
শেষ আপডেট: 14 November 2024 16:30
মাত্র তিন মাসেই বাংলাদেশে রাজনীতি বাঁক নিতে শুরু করেছে। অবস্থান বদলে ফের কাছাকাছি আসতে চলেছে বিএনপি এবং বাংলাদেশে জমিয়তে ইসলামি। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বকেও পাশে চাইছে বিএনপি-জামাত। লক্ষ্য হল, গ্র্যান্ড অ্যালায়েন্স বা মহাজোট গড়ে জাতীয় সংসদের আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লিগ এবং জাতীয় পার্টি-সহ তাদের যাবতীয় ‘দোসর’-দের নির্বাচনী ময়দান থেকে নির্মূল করে দেওয়া। এই লক্ষ্যে দুই দল মাত্র তিন মাসের মধ্যেই অবস্থান বদলে কাছাকাছি আসার পাশাপাশি এক সুরে ভারত বিরোধিতার গলা চড়িয়েছে। সেই সঙ্গে মহম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধেও সুর নরম করার কৌশল নিয়েছে খালেদা জিয়া-তারেক জিয়ার পার্টি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেছেন হাসিনা বিহীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত নানাভাবে ষড়যন্ত্র করে চলেছে। ভারতে বসে শেখ হাসিনাও দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব।
তাৎপর্যপূর্ণ হল বাংলাদেশে বসে বিএনপি মহাসচিব এই কথা বলার কয়েক ঘণ্টার মাথায় লন্ডনে জামাতের আমির ডা: শফিকুর রহমানও নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘আমরা ভারত সরকারের সঙ্গে সু-সম্পর্ক চাইলেও তাদের কোনও উৎসাহ নেই। তারা শুধু শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে ব্যস্ত।’
জামাতের আমিরের একপ্রকার বিনা নোটিসে লন্ডন সফর নিয়ে তুমুল কৌতূহল তৈরি হয়েছে। জানা যাচ্ছে লন্ডন প্রবাসী বিএনপি-র কার্যনির্বাহী সভাপতি তারেক জিয়ার সঙ্গে জামাতের আমিরের মুখোমুখি বৈঠক হবে। সেখানেই দু-দলের মধ্যে কথা হবে নির্বাচনী বোঝাপড়া নিয়ে।
সাড়ে তিন মাস আগে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামাতের আমির ডাঃ শফিুকুর রহমান দু’জনেই ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের বার্তা দিয়ে অনুযোগ করেছিলেন বৃহত্তম প্রতিবেশী দেশটি শুধু আওয়ামী লিগ ও শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। কালক্ষেপ না করে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিল ভারতও। নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বিএনপি-জামাত নেতাদের বক্তব্যের জবাবে বলেছিলেন, ভারত সকলের সঙ্গে সু-সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী। দু’দিনের মাথায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার প্রণয় ভার্মা বিএনপি অফিসে গিয়ে দলের নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করে আসেন। সেই থেকে বিএনপি-জামাত ভারতের বিরুদ্ধে মুখ খোলা বন্ধ রেখেছিল। ভারতীয় পণ্য বয়কটের অভিযানেও সমর্থন দেওয়া বন্ধ রাখে দল দুটি।
লক্ষণীয় ছিল, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের বার্তা দিলেও বিএনপি ও জামাতের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক আগের মতোই বৈরিতায় ভরা ছিল। অতীতে দুই দল জোট করে ভোটে লড়াই এবং সরকার চালালেও হাসিনা দেশ ছাড়ার পর তাদের বৈরিতা আরও বেডযে যায়। রাজনীতির ময়দানে আওয়ামী লিগের অনুপস্থিতির সুযোগে দুই দলই নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে একে অপরের দিকে পেশি আস্ফালন শুরু করে। এমনকী বিএনপি মহাসচিব বিরক্তির সুরে জামাত সম্পর্কে মন্তব্য করেন, যাদের নিজের জোরে সংসদের একটা আসন পাওয়ার ক্ষমতা নেই তারা বড় বড় কথা বলছে। কিন্তু হঠাৎ করেই এক সুরে ভারত বিরোধিতায় গলা চড়িয়ে দু-দল কাছাকাছি আসার বার্তা দিতে শুরু করেছে।
জানা যাচ্ছে, বিএনপি ও জামাতের এই ভোল বদলের পিছনে আছে পাকিস্তান। ঢাকার পাক দূতাবাস এখন খুবই সক্রিয়। আমেরিকার ভোটের ফল প্রকাশের পর ঢাকার মার্কিন দূতাবাস অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন সরকারের পরামর্শের অপেক্ষায় আছে। এই পরিস্থিতিতে ঢাকার পাক হাই-কমিশন অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতিতে। তারা পাশে পেয়ে গিয়েছে চিনকে। বাংলাদেশে চিন বরাবর পাক দূতাবাসকে সামনে রেখে অপারেট করে। চিন চাইছে, হাসিনাবিহীন বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা আরও বাড়িয়ে নিতে। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাস খানেক আগে চিন সফরে গিয়ে বেজিংয়ের কর্তাদের নিরাশ করে আসেন। বাংলাদেশের তিস্তা মহাপ্রকল্প রূপায়ণে চিনের আগ্রহে দল ঢেলে তিনি ভারতকে ওই কাজের জন্য বেছে নেন। তাতে বেজায় চটে আসে চিন। বেজিং মনে করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শাসকদের সঙ্গে এখন থেকেই সু-সম্পর্ক গড়ে রাখতে।
