Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

হাসিনা যেন ’৭৭-এর ইন্দিরা, ঘুরে দাঁড়াতে দিনরাত এক করে নজর দেশে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কথা

‘আপা এই যশোর, তো পরক্ষণে রাজশাহী। তারপর সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খুলনা, বরিশাল ঘুরে ঘরে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত।

হাসিনা যেন ’৭৭-এর ইন্দিরা, ঘুরে দাঁড়াতে দিনরাত এক করে নজর দেশে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কথা

ফাইল চিত্র

শেষ আপডেট: 17 January 2025 11:16

অমল সরকার


‘আপা এই যশোর, তো পরক্ষণে রাজশাহী। তারপর সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খুলনা, বরিশাল ঘুরে ঘরে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত। সকাল সাতটা-সাড়ে সাতটায় শুরু করছেন, রাত পর্যন্ত এইভাবে জেলার পর জেলা ঘুরে ঘুমতে যাচ্ছেন গভীর রাতে।’ বলেছিলেন আওয়ামী লিগের এক নেতা।

এই দলে ‘আপা’ অর্থাৎ বড়দি একজনই, শেখ হাসিনা। দলের ওই নেতা আপার ব্যস্ততার যে বর্ণনা দিলেন তা দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার। ৫ অগাস্ট বিকালে ভারতে পা রাখার পর থেকে এমনই ব্যস্ততার মধ্যে কাটছে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি দিন।

প্রধানমন্ত্রী, তারও আগে বিরোধী নেত্রী থাকাকালে কারাবাসের দিনগুলিতেও ফজরের নমাজ পাঠ করে দিন শুরু করতেন ধর্মপ্রাণা হাসিনা। এখনও দিন শুরু করছেন ফজরের নমাজ পাঠ দিয়ে। তারপর রুটিনে আমূল বদল। মোবাইলে চোখ রেখে গোটা দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। হাসিনার মোবাইল ফোনে দেশের খোঁজখবর রাখার বর্ণনা দিতেই দলের ওই নেতা এভাবে বলছিলেন, ‘আপা এই যশোর, তো পরক্ষণে রাজশাহী, তারপর সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, খুলনা, বরিশাল…….।

কখনও খুব সকালে কোনও নেতাকে ঘুম থেকে তুলে ফোনে বলছেন, ‘তোমার ওখানে রাতে পুলিশ যাদের গ্রেফতার করেছে আদালতে তাদের জামিনের জন্য উকিল দেওয়ার চেষ্টা করো। আর ওদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলো। সাহায্য সহযোগিতা কী লাগে জেনে নিও।’ এক নেতা বলেন, ‘পুলিশের অভিযানের এমন একটি ঘটনা আমার জানা ছিল না। আপার মুখে শুনে নিজেকে অপরাধী মনে হয়েছিল।

আর এক নেতা বলেন, ‘একদিন গভীর রাতে ফোনের রিংয়ে ঘুম ভাঙল। দেখি আপার ফোন। বললেন, ‘তোমার এলাকায় … বস্তিতে আগুন লেগেছে শুনলাম। কাল যেভাবে পারো বস্তির লোকেদের লেপ-কম্বল, গরম জামা-কাপড় পৌঁছে দিও।’ এক নেতার কথায়, ‘অনেক সময়ই আপার ফোনে আমাদের অস্তস্তিতে পড়তে হয়। আমার দু’বার এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে যে আপা আমার এলাকার ঘটনার কথা বলেছেন, দেশে থেকে আমি তখন সে ব্যাপারে কিছুই জানি না।

ঢাকায় মুজিব পরিবারের সঙ্গে ইন্দিরা

হাসিনার এইভাবে দলের জন্য দিনরাত এক করার কথা ভারতের কিছু নেতার কানেও পৌঁছেছে। কংগ্রেসের এক প্রবীণ নেতার কথায়, ‘দলের জন্য ওঁর (শেখ হাসিনার) এইভাবে দিনরাত এক করে খাটাখাটুনির কথা শুনে আমার মিসেস গান্ধীর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘১৯৭৭-এর নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয়, মিসেস গান্ধী নিজেও হেরে যাওয়ার পর দল চরম সংকটের মুখে পড়েছিল। জরুরি অবস্থার দিনগুলির অনাচার, অবিচারের কাহিনিকে রঙ চড়িয়ে কংগ্রেস ও নেত্রী ইন্দিরার মুণ্ডপাত চলছে। দলের একদা ছায়াসঙ্গী নেতারাও কেউ পাশে নেই।’ হাসিনার ক্ষেত্রে অবশ্য তা হয়নি। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান, তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেও দলে হাসিনার নেতৃত্ব নিয়ে একজনও প্রশ্ন তোলেননি।

