
সংগৃহীত ছবি
শেষ আপডেট: 2 December 2024 11:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জেনেভায় রাষ্ট্রসংঘের সংখ্যালঘু ফোরামের বৈঠকে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নিপীড়ন নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছে বিশ্বের একাধিক দেশের প্রতিনিধি। সেখানে রাষ্টসংঘের দফতরের বাইরে প্রবল বিক্ষোভ হয়েছে। ব্রিটেনের পার্লামেন্টে বাংদেশের হিন্দুদের উপর নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরে সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনজন এমপি। কানাডা, সুইজারল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের একাধিক জায়গায় রাস্তায় মিছিল, গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় লাগাতার বিক্ষোভ চলছে। দেশে বাংলাদেশে দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে। ব্রিটেনের এমপিরা বাংলাদেশের বিষয়ে সরকাররে হস্তক্ষেপ করার দাবি জানিয়েছেন।
মহম্মদ ইউনুস সরকারের অভিযোগ, এই সব প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পিছনে আছে ভারত ও আওয়ামী লিগের মদত। তাদের প্রত্যক্ষ মদতে এগুলি সংঘঠিত হচ্ছে। ফলে গোটা বিশ্বেই বাংলাদেশে সংখ্যলঘু নিপীড়ন এখন অন্যতম আলোচনা। ইউনুস সরকারের অভিযোগ, ভারত ও আওয়ামী লিগ দেশে দেশে লবিস্ট নিয়োগ করেছে। তারাই বিভিন্ন দেশে সাংসদ, প্রথমসারির রাজনীতিক, কূটনীতিকদের বাংলাদেশ নিয়ে ছবি তুলে ধরছেন। হঠাৎ করেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। শেখ হাসিনা বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের উদ্দেশে ভার্চুয়াল মাধ্যমে ভাষণ দিচ্ছেন।
পাকিস্তানে হিন্দুসহ সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন, নির্যাতনে ঘটনায় নিয়ে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বমঞ্চে সরব। বাংলাদেশ এই ব্যাপারে দ্বিতীয় পাকিস্তান হয়ে উঠেছে বলে ভারতের প্রচার যথেষ্ট সাড়া ফেলে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে পাল্টা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা এবং ‘সত্য’ তুলে ধরতে সোমবার ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডেকেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হাসানা। ঢাকায় ভারত-সহ সব দূতাবাসের কর্তাদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার বৈঠকে যোগ দেবেন কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে বৈঠকে স্বয়ং ইউনুসই পৌরহিত্ব করতে পারেন।
বৈঠকে হিন্দুদের উপর নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করবে সরকার। হিন্দুদের উপর নির্যাতনের ঘটনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণে বিগত জমানার সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর তুলনামূলক বর্ণনা তুলে ধরে বিদেশে কূটনীতিকদের সামনে তুলে ধরা হবে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা বিগত জমানার তুলনায় অনেক ভাল আছে। হামলার ঘটনা কম হয়েছে এবং প্রতিটি ঘটনায় পুলিশ ও সেনা ব্যবস্থা নিয়েছে। বিগত বহু বছর পর বাংলাদেশে দুর্গাপুজো অত্যন্ত নির্বিঘ্নে পালিত হয়েছে। চট্টগ্রামে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেফতারের জেরে এক আইনজীবী হত্যার পর সাম্প্রদায়িক সংহিসতার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তা ঠেকানো গিয়েছে প্রশাসন এবং সব দলের সহযোগিতায়।
