
ইউনুস এবন মুজিবুর রহমান
শেষ আপডেট: 15 December 2024 15:14
আগামীকাল সোমবার বাংলাদেশ ও ভারত যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয়ের ৫৪ তম বার্ষিকী পালন করতে চলেছে তখন রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ দু’দেশের সম্পর্ক স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে শীতল। ভারতের বিদেশ সচিবের গত সোমবারের একদিনের ঢাকা সফর শীতলতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। সেই সফর এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হয়, যখন বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় পণ্য বর্জনের প্রচার এবং পোড়ানো চলছে, ঢাকায় ভারতের হাই কমিশন এবং ত্রিপুরা রাজ্য অভিযানের ডাক দিয়েছে দেশের বিগত শাসক দল বিএনপি।
এমন বিরক্তিকর পরিস্থিতিতেও ভারত সরকার বিদেশ সচিবের ঢাকায় ফরেন অফিস কনসালটেশনের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করেনি। কারণ প্রতিবেশী বদলানো যায় না এবং পড়শি দেশের শাসন ক্ষমতায় যাঁরাই থাকুক ভারত তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কাজ করে। যেমন, কারগিল যুদ্ধের খলনায়ক পাকিস্তানের সেনা প্রধান পারভেজ মোসারফ দেশটির প্রেসিডেন্ট হলে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী তাঁর সঙ্গেই আগ্রায় শীর্ষ বৈঠক করেছিলেন, কূটনীতিতে যা বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
আসলে কূটনীতিতে আলোচনার সূত্রপাত হওয়াটাই আসল। সমস্যার জটিলতা অনেকটা দূর হয়ে যায় আলোচনার বল গড়াতে শুরু করলে। বহু ক্ষেত্রে দু-পক্ষই আলোচনার টেবিলে বোকা বনে যায় যখন উপলব্ধি করে বৃথাই জেদাজেদি চলছিল। সংখ্যালঘু নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপগুলি থেকে স্পষ্ট ভারতের বার্তাকে ঢাকার বর্তমান নেতৃত্ব উপলব্ধি করবে।
ভারতের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন-সহ ইউরোপ-আমেরিকার বহু দেশ সংখ্যালঘু নিপীড়নের ঘটনায় সরব হওয়ার পর মহম্মদ ইউনুসের সরকার অবস্থান বদলে বাধ্য হয়েছে। অতিরঞ্জনের অভিযোগ থেকে সরে এসে হামলাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে ঢাকা। আশা করা যায়, এই পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।
তারপরেও, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাধ্যবাধকতায় ভারত বিরোধিতায় পুরোপুরি লাগাম পরা কঠিন। ইউনুস সরকার যে দুটি ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলছে সেই জামায়াতে ইসলামি এবং বিএনপি-র কোর রাজনীতির অংশ হল ভারত বিরোধিতা। ভারত বিরোধী অবস্থানকে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রাপ্তিগুলির বিরোধিতার সঙ্গে জুড়ে নিয়েছে। যেমন মহম্মদ ইউনুস ও তাঁর সরকারের উপদেষ্টাগন এবং বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লিগের রাজনীতি নিকেশ করতে নেমে দেশের শিকড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলতে উদ্যত হয়েছেন। তাঁরা কোনও রাজনৈতিক দলের অংশ না হলেও একই রাজনৈতিক মতাদর্শের শরিক। স্বাধীনতার ৫৪ বছরের মাথায় বাংলাদেশ একদল কালীদাসের হাতে জিম্মি যাঁরা যে ডালে বসে, সেটিই কাটতে উদ্যত।