সেই কংগ্রেস নেতা আরও বলেন, ‘মিসেস গান্ধী কিন্তু সেই সব দিনে দমে যাননি। মামলা-মোকদ্দমায় জেরবার ইন্দিরা নিজেই দেশের নানা প্রান্তে সাধারণ কংগ্রেস কর্মীদের পাশে পৌঁছে গিয়েছিলেন।’ প্রবীণ কংগ্রেস নেতার কথায়, ‘এমনও হয়েছে, অনেক রাজ্যে তাঁর সফরসঙ্গী হতে স্থানীয় নেতারা আগ্রহ দেখাতেন না। সেটা জেনেও তিনি দিল্লি থেকে ট্রেনে রওনা দিতেন। তখন খুব সকালে বা গভীর রাতে কংগ্রেস নেতাদের ফোন বেজে উঠলে ধরে নেওয়া হত মিসেস গান্ধীর ফোন।’ ইন্দিরার বয়স তখন ষাট। বয়সের সরকারি মানদণ্ডে সিনিয়র সিনিজেন। লড়াই করে তিন বছরের মাথায় ফের দিল্লির মসনদে ফিরে এসেছিলেন। কংগ্রেসের ওই নেতা যোগ করেন, ‘শেখ হাসিনার জীবনে মিসেস গান্ধীর অবদান বিরাট। বঙ্গবন্ধ নিহত হওয়ার পর হাসিনা ও তাঁর বোনকে দিল্লিতে এনে রেখেছিলেন তিনি। তখন দেশে ফিরলে হয়তো তাঁদেরও বাবা-মায়ের পরিণতি হত।’

শেখ হাসিনা প্রবীণ নাগরিক হয়েছেন ১৭ বছর আগে। দেশে তো নয়ই, এমনকী ভারতেও তাঁর ছুটে বেড়ানোর সুযোগ নেই। নিরাপত্তার কারণেই ভারত সরকার তাঁকে দিল্লির একটি ‘সেফ হাউসে’ রেখেছে। সেখান থেকেই স্বদেশের নানা প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন প্রযুক্তির সাহায্যে। ৭৭ বছর বয়সেও মোবাইলে ১৭ বছরের কিশোর-কিশোরীর মতো স্বচ্ছন্দ। খাটাখাটুনিতেও তাই। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে ক্লান্তিহীন। শুধু কী বাংলাদেশ, আওয়ামী লিগের বিদেশি ইউনিটের নেতাদের সঙ্গেও প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছেন। ফোনে তাঁর ব্যস্ততার ঘটনা ভার্চুয়াল সভাতেও ধরা পড়েছে। নিউ ইয়র্কের একটি সভায় ভাষণ দেওয়ার সময় দু’বার লাইন কেটে গিয়েছিল। পরে যুক্ত হয়ে বলেছেন, ‘অন্য ফোন ঢুকে গিয়েছিল। আমার ফোন এক মুহূর্ত বিশ্রাম পায় না।’

নেত্রীকে এই ভাবে দিনরাত এক করে দলের জন্য নিরলস পরিশ্রম করতে দেখে নেতারা যেমন উজ্জীবিত, চিন্তিতও বটে। অনেকেই তাঁকে ব্যস্ততা কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এক নেতার কথায়, ‘দিল্লির বাংলোর চার দেওয়ালের মধ্যে এই বয়সেও আপার ব্যস্ততা প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী নেত্রী হাসিনাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। তার উপর ফোন ধরা, ফোন করা সব নিজের হাতে করছেন। দলের সংকটে ব্যস্ততম সময় পাড় করছেন তিনি।