ইউনুস সরকার মনে করছে, তারপরও সংখ্যালঘু নিপীড়নের অভিযোগ ঘিকে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় ‘পাকিস্তান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গিয়েছে। পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে এর আগে একাধিকবার ইসলামাবাদ রাষ্ট্রসংঘের বৈঠকে সমালোচনার মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ নিয়েও এখন দেশে দেশে আলোচনা সে দেশে সংখ্যালঘু নিপীড়নের ঘটনা। তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ভারত, যা বাংলাদেশের জন্য ভাবমূর্তি সংকটের কারণ হয়েছে। এর জেরে বিদেশি সহায়তা আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় উড়িয়ে দিচ্ছেন না ঢাকার কর্মকর্তারা।
এরমধ্যে সবচেয়ে অস্বস্তিতে ফেলেছে হত শনিবার জেনিভায় রাষ্ট্রসংঘের সংখ্যালঘু বিষয়ক ফোরানে বাংলাদেশ নিয়ে একাধিক ব্যক্তি ও সংগঠনের সরব হওয়া। সেখানে বাংলাদেশ নিয়ে কুড়িজন বক্তা সরব হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, ফ্রান্সে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আদতে সিলেটের বাসিন্দা সেকুলার বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠনের নেত্রী পুষ্পিতা গুন্ত ও প্রিয়জ্যোতি দে সরকার এবং বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের তরুণ আইনজীবী রায়হান রশিদ তথ্য পরিসংখ্যান দিয়ে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনাগুলি তুলে ধরেন।
সরব হন মার্কিন প্রবাসী সিতাংশ গুহ ও দিলীপ কর্মকার, কানায় বসবাসকারী অগাস্টিনা চাকমা প্রমুখ। এছাড়াও অরুণ বড়ুয়া, সসীম বড়ুয়া, সুমন চাকমা, দিলীপ ধর, পলাশ বড়ুয়া সমীরণ বড়ুয়া, যীশু রহমান, অমন্দ্র রায়, দীপেন মিত্র প্রমুখ ইতালি থেকে জেনিভায় গিয়েছিলেন বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনা রাষ্ট্রসংঘের বৈঠকে তুলে ধরতে। জানা যাচ্ছে, জেনিভার সম্মেলনে হিন্দু নিপীড়নের নালিশ বাংলাদেশ সরকারকে চরম অস্বস্তিতে ফেলেছে। সেই সব অভিযোগ খণ্ডন করতেই সোমবারের বৈঠকের আয়োজন।
যদিও সংখ্যালঘুদের সংগঠনগুলি ভিন্ন কথা বলছে। বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট রবিবার রাতেও হিন্দুদের উপর নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে সরব হয়েছে। তাদের অভিযোগ, গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম আদালতে এক মুসলিম আইনজীবীকে হত্যার ঘটনার জেরে পাঁচটি মামলা হয়েছে। তার একটিতে ইসকনের বহিষ্কৃত সাধু চিন্ময় কৃষ্ণকে আদালতে পেশ করার দিন তাঁর জামিনের দাবিতে সরব আইনজীবীদের প্রত্যেকের নামে বিস্ফোরক আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অথচ, গত মঙ্গলবার আদালত চত্ত্বরে পুলিশ-সেনা এবং জামাত-বিএনপির সংখ্যালঘু আইনজীবী ও চিন্ময় ভক্তদের উপর নির্মম অত্যাচার নিয়ে একটিও মামলা হয়নি। আক্রান্ত আইনজীবীরা মামলা করতে গেলে তা গ্রহণ করা হয়নি। উল্টে চিন্ময়ের ৭০ জন আইনজীবীর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে, যাঁরা সকলেই হিন্দু।
সোমবার বিদেশে কূটনীতিকদের সামনে কী বলবে বাংলাদেশ সরকার। ঢাকার সরকারি সূত্রের খবর, অন্তবর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুস নিজে বৈঠকে অংশ নিতে পারেন। সরকারের বক্তব্য, সংখ্যালঘুদের উপর হামলার যে ঘটনাগুলি নিয়ে অভিযোগ করা হচ্ছে সেগুলির পিছনে ধর্ম কোনও কারণ ছিল না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঘটনায় পুরোপুরি লাগাম টানা যায়নি। রাজনৈতিক কারণে হিন্দুরাও হামলার শিকার হয়েছেন।