ঢাকায় পাক দূতাবাসের উদ্যোগে একদিকে নানা সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে, অন্যদিকে, আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে বাকি দলগুলিতে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছে ইসলামাবাদ। তারা মনে করছে বাংলাদেশকে আওয়ামী লিগ এবং শেখ মুজিবুরের রাজনীতি মুক্ত করার সুবর্ণ সুযোগ এসেছে, যার জন্য তারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পাক দূতাবাসের পরামর্শেই বিএনপি ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধেও সুর নরম করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দলীয় সূত্রের খবর।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, বিএনপি এবং জামাতও বৃহত্তর স্বার্থে তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসছে। হাসিনা দেশত্যাগ করার পর বিএনপি মনে করেছিল অম্তর্বর্তী সরকার দ্রুত নির্বাচন করালে তারা ড্যাং ড্যাং করে ক্ষমতায় চলে আসবে। কিন্তু ভোট নিয়ে মহন্মদ ইউনুসের সরকার এখনও উচ্চবাচ্য করছে না। উল্টে ইউনুস মাত্র তিনমাসেই প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে জামাতের লোকজনকে বসিয়ে দিয়েছেন। ফলে প্রশাসনের রাশ এখন জামাতের হাতে। উগ্র ইসলামি দলটির বড় শক্তি বাংলাদেশ সেনা। বাহিনীর মাঝারি ও নিচুতলায় জামাতের এখনকার মতো প্রভাব অতীতে কখনও ছিল না।
কিন্তু ভোটের ময়দানে জামাত এখনও সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। পাক সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের কর্তারা বিএনপি-কে বুঝিয়েছেন ভবিষ্যতে তারা ক্ষমতা হাতে পেলে প্রশাসন চালাতে জামাতকে পাশে দরকার হবে। আবার জামাত নেতাদের আইএসআই বুঝিয়েছে, ভোটে জিততে হলে তাদের বিএনপি-র সহায়তা দরকার। আর আওয়ামী লিগকে ভোটের ময়দানে নিকেশ করতে হলে সমান জরুরি ভারত বিরোধিতাও।
পাক হাই কমিশন বিএনপি-জামাতের সঙ্গে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মধ্যেও বোঝাপড়া গড়ে তুলতে আগ্রহী। ওই ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব আওয়ামী লিগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি জানিয়ে রেখেছে। কিন্তু জামাত ও বিএনপি এই দাবির সঙ্গে সহমত নয়। ছাত্ররা একটি রাজনৈতিক দল গড়ার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছে। বিএনপি ও জামাতের এই ব্যাপারেও আপত্তি আছে। তারা মনে করছে ছাত্ররা দল গড়লে আওয়ামী লিগ বিরোধী বোঝাপড়ায় ফাটল ধরে যেতে পারে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর, গত সপ্তাহে ঢাকায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের ঘরোয়া বৈঠক হয়েছে। সেখানে ছাত্রদের বোঝানো হয়েছে, তারা দল না গড়ে বিএনপি-জামাতের মহাজোটে শামিল হলে সব আসনেই আওয়ামী লিগের জমানত বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হবে। নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেই বরং আওয়ামা লিগ সহানুভুতির হাওয়া গায়ে মেখে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
লক্ষ্যণীয় গত ১০ নভেম্বর ছিল বিএনপি-জামাত-ছাত্র’দের বোঝাপড়ার মহড়া। ওই দিন ঢাকায় শহিদ নূর হোসেন দিবসে জিরো পয়েন্টে জমায়েতের ডাক দিয়েছিল আওয়ামী লিগ। সাবেক শাসক দলের সেই কর্মসূচি মারধর, মাঠ দখল করে ভেস্তে দেয় বিএনপি-জামাত-ছাত্র জোট।
সেদিন লক্ষ্য করা গিয়েছে, সাড়ে তিন মাস আগে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছত্রছায়ায় ছাত্র-জনতার অভ্যত্থান হলেও এখন নেতৃত্বের পাশে শুধু ছাত্ররা আছে। তাদের জনতা ধার করতে হয়েছে বিএনপি-র কাছ থেকে। সেই কারণে ছাত্ররা দল গড়লে সাধারণ মানুষের সমর্থন কতটা মিলবে তা নিয়েও সংশয় আছে। ফলে ছাত্ররাও নতুন দল গড়ার বিষয়ে দ্বিধান্বিত। বিস্বস্ত সূত্রের খবর, ঢাকায় বিএনপি নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে ছাত্ররা কথা দিয়েছে তারা ‘ইউনুস স্যার’কে বোঝাবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। বুধবারই কাজাখস্তানে জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে মহম্মদ ইউনুস বলেছেন, ভোট ঘোষণার আগে তাঁর সরকার নির্বাচনী ব্যবস্থার নূনতম ব্যবস্থা করে দিয়ে যেতে চায়। এখন দেখার বিএনপি-জামাত-ছাত্র জোট আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী মহাজোট ঘোষণা করে কিনা।