দিল্লি থেকে হাসিনার দেশের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের অন্যতম উপায় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। দেশে জেলার সংখ্যা ৬৪ হলেও আওয়ামী লিগের সাংগঠনিক জেলা ৭৮টি। প্রতিটির জন্য পৃথক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি হয়েছে। হাসিনা তাতে শুধু আছেন তাই-ই নয়, নিয়মিত সক্রিয়। কোনও গ্রুপকে অ্যাকটিভ দেখলেই সেখানে সক্রিয় হচ্ছেন। নির্দেশ দিচ্ছেন। কখনও মুক্তিযুদ্ধ তো কখনও সংকটে আওয়ামী লিগের ঘুরে দাঁড়ানোর বিবরণ-সহ লেখা শেয়ার করছেন। স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন দলের ও দেশের স্মরণীয় দিনগুলির কথা। গত ১০ নভেম্বর শহিদ নূর হোসেন দিবসের কথা তিনিই মনে করিয়ে দিয়ে কর্মসূচি নিতে বলেছিলেন নেতাদের। ইউনুস সরকার এবং বিএনপি-জামাত-বৈষম্য বিরোধী ছাত্রদের বাধায় সেই কর্মসূচি সফলভাবে পালন করা যায়নি।

এক নেতা বলেন, এমনও হয়েছে, গ্রুপে কোনও বিষয়ে নানা মুনির নানা মত দেখে আপা থামিয়ে দিয়ে লিখেছেন, কী করতে হবে। হামেসাই হোয়াটসঅ্যাপের গ্রুপ কলে যোগ দিয়ে সরাসরি জেলা নেতাদের মুখ থেকে দেশের কথা শুনছেন। আপার গলা শুনলেই উৎসাহ বেড়ে যাচ্ছে।

নেতারা লক্ষ্য করেছেন, নেত্রীর ভাষণ, নির্দেশনায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। ইউনুস সরকারকে আক্রমণের পাশাপাশি সাধারণ দেশবাসীর দুর্দশার কথা বেশি বলছেন। ‘চালের কেজি একশো টাকা। হাসিনাকে সরিয়ে তবে লাভ কী হল। এমন তো ছিল না,’ জাতীয় মন্তব্যে ভরে গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। তার উপর ইউনুস সরকার একশোটির উপর পণ্যে চড়া হারে কর বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে হাসিনা দলকে প্রচারের যে বার্তা বাতলে দিয়েছেন তার মোদ্দা কথা, ‘কেমন ছিলেন! কেমন আছেন!’ ভাষণে বলেছেন, ‘মানুষের কাছে যান। তাদের বলুন আমার সময় কেমন ছিলেন আর এখন কেমন আছেন। আমার সময় মানুষ কি কুকুরের সঙ্গে লড়াই করে ডাস্টবিনের খাবার খেত? আমি কি এই বাংলাদেশ রেখে এসেছিলাম?’

হাসিনার দিনরাত খাটাখাটুনি নিয়ে দিন দুই আগে অনেকে তাঁকে বলেছেন, আপা ব্যস্ততা কমান। বেশি রাত জাগবেন না। আগামী রবিবার হাসিনা ফের ভার্চুয়াল সভায় ভাষণ দেবেন। প্রথম সভা বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে বারোটায়। দক্ষিণ কোরিয়া আওয়ামী লিগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন তিনি। ওই দিনই সন্ধ্যা সাড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ও রাত সাড়ে ন’টায় জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে আওয়ামী লিগের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ভাষণ দেবেন। দলের অনেকেই বলেছিলেন, কী দরকার একদিনে তিনটি সভা করার। হাসিনা শোনেননি। এক নেতার কথায়, ‘আমরা ঘরোয়া আলোচনায় এখন কর্মীদের নেত্রীর ব্যস্ততার কথাই সবচেয়ে বেশি বলছি। ৭৭ বছর বয়সেও তিনি যেভাবে দিনরাত এক করে দলের জন্য নিবেদিত, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রেরণা।

আওয়ামী লিগে এই তিন সভা নিয়ে তুমুল আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে দল। আগের সভাগুলি হয়েছে বাংলাদেশ সময়ে গভীর রাতে। এই তিন সভার সময় ঠিক করা হয়েছে দেশের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সুবিধা বিবেচনায় রেখে। হাসিনা এই তিন সভায় দলের নেতা-কর্মীর পাশাপাশি দেশবাসীর উদ্দেশে বার্তা দিতে পারেন বলে মনে করছেন নেতারা। তবে গুঞ্জন থাকলেও দলে ব়ড সাংগঠনিক পরিবর্তন করবেন বলে প্রথমসারির নেতারা অনেকেই মনে করছেন না। তবে শেষ কথা হাসিনাই বলবেন।


```