প্রশ্ন, সংশয় তাই সঙ্গত যে সোমবার বিজয় দিবসে ইউনুস ও তাঁর সরকারি-বেসরকারি সহযোগীরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবেন কিনা। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীন বাংলাদেশ হয়ে ওঠার প্রসব বেদনা লাঘব করতে পাক সেনার বিরুদ্ধে শুধু ভারতের জওয়ানেরাই লড়াই করেছে, জীবন দিয়েছে, তাই নয়, সমগ্র ভারতবাসী সক্ষমতা অনুযায়ী অবদান রেখেছে। যে এক কোটি শরণার্থী সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসেন, শুধু সরকারি সাহায্যে তাদের বেঁচে থাকা কঠিন ছিল যদি না সাধারণ মানুষ পাশে দাঁড়াতেন। সেই ভারতে কিন্তু প্রায় অর্ধেক ভারতবাসীর দু’বেলা পর্যাপ্ত খাবার জুটত না। ’৭১-এর শরণার্থীর বোঝা এপারে যে মানুষ বহন করেছে ২৪ বছর আগে দেশভাগের দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে তখনও তাদের মুক্তি মেলেনি। বহু পরিবার দু-বেলা না খেয়ে কাটাত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এটাও এক অনন্য প্রাপ্তি যে এপারে নিরন্ন মানুষ অপারের অভুক্তদের দেখে ভাতের থালা লুকোয়নি। তাই এপারেও বিজয় দিবস উদযাপনকে শুধু সেনা কুচকাওয়াজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাটা ইতিহাসের অবমাননা।
বাংলাদেশ এবার সেটাও করছে না। স্বাধীনতার পর একমাত্র করোনা-কাল বাদে এই প্রথম ১৬ ডিসেম্বর সে দেশে বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হবে না। বাংলাদেশের সেনা বাহিনী বিগত ৫৪ বছরে একটিই যুদ্ধ করেছে। জন্মকালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেই একমাত্র যুদ্ধের সাফল্যই তাদের সম্বল। সেনার সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে ছিল পুলিশ, আনসার ইত্যাদি বাহিনী। বলা হচ্ছে, সেনা বাহিনী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত তাই, বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ এবার বন্ধ থাকছে।
সরকারি ব্যাখ্যা বিশ্বাস করা কঠিন, কারণ, কুচকাওয়াজের জন্য হাজার হাজার সেনার দরকার পড়ে না। আসল কারণটি সম্ভবত ভিন্ন: সদ্য পিরিত হওয়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়কে ইউনুস সরকার বড় করে তুলে ধরতে চাইছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিগত চার মাসের পদক্ষেপগুলি পর্যবেক্ষণ করলে বুঝতে অসুবিধান হয় না, মহম্মদ ইউনুস এবং তাঁর সরকারের প্রশাসনিক ও বৌদ্ধিক উপদেষ্টারা আসলে বাংলাদেশের জন্মকেই অস্বীকার করতে চাইছেন। স্বভাবতই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিরুদ্ধেই তাঁরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন এযাবৎ গৃহীত নানা পদক্ষেপে।
বাংলাদেশের স্বনামধন্য কবি, প্রাবন্ধিক, রাজনীতির পণ্ডিত ফরহাদ মজহারের সঙ্গে দিন কয়েক আগে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার সৌভাগ্য হল। তিনি ইউনুস সরকারের স্বঘোষিত পৃষ্ঠপোষক। আর এক অসরকারি উপদেষ্টা জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে ফরহাদ মজাহারের আদর্শগত অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রথমজন সফট, দ্বিতীয়জন হার্ড ইসলামের পক্ষে। তবে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে তাঁদের অবস্থান অভিন্ন।
দু’জনেরই ঘোর আপত্তি সংবিধানের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি নিয়ে। এপারে অমিত শাহদের মতো মজাহারও মনে করেন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ পশ্চিমি ধারণা। তাঁর কথায় গণতন্ত্র, ন্যায়ের শাসন থাকলে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু সংশোধনের পরও বাংলাদেশের সংবিধানে ইসলাম রাষ্ট্র ধর্ম থাকবে কি না, এই প্রসঙ্গ তিনি স্বযত্নে এড়িয়ে যান। অন্যদিকে, সংবিধান সংশোধনের অপেক্ষায় না থেকে ইউনুস সরকার তড়িঘড়ি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি বাদ দিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। ইউনুস সরকারের দাবি মেনেই সুপ্রিম কোর্ট যেমন বলেছে, ‘জয় বাংলা’ আর বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান নয়, মুক্তিযুদ্ধে যে শব্দ দুটি তিরিশ লাখ বাঙালিকে জীবন উৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। স্বাধীনতাকে রক্তপাত দিয়ে মাপা হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম অতুলনীয়।
৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের আনন্দ উদযাপনে যে মানুষ শেখ মুজিবুরের ধানমণ্ডির বাড়ি ভাঙচুর, আগুন ধরিয়ে দিল, গত চার মাসে ইউনুস ও তাঁর কতিপয় উপদেষ্টার কথা ও কাজে বোঝা গিয়েছে, ইতিহাসের স্মারকগুলি ধ্বংস করাতে বিকৃত মানসিকতার ওই উচ্ছৃঙ্খল জনতার সঙ্গে তাঁদের কোনও ফারাক নেই। রক্তপাত যেমন হিংসার পূর্ব শর্ত নয়, তেমনই ইতিহাসের স্মারকগুলি ধ্বংস করে অতীতকে মুছে দিতে হাতুড়ি-কোদাল-শাবলের প্রয়োজন পড়ে না। উপদেষ্টা, আমলার কলমের খোঁচাই যথেষ্ট।
৭ মার্চ (ঢাকার সমাবেশে স্বাধীনতা ও মুক্তির ডাক দিয়ে শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভাষণ), ১৫ অগাস্ট (বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার দিন)-এর রাষ্ট্রীয় ছুটি বাতিলের সিদ্ধান্তের থেকেও অবাক করেছে দিবস উদযাপনের সরকারি তালিকা থেকে দিনগুলিকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত। ৫৪ বছরের স্বল্পকালীন জীবনে সেই মানুষটির সঙ্গে লড়াইয়ে পরাজিতরা আজ তাঁর স্মৃতি উপড়ে ফেলে বীরত্ব ফলাতে ব্যস্ত।
শনিবার শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসে ইউনুস সরকারের উদ্যোগ-আয়োজন দেখে গোড়ায় মনে হয়েছিল সুমতি ফিরেছে। বেলা বাড়তে দেখা গেল, শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতি স্তম্ভের ফলকটি কালো পর্দায় ঢেকে দেওয়া হয়েছে যাতে ৫২ বছর আগে সেটির উদ্বোধক শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি দেশবাসীর চোখে না পড়ে।
প্রধান উপদেষ্টার জুতো পরে শহিদ বেদিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন তাঁর বয়সজনিত ভ্রান্তি নাকি ইচ্ছাকৃত, সে প্রশ্ন থেকেই যায়, উপস্থিত সরকারি কর্তারা কেউ তাঁর ভুল শুধরে না দেওয়ায়। স্বৈরাচারী, ফ্যাসিস্ট শাসকেরা ভুল ধরা পছন্দ করেন না। যদিও মাত্র চার মাসের শাসক সম্পর্কে রাজনীতির অভিধানের কোনও কটু শব্দ ব্যবহার তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। জুতো খুলতে ভুলে যাওয়াটা শহিদ বেদিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের অভ্যাস না থাকাটাও একটি কারণ হতে পারে। ৮৪ বছর বয়সি নোবেল জয়ী ইউনুস প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর প্রথম গত অগাস্টে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
শেষ করি বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের মুখে মুখে শোনা একটি কথা দিয়ে। তারা কথায় কথায় বলেন, ‘সমস্যা নাই’। আমি বহুবার লিখেছি, সভা-সমিতিতে বলেছি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিকামী আমজনতার ইচ্ছা শক্তির জয়ের বিরল দৃষ্টান্ত। ‘সমস্যা নাই’ কথাটি তাই ওপারের মানুষের মুখেই মানায়। আজ মনে হচ্ছে, ইচ্ছাশক্তিতে ওপারের ১৮ কোটি বাঙালিকে ছাপিয়ে গিয়েছেন মহম্মদ ইউনুস। যার জোরে তিনি দেশটাকে পিছিয়ে পরাজয়ে দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাইছেন। ইচ্ছা শক্তির জোরে এরপর তিনি দেশের নামটি বদলে দিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে। ইউনুসের হাতে পড়ে বাংলাদেশ ‘পাকবাংলা’ হওয়ার দিকে পা বাড়িয়েছে।