন দিয়ে এদের কথায় বিশ্বাস করার পরিণতি ভোগ করছে।
আওয়ামী লিগের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে বিএনপি অনেক মিথ্যা বলেছে। বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি বিএনপি। অংশ নেয়নি উপজেলা নির্বাচনেও। বরং উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়া অনেক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপি নেতারা বলেছিলেন, আওয়ামী লিগ সরকারের অধীনে কোনও নির্বাচনে অংশ নেবে না দলটি। আর আজ এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দলটি নির্বাচন চেয়ে পাথরে মাথা কুটছে। কিন্তু নির্বাচনের সুস্পষ্ট কোনও আশ্বাসও পাচ্ছে না। পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, নবগঠিত এনসিপি, জামায়াতসহ সরকারের পক্ষের শক্তি যতদিন না বিএনপির চেয়ে শক্তিশালী হবে, নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারটি যতক্ষণ না নিশ্চিত হবে, ততদিন কোনও নির্বাচন হবে না।

১৯৭৭ সালের ৩০ মে, হ্যাঁ-না ভোটের ব্যালট বক্স।
যাক, সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। প্রশ্ন হল, বিএনপি আওয়ামী লিগ সরকারের অধীনে কোনও নির্বাচনে যেতে চায়নি কেন? আওয়ামী লিগের আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে বিএনপি যেসব দোষারোপ করে, সে সবের বাস্তব ভিত্তি কতটুকু? বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে কারা কলুষিত করেছে? কীভাবে করেছে?
একটু পেছনে তাকানো যাক। স্পষ্ট করেই দেখা যাবে, বাংলাদেশে কারা, কখন, কীভাবে নির্বাচনকে বিতর্কিত করেছে। কারা গণতন্ত্র হত্যা করেছে। কারা মানবাধিকারকে ভুলুণ্ঠিত করেছে। কারা নির্বাচনে হেরে যাবে বলে নির্বাচন বর্জন করেছে।
বাংলাদেশে সব সময় নির্বাচন বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করেছে বিএনপি। নির্বাচনে ভোট কারচুপি থেকে শুরু করে সব অনিয়মের জন্মদাতা বিএনপি। কারচুপি করে নির্বাচনে জেতার জন্য সোয়া কোটি ভুয়া ভোটার বানিয়েছিল বিএনপি। বিবিসি ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জনের মুখে যে কয়েকটি একতরফা ও বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেই তালিকায় রয়েছে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।’ ১৯৯৬ সালের ওই নির্বাচন নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের পাঁচ কোটি ভোটারের মধ্যে বেশির ভাগই ভোট দেননি।’ নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার ১০ শতাংশের কম হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় নিউ ইয়র্ক টাইমসের ওই প্রতিবেদনে। এর আগে আরও একটি নির্বাচন আছে। সেটি হচ্ছে, ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ, মাগুরা উপনির্বাচন। কারচুপি ও জালিয়াতির নিকৃষ্ট উদাহরণ ছিল সেই উপনির্বাচন।
নির্বাচন নিয়ে আরও একটু পেছনে তাকানো যাক। গণতন্ত্র হত্যাসহ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সব রকমভাবে দূষিত করেছেন যে ব্যক্তি, তাঁর নাম জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছিল। জিয়াউর রহমান ধর্মভিত্তিক দলগুলিকে রাজনীতিতে বৈধতা দেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন এমন ব্যক্তিদের জিয়াউর রহমানের শাসনামলে মন্ত্রী বানানো হয়েছে।

১৯৭৭ সালের ৩০ মে, হ্যাঁ-না ভোটের ব্যালট পেপার।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। সেদিন অদ্ভুত এক নির্বাচন প্রত্যক্ষ করে বাংলাদেশের মানুষ। দেশের রাষ্ট্রপতির প্রতি আস্থা ভোট বা গণভোট নামের একটি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এই ভোটে ভোটারদের কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি কি রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের (বীর-উত্তম) প্রতি এবং তাঁর দ্বারা গৃহীত নীতি ও কার্যক্রমের প্রতি আস্থাশীল? ভোটের ফল দেখানো হয় ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’। মোট ভোট প্রদানের হার দেখানো হয় ৮৮.১ শতাংশ। দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এই ভোটকে বলা হয়ে থাকে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। এই ‘হ্যাঁ-না’ ভোট নিয়ে আমার এক বন্ধুর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা এখানে তুলে ধরি। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক ও সাংবাদিক। তিনি তাঁর ১৩ জন বন্ধুকে নিয়ে যান ভোট দিতে। গিয়ে দেখেন ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। তাঁরা ভোটকেন্দ্রে হৈচৈ শুরু করে দেন। তখন তাঁদের প্রত্যেককে একটি করে ব্যালট পেপার দেওয়া হয়। তাঁরা ধরে নিলেন ওই কেন্দ্রে অন্তত ১৩টি ‘না’ ভোট তো নিশ্চিত। সন্ধ্যায় তাঁরা জানতে পারলেন, ওই কেন্দ্রে মোট ‘না’ ভোট পড়েছে মাত্র তিনটি। জিয়াউর রহমানের ‘হ্যাঁ-না’ ভোট বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে লজ্জাজনকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।
আরও একটু পেছনে তাকাই। বন্দুকের নলের মুখে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল। জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজেই এক সামরিক ফরমান জারি করে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেছিলেন। আবার নিজেই আরেক ফরমান জারি করে ঘোষণা দেন তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি। তাঁকে ভোট দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। তাঁর ইচ্ছা হয়েছে, তিনি চেয়ার দখল করেছেন। একসময় তাঁর মনে হয়েছে, বিষয়টা হালাল করা দরকার। তিনি ‘হ্যাঁ-না’ ভোট দেন। নিজেকে দেওয়া নিজের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ বৈধ করার জন্যই এই গণভোট বা আস্থা ভোটের আয়োজন। দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ও সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থায় দুষ্ট ক্ষত ১৯৭৭ সালের ৩০ মের গণভোট বা ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। কী আশ্চর্য, একদল বিদ্রোহী সেনা সদস্যের হাতে তাঁর নিহত হওয়ার দিনটিও ৩০ মে।

লেখক: এম নজরুল ইসলাম
লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি, এবং মